× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

সংস্কারই মুখ্য চ্যালেঞ্জ

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৫১ এএম

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা

গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্বাভাবিক হয়ে আসতে শুরু করেছে দেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোলার পাশাপাশি চালু হয়েছে বিপণিবিতান। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অস্থিরতার মধ্যে ছিল সাধারণ মানুষ। আন্দোলনের পর ক্লান্ত শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক কন্ট্রোলের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লার নিরাপত্তার কার্যক্রমে নিজেদের অক্লান্তভাবে ব্যস্ত রাখে। পাড়া-মহল্লায় ছাত্রছাত্রীরা দলবেঁধে পাহারা দিয়েছে। রাস্তাঘাট পরিষ্কার করেছে। এখনও তারা সমাজের নানা স্তরে সংস্কারের জন্য নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। তবে  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে শিগগিরই অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন দায়িত্ব ছেড়ে ছাত্রছাত্রীরা ফিরে আসবে পড়ার টেবিলে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে সামাজিক শৃঙ্খলা।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত ড. ইউনূসের ওপর প্রত্যাশাও অনেক বেশি। তার উপদেষ্টা পরিষদে প্রায় সবাই মেধাবী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ। প্রত্যাশা করা যায়, সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় তারা বেশ সহায়ক হবেন। তবে উপদেষ্টামণ্ডলীর অনেক সদস্যই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা থেকে এসেছেন। নিঃসন্দেহে তারা সরকার পরিচালনায় অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা বলে আসছি, ব্যবসায়ীরা যখন রাজনীতিতে আসে তখন তারা তাদের শ্রেণিচরিত্র বদলাতে পারেন না। আর এরই ফলে আর্থিক খাতে দেখা গেছে অনিয়ম-দুর্নীতি।

অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টামণ্ডলীর কর্মপরিসর ভিন্ন। সুতরাং, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে তাদের পক্ষে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলেই প্রত্যাশাবর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। মূল্যস্ফীতি গত দুই বছর ধরেই আমাদের জন্য একটি বড় সংকট। গত জুনে গোটা বছরের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় পৌনে ১০ শতাংশ। সংকটকালীন মুহূর্তেই দেশের মুদ্রা ও রাজস্ব নীতিতে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। এসব পরিবর্তন সময়োপযোগী মনে হলেও অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছে। তাই ইতিবাচক প্রভাব রাখা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে অনিয়ম-দুর্নীতি-খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের আমানত কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। বিগত সময়ে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ছোট আমানতকারীদের অনেকেই তাদের আমানতের নিরাপত্তার কথা ভেবে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে আমানত স্থানান্তর করছেন। তা ছাড়া বর্তমানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি সচল করতে না পারায় সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিমাণও কম। আর্থিক খাতের সংস্কার ও ভালো ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

গোটা বিশ্বে ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছিল। মূলত শাটডাউন, ভার্চুয়াল শাটডাউন, সন্ত্রাস, হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, কারফিউ এবং জেল-জুলুমের কারণে মানুষের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। বেকারত্ব বেড়েছে ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। এ ছাড়া অর্থনীতির পরোক্ষ ক্ষতিগুলো এখনও আমাদের সামনে আসেনি। বেসরকারি খাত বা ব্যবসা বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে। আর আর্থিক খাত সুস্থির করতে না পারলে বিশ্ববাজারে আমাদের ভাবমূর্তি নানাভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

দেশের কলকারখানা ও কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো দরকার। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে দৈনন্দিন কাজে মানুষের আস্থা ও আগ্রহ ফিরিয়ে আনা দরকার। গত দুই বছরে আমাদের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে তেমন সুখবর ছিল না। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল কৃষি খাত। ক্রমাগত উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে খাদ্যনিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত ছিল। চাল আমদানি করতে হয়নি। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পতনের কারণে অন্যান্য কৃষিপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। ফলে বাজারে কিছুটা সরবরাহ সংকট এবং খানিকটা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে পণ্যমূল্য ভোক্তাদের ক্রয়সীমা ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি করপোরেট ও বাজার সিন্ডিকেট মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে। এখন আমরা সংস্কারের সময়ে পৌঁছেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবিও অনেক পুরোনো। আগামী দিনগুলোয় উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। উৎপাদন খরচ কমানোর বিষয়ে ভাবতে হবে। এখন ফসল খাতে রোপা আমনের উৎপাদন মৌসুম চলছে। দেশে রাসায়নিক সার সংকট রয়েছে। ডলার সংকটের কারণে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের সার কারখানাগুলোয় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের অভাবে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত এর প্রতিকার দরকার। নতুবা আমন ও সামনের বোরো মৌসুমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে।

কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের আমদানি হ্রাস, রপ্তানি সম্প্রসারণ, রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পতন ঠেকানো এবং ক্রমাগতভাবে টাকার মানের অবচয় রোধ করা অগ্রাধিকার পাওয়া জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেশের জনগণের বাহিনী হিসেবে পাশে থাকা, বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং সরকারি কর্মচারীদের জনকল্যাণে নিয়োজিত থাকার পরিবেশ তৈরি করার এখনই উপযুক্ত সময়। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সুশিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। নতুন সরকার দেশের জনগণের কল্যাণে এবং কষ্ট লাঘবে পাশে থাকার ও জন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করার দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শনে সক্ষম হলে আত্মসুখ অনুভব করবে সাধারণ মানুষ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটিয়েছে। এসেছে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা অনেক। সব ধরনের আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য পরিহার করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার জন্য যে সময় দরকার তা এ সরকারকে দিতে হবে।

আমরা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক প্রতিশ্রুতি দিই। সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করি। প্রকৃতপক্ষে তার অনেকখানিই বাস্তবায়ন করতে পারি না। গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে অনেক কথা আমরা অহরহই শুনি, কিন্তু এর বাস্তব প্রতিফলন প্রায়ই দেখতে পাই না। গণতন্ত্রের লেবাস পরে এ দেশে অনেক সরকার এসেছে। কিন্তু কালক্রমে তা রূপ নিয়েছে স্বৈরতন্ত্রে। ক্ষমতার মোহ কোনো কোনো মানুষকে এতই আকর্ষণ করে যে তা শেষ পর্যন্ত অনেকেই স্বেচ্ছায় ছাড়তে চা না। ছলে-বলে-কৌশলে তা আঁকড়ে ধরে রাখতে চা। তার পরিণতি হয় দুঃখজনক। ক্রমেই সরকার জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার সাজানো ক্ষমতার বলয় তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। সম্প্রতি শেখ হাসিনা সরকারের পতন থেকে আমরা এ শিক্ষাই গ্রহণ করি। আমাদের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত, তার চেয়েও সংক্ষিপ্ত আমাদের কর্মকাল। এ সময়ের মাঝে যত বেশি সম্ভব জনকল্যাণে কাজ করা উচিত। সুখ-শান্তির জন্য কাজ করে তাদের মাঝে নন্দিত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

২১ আগস্ট অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রস্তুতে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠনের কথা জানায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাঠানো শ্বেতপত্রের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটিনামে প্রস্তাবিত কমিটি আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করবে। শ্বেতপত্রে দেশের বিদ্যমান অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়ে সরকারের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ, এসডিজি বাস্তবায়ন এবং এলডিসি থেকে উত্তরণে করণীয় বিষয়ে প্রতিফলন থাকবে।’ শ্বেতপত্রটি প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটি বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও মতবিনিময় করার কথাও বলা হয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে সুসংহত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর একটি তালিকাও করেছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। সেগুলো হলোÑঅর্থনীতি পুনরায় সচল করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো নিরসনে কাঠামোগত সংস্কারনিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি; দুর্নীতি দূরীকরণ; ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা; কর ও শুল্ক নীতির সংস্কার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ।

এমন উদ্যোগের জন্য সংশ্লিষ্টদের সাধুবাদ জানাই। তবে কৃষি অর্থনীতির দেশে উৎপাদন বাড়ানো ভিন্ন অর্থনীতিকে সচল করার সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে জোর দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে বড় সংস্কার জরুরি। এই সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে ব্যাংকিং কমিশন গঠিত হয়েছে। কমিশনকে প্রথমে খেলাপি ঋণ ও তারল্যসংকটের কারণ খতিয়ে দেখতে হবে। গোড়া থেকে সংকট শনাক্ত করতে পারলে ব্যাংকিং খাতের সংকট দূর করা জটিল কিছু হবে না। শুধু আর্থিক খাতই নয় আরও অনেক খাতেই সংস্কার খুব জরুরি। এ কাজটি করতে হবে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচনা করে।

  • অধ্যাপক, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা