× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সমাজ

অপমানের সংস্কৃতি

ফারুক আহমেদ

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৪৭ এএম

ফারুক আহমেদ

ফারুক আহমেদ

চারদিকে বিকলাঙ্গ অন্ধ ভিড়Ñঅলীক প্রয়াণ/মন্বন্তর শেষ হলে পুনরায় নব মন্বন্তর;/যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল;/মানুষের লালসার শেষ নেই;/উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতুক্ষণ/অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ/ অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ/নেই।

Ñ জীবনানন্দ দাশ।

অন্যের মুখ ম্লান করে দেওয়ার দিনে মুখজুড়ে যে হাসি, তা বোধহয় আমাদের চরিত্রেরই বৈশিষ্ট্য। অসহায় হয়ে পড়া মানুষের বেদনাহুত মুখ দেখে আমাদের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফোটে। মনে মনে উচ্চারিত হয়, এই দেখো তোমার অহংকার, তোমার অর্জন কীভাবে চূর্ণ হলো!

২০২৪ সালে এসে যে বিপ্লব ঘটল, তা স্বাধীন বাংলাদেশের এক অনন্য ঘটনা। এ আন্দোলন, এ বিপ্লবের উৎসমুখ ছিল ছাত্ররা। সাধারণত ছাত্ররা, দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী শাসনের অপমান মেনে নিতে না পারার ক্ষোভ থেকে আন্দোলনে নামল এবং এর থেকে এক অভাবনীয় বিজয়গাথা দেখল বাংলাদেশ। এই অপমানটা ছিল সামষ্টিক, দীর্ঘদিন ধরে, কথা বলতে না পারার ক্ষোভ, নানাভাবে লাঞ্ছিত হওয়াÑসর্বোপরি সব রকম ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে শাসক দলের গলা চেপে ধরার ক্ষোভ থেকে এমন ‍বিস্ফোরণ ঘটল। এ রকম সামষ্টিক অপমানবোধ মঙ্গল নিয়ে আসে। একটি জাতির জাত্যাভিমানও পাওয়া যায় এমন ঘটনার ভেতর দিয়ে। পশ্চিম পাকিস্তান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে অপমান করছিল। নানাভাবে অবদমিত করে রাখছিল। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের এদেশ থেকে বিদায় নিতে হলো।

এই সামষ্টিক অপমান থেকে মানুষ যখন ব্যক্তিগত অপমানের দিকে পা বাড়ায়, তখন বিপত্তির শুরুটা হয়। পুরো সমাজকে বিচলিত হতে হয়। আমরা সামষ্টিক অপমান থেকে বেরিয়ে যখন স্বপ্ন দেখছি নতুন বাংলাদেশের, তখন দেখা যাচ্ছে, অনেক ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা ঘটছে, যা এ রকম একটা অর্জনকে ফেলে দিচ্ছে প্রশ্নের মুখে।

কোটার সংস্কার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের শাসকগোষ্ঠী নানাভাবে হেনস্থা করছিল। শাসক দল সমর্থিত বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষগুলোও এমন যৌক্তির দাবির বিপরীতে যা বলে যাচ্ছিল, তা ছিল অগ্রহণযোগ্য। লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি চিরকুট জন্ম দিল বিতর্কের; যা উনার এত দিনের অর্জনকে ফেলে দিল প্রশ্নের মুখে। যেখানে লেখক-বৃদ্ধিজীবীরা সাধারণত জনমানুষের পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ায়, সেখানে এসব মানুষ দাঁড়ালেন দমনপীড়নে লিপ্ত শাসকশ্রেণির পক্ষে। ফলে তারা তাদের শ্রদ্ধার আসনটা হারাল। মনে হলো, জন-আকাঙ্ক্ষা থেকে এই গোষ্ঠীটা অনেক দূরে। ভোগবাসনায় বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়Ñচাণক্যের কথাটি যেন তাদের এই সময়ের যাপনের দিকে আঙুল ওঠাল।

ভোগবাসনায় থাকা বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, আমলা, সমাজ হিতকারী চরিত্রÑএসবের বাইরে এসে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ই শোনা যাচ্ছিল এ আন্দোলনে। কিন্তু নতুনভাবে শুরু করার দিনগুলোতেই দেখা যাচ্ছে হিংসা, ক্ষোভ, অশ্রদ্ধার ছড়াছড়ি। অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়ার প্রতিযোগিতা।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তিনি জনগণের, সাধারণ ছাত্রদের পাঠ করেননি, পাঠ করেছেন ক্ষমতাকে। তার ফলে তিনি মানুষের হৃদয় থেকে পতিত হয়েছেন। একজন লেখকের জন্য এটা বিরাট লজ্জা এবং দুঃখের। তারপরও রাজনৈতিক নেতাদের মতো তাকে অপমান করতে হবে, তার বই পোড়াতে হবে, তাকে জনসম্মুখে এনে আরও কিছু করতে হবে। এটা অসহিষ্ণুতা, এটা এই আন্দোলনের সুরের সঙ্গে যায় না। এরপর যা ঘটছে একের পর এক, তা আরও বেদনার, আরও দুঃখের। স্কুল বা কলেজ থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা পদত্যাগ করছেন। আর তখন সহকর্মীরা পদত্যাগকারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছেন। চেয়ার থেকে টেনে নামাচ্ছেন। আরও বেদনার যে, শিক্ষার্থীরা তাদের শ্রদ্ধের শিক্ষককে অপমান করছেন।

লেখক, শিক্ষক বা একজন বুদ্ধিজীবী রাজনৈতিক চরিত্র নয়। তারা দমনপীড়নের অনুষঙ্গ নয়। তারা যেটুকু করেন, তা মতাদর্শিক, লাঠি সংশ্লিষ্ট নয়। ফলে তাদের এভাবে অপমান করার চর্চা পুরো জাতির জন্য নৈতিক স্খলন উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে। এসব ঘটনা গুরুজনকে শ্রদ্ধা দেখানোর যে সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান, তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে। এ বিজয় সেক্ষেত্রে হয়ে যাবে অনেকটাই মূল্যহীন।

একটা ছোট্ট কাহিনী এখানে বিবৃত করা যায়। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিস ছিলেন ক্ষ্যাপাটে এক মানুষ। তার সময় এবং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সময় একই। ডায়োজিনিসের সঙ্গে আলেকজান্ডারের পরিচয় ঘটে। সেসময় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং ডায়োজিনিসের কথোপকথন।

-আমি আলেকজান্ডার দি গ্রেট।

-আমি ডায়োজিনিস দি সিনিক।

-আপনি কি আমাকে ভয় পাচ্ছেন না?

-কেন কেন? তোমাকে ভয় পেতে যাব কেন? আগে বল তুমি ভালো না মন্দ?

আলেকজান্ডার বললেন, অবশ্যই ভালো।

-তো ভালো জিনিসকে কেউ ভয় পায় বুঝি?

তারপর যা ঘটল, তা আমাদের এ সময়ে ঘটলে কী হতো!

এক দিন এই দার্শনিকের জন্য কিছু করার ইচ্ছা হলো আলেকজান্ডারের। ডায়োজিনিস তখন নিজের আবাসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আলেকজান্ডার তার সামনে হাজির হলেন।

জিজ্ঞেস করলেন, ওহে, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?

ডায়োজিনিস বললেন, তুমি আমার সামনে থেকে সরো তো বাপু! তোমার জন্য আমি রোদ পোহাতে পারছি না!

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা এবং ক্ষমতাধর মানুষটি ডায়োজিনিসকে রোদ পোহানোর সুযোগ দিয়ে সরে পড়লেন। আমরা কোন পথকে বেছে নেব, তা আমাদের শিক্ষা, আমাদের জ্ঞান, আমাদের জীবনচর্চাই নির্ধারণ করে দেবে। প্রায় এঁটেল মাটির দলার মতো এ সময়কে আমরা কীভাবে গড়ব, তা আমাদের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞার মাধমেই নির্ধারিত হবে।

যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় নাই, যারা সৃজনচর্চা করেন, বৃদ্ধিবৃত্তিকতা যাপন করেন, তাদেরকে এভাবে অশ্রদ্ধা করা খুবই দুঃখজনক। এ রকম ভোগবাসনায় বুদ্ধি লোপ পাওয়া লেখককে লেখা দিয়ে, শিক্ষককে শিক্ষার মাধ্যমেই তাদের পতনের জায়গাটা দেখাতে হবে। অপমানের সংস্কৃতিটা ব্যক্তিগত না হয়ে সামষ্টিক হোকÑ এটাই কাম্য।

কবি ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা