বন্যা
ড. মো. জিল্লুর রহমান
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩০ এএম
ড. মো. জিল্লুর রহমান
২৩ আগস্ট ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় জাতিসংঘের দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসকরণ দপ্তরের
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শাখাপ্রধান মার্কো
তোসকানো-রিভালতা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আগামী ২০৩০
সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে
এশিয়া-প্রশান্ত সাগর অঞ্চলের দেশগুলোতে বন্যা ও ভূমিধসের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, চীন, সৌদি
আরব, ভারত, নেপাল ও কানাডায় আকস্মিক বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছিল। ২৬ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ভিন্ন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
আকস্মিক বন্যার পেছনে বায়ুমণ্ডলীয় নদীর বড় প্রভাব রয়েছে। বিজ্ঞানীদের
দাবি, দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা বায়ুমণ্ডল অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি
আর্দ্রতা ধারণ করছে। বায়ুমণ্ডলীয় নদী নতুন কোনো ধারণা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
পশ্চিম উপকূলের দিকেই এ ধরনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়ে থাকে। অন্যান্য অঞ্চলে এই
সুবিধা নেই। তবে গোটা বিশ্বেই এখন বায়ুমণ্ডলীয় নদীগুলো প্রতিনিয়ত দীর্ঘ, প্রশস্ত
এবং প্রায়শই ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে। মূলত বায়ুমণ্ডলে অনেক বেশি আর্দ্রতার
কারণে আমাদের দেশেও বন্যার ঝুঁকি বেড়ে চলেছে।
পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ আমাদের এই দেশকে বলা হয় জোয়ারের দেশ। তিনটি আন্তর্জাতিক
নদীর মোহনার নিচের অংশে আমাদের এই ভূখণ্ড। ফলে যখনই বন্যা বা পানির স্রোত আমাদের দিকে
তেড়ে আসে তখন আমরা বড় বন্যার ঝুঁকিতে থাকি। কারণ এখানে ক্যাচমেন্ট এরিয়া অনেক বড়। ক্যাচমেন্ট
এরিয়া বড় হওয়ায় বন্যার পানি পাহাড়ের ঢাল দিয়ে দ্রুতগতিতে নেমে আসে এবং এ কারণে আমাদের
দেশে প্রতিবছরই বন্যা হয়ে থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গোটা বিশ্বেই আবহাওয়ার স্বাভাবিকতার
ছন্দপতন ঘটেছে। কোনো বছর স্বাভাবিক মৌসুমে অনেক বৃষ্টি হয় আবার কোনো বছর একেবারেই হয়
না। দেখা যায়, এক বছর বেশি খরা হয়েছে আবার অন্য বছর খরার তীব্রতা এত বেশি হয় না। যখন
বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হয় তখন দেশের নদীগুলো পানিধারণ করতে পারে না। অল্প সময়ে উজান
বেয়ে এত পানি নেমে আসার ফলে নদীর পাড় উপচে পানি লোকালয়ে চলে যেতে শুরু করে।
এ-রকম পরিস্থিতিতে বন্যা দেখা দেয়। প্রতিটি বড় বন্যারই রিটার্ন পিরিয়ড থাকে। স্বাভাবিক
বন্যার সময়ে পানির যে উচ্চতা থাকে অস্বাভাবিক বন্যার সময় তারচেয়ে বেশি উচ্চতা হয়ে থাকে।
অস্বাভাবিক বন্যাগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর হয়ে থাকে। কোনো একটি বন্যা ২০, ৩০ এবং বেশি
অস্বাভাবিক বন্যা ১০০ বছর পরপর হতে পারে। একে আমরা বলি ওই বন্যার রিটার্ন পিরিয়ড। উদাহরণ
হিসেবে ১৯৮৮ আর আটানব্বইয়ের বন্যাকে ১০০ বছর রিটার্ন পিরিয়ডের বন্যা বলে থাকি। সে সময়
বন্যার অভিঘাত সারা দেশে লেগেছিল। অর্থাৎ প্রায় তিন দশক আগে আমরা ভয়াবহ বন্যা দেখেছি।
এখন পূর্বঞ্চলে যে বন্যাগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো আকস্মিক বন্যা। আকস্মিক বন্যাই দেশের
১১টি জেলাকে প্লাবিত করেছে। বিশেষতÑফেনী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া,
নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি এলাকায় এ ধরনের বন্যা গত তিন দশকে এত তীব্রতায় প্লাবিত করেনি। সচরাচর
ওই এলাকাগুলোতে এমন বন্যা হয় না। এবার বন্যার কারণ কী? গত কয়েকদিনে ওই এলাকাগুলোতে
প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশেষত, ১৯ আগস্ট থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত একাধারে বৃষ্টি হয়েছে।
২৬ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির
কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু স্থানে অবনতিও ঘটেছে। এই মুহূর্তে বৃষ্টিপাতের
পরিমাণ যদি আর না বাড়ে তাহলে বন্যা পরিস্থিতির খুব দ্রুত উন্নতি হবে।
দেশের যেসব এলাকায় এখন বন্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে সে এলাকাগুলো পাহাড়ের খুব কাছে।
পাহাড় থেকে পানির যে ঢল নামে তা দ্রুত সমতলের এলাকাসমূহে ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ে বৃষ্টি
হলে কোনো নদীর ক্যাচমেন্ট এরিয়ার পানি দ্রুত সময়ে সমতলে চলে আসায় বন্যা পরিস্থিতি দেখা
দেয়। সমস্যা হলো, সমতলে এই পানি পাহাড়ের তুলনায় ধিরে প্রবাহিত হয়। ফলে সমতলে বন্যার
ক্ষতিও হয় বেশি। পদ্মা কিংবা যমুনায় বন্যা হলে সচরাচর পানি দেশের মধ্য বা নিম্নাঞ্চলে
আসতে প্রায় পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে। এখন অবশ্য আরও বেশি সময় লাগে। কারণ আমরা ওই
এলাকায় আড়াআড়ি অনেক রাস্তা নির্মাণ করেছি। এসব অবকাঠামো বন্যার পানিকে বাধাগ্রস্ত করে।
কিন্তু পানি তো আর থেমে থাকে না। এই পানি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন ধরনের বন্যা
দীর্ঘায়িত হয়। গত বছর হাওর অঞ্চলে বন্যার জন্য আমরা সৃষ্ট অপরিকল্পিত কাঠামোকে দায়ী
করেছি। সিলেটে গত বছরের বন্যা পরিস্থিতি এতদিন থাকার কথা ছিল না। অপরিকল্পিত নানা অবকাঠামো
নির্মাণ ও হাওরাঞ্চলের পরিবেশ সংবেদনশীল অবকাঠামোর অভাবে এমন মানবসৃষ্ট বন্যা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, বন্যার পানি ধারণ করার মতো নদী-নালা, জলাশয় ভরাট-দখল করে ফেলা হয়েছে।
ফলে অনেক পানি সমতলেই থেকে যাচ্ছে এবং বন্যার দুর্ভোগ বাড়িয়ে চলেছে। নদী-নালা ও জলাশয়
সংরক্ষণের অভাব থাকায় বন্যার পানি সরে যেতে আরও বেশি সময় লাগে। বন্যা একটি স্বাভাবিক
ঘটনা। কিন্তু সমতলে বন্যা পরিস্থিতিতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয় তার পেছনে মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডকে
পুরোপুরি এড়ানো যাবে না।
ফেনি, কুমিল্লা
ও নোয়াখালীর মতো জেলা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যে পানি আসে তা ধরে
রাখার জন্য নদী বা জলাশয় থাকা প্রয়োজন। এই অঞ্চলের নদীগুলোর পাহাড়ি ক্যাচমেন্ট এরিয়া
থেকে প্রচুর পানি প্রবাহিত হয়ে খুব দ্রুত এই জেলাগুলোতে চলে আসে। পাহাড়ের ঢাল অনেক
উঁচু হওয়ায় এ পানি আসতে এক দিনও সময় লাগে না। সমতলে আসার পর এই পানি সরে যেতে সময় নেয়।
সাগরের কাছাকাছি হওয়ার পরও যতটা দ্রুত সমতল থেকে বন্যার পানি যাওয়ার কথা তা কিন্তু
হচ্ছে না। এর কারণ, আমরা বিভিন্ন মহাসড়ক ও অবকাঠামো তৈরি করেছি। অনেক স্থানে রেলপথও
ডুবে গেছে। এগুলো পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। এসব অবকাঠামোতে যদি পানি নিষ্কাশনের
পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হতো এবং ভৌগোলিক-পরিবেশ সংবেদনশীল করে নির্মাণ করা হতো তাহলে
এত সমস্যা দেখা দিতো না। বন্যার পানি সচরাচর নদী বা কালভার্ট এলাকা দিয়ে যায়। এগুলো
উন্মুক্ত থাকলে সমতলেও পানি অনেক দ্রুত চলে যেতে পারত। সে সুযোগ এখন নেই।
দেশে এখন যে বন্যা
পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে তাকে আকস্মিক বন্যাই বলতে হবে। কিছু কিছু জায়গায় প্রায় ৪৫০ মিলিমিটার
বৃষ্টি হয়েছে। নদীর ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সমগ্র এলাকার প্রায় দেড় ফিট পরিমাণ সঞ্চিত পানি
যদি নেমে আসে তাহলে নদী তা ধারণ করতে পারবে না এমনটিই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে এবারের
বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিছুদিন আগেই আমরা বলেছি, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি
হয়েছে। এর ফলে বৃষ্টিপাতের শঙ্কা ছিল। লঘুচাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌসুমি বায়ু। এই
দুটো মিলে অনেকদিন ধরেই এ ভূখণ্ডে মেঘ সৃষ্টি হচ্ছে, যাকে আমরা কিছুক্ষণ আগেই বায়ুমণ্ডলীয়
নদী বলে আখ্যায়িত করেছি। এ পূর্বাভাসটাকে জোর দিয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলে জানানো
প্রয়োজন ছিল। এ-রকম জরুরি বিষয়গুলোর পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে আবহাওয়াবিদদের আরও অগ্রনী
ভূমিকা পালন করা উচিত। এও সত্য, আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার মতো উপযুক্ত সামগ্রী
বা প্রযুক্তি আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে নেই। তবে যা আছে তা থেকে সহজেই দুই থেকে তিন দিন
আগের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। উন্নত দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ আগে এই পূর্বাভাস
দেয়া হয়ে থাকে। যদিও দীর্ঘকালের পূর্বাভাসের সব সঠিক হয় না। তারপরও আমাদের এই ঘাটতি
রয়েছে।
আগামীতে বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু সরকারকেই সব দায় চাপিয়ে দিলে হবে না। জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টাও জরুরি। যেমন এবার এমন এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হলাম। সেই নব্বইয়ের বন্যায় এমন জাগরণ দেখেছি। সবাই অকাতরে বন্যার্তদের সহায়তায় এগিয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যস্ত সময় পার করছে ত্রাণ ও সহযোগিতা সংগ্রহের। এই যে সমন্বিত হওয়া, জাতির একত্রিত হওয়াÑ এর প্রতিফলন ঘটা জরুরি সবক্ষেত্রে।