× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

নদীর নাব্যতা ও গতিপথ ঠিক রাখতে হবে

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩৭ এএম

নদীর নাব্যতা ও গতিপথ ঠিক রাখতে হবে

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের একটি প্রতিবেদনে গভীর উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছিল। তাতে বলা হয়, গত ৪৫ বছরে উধাও হয়েছে দেশের ৬০০ নদ-নদী। বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক নদ-নদী এ সময়ে শুকিয়ে মরে গেছে উল্লেখ করে বলা হয়, ১৩০০-এর মতো নদ-নদী ছিল, কিন্তু এখন তার সংখ্যা নেমেছে ৭০০-তে। নদ-নদীর হারিয়ে যাওয়ার এই চিত্রের পরও এ বিষয়ে আমাদের উদাসীনতা কমেনি। নদী রক্ষায় সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে দাবি উঠলেও তা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। ফলে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নজরে আসেনি। কেউ-ই পরিকল্পনামাফিক নদী বাঁচানোর চেষ্টা করেনি। তাই একে একে হারিয়ে যেতে বসেছে নদী ও জলাশয়। আর ধুঁকে ধুঁকে ওষ্ঠাগত প্রাণে যেগুলো টিকে আছে তারাও দখলে-দূষণে শুকিয়ে মৃতপ্রায়। ফলে বর্ষায় একটু পানি হলেই পাড় উপচে পড়ে। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীর পানি ও পলি দিয়ে গঠিত বাংলাদেশ আজ একদিকে পানির অভাবে মরুকরণের হুমকির মুখে, আবার অন্যদিকে অসময়ে অনিয়ন্ত্রিত পানির স্রোতেও ভেসে যায়।

আমাদের নদ-নদীতে পানির অভাব যেমন প্রাকৃতিক কারণে নয়, তেমনি অসময়ে পানির প্রাচুর্যতাও সব সময় প্রাকৃতিক নয়। উজানের দেশ চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে আসা নদীগুলো বাংলাদেশের প্রাণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সব নীতি লঙ্ঘন করে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর উজানে বাঁধ দিয়েছে ভারত। এর মাধ্যমে দেশটি একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানি সরিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার আগ্রাসী তৎপরতাও দেখাচ্ছে। দুর্যোগপ্রবণ দেশ বাংলাদেশ। ঝড়, বন্যাসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের সইতে হয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পেছনে দায়ী করা হচ্ছে সরাসরি মানুষের কর্মকাণ্ডকেও। এবারের বন্যার কারণ হিসেবে ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি ভারতের এক রাজ্যের বাঁধের কপাট খুলে দেওয়াকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পানিতে ভেসে গেছে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা। এর বাইরেও বন্যাকবলিত হয়েছে কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি জেলা।

বন্যার অন্যতম কারণ নদ-নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া। ২৪ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশে ‘বছরে ২ কোটি টন পলি তিস্তায়, স্বল্প পানিতেই ভাসছে দুকূল’ শিরোনামের প্রতিবেদনে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর দুই কোটি টনের বেশি পলি আনছে তিস্তা। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে বেশি বৃষ্টি হলে উজানের দেশ ভারত গজলডোবা বাঁধের সবগুলো জলকপাট খুলে দেয়। এতে হু হু করে পানি ঢুকে পড়ে তিস্তায়। পানির চাপ বেশি হলে বাংলাদেশকে খুলে দিতে হয় লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারেজের সব জলকপাট। ফলে বন্যা দেখা দেয় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায়। পানির স্রোতের সঙ্গে আসা বিপুল পরিমাণ পলি প্রতিবছরই ভরাট করছে তিস্তার বুক। জেগে উঠছে নতুন নতুন চর। সঙ্গে আগের চরগুলো আরও উঁচু হচ্ছে। নাব্য হারাচ্ছে তিস্তা। এতে অতিবর্ষণ বা উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তার দুকূল উপচে পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে।

অতিবৃষ্টি অথবা উজানের ঢল থেকে বন্যা বা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু কেন? কারণ পানির স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পথ নেই। সেই পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কারা সে পথ রুদ্ধ করেছে? প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদন বলছে, পলি জমে পানি ধারণক্ষমতা কমেছে তিস্তার। এ শুধু তিস্তারই রূপ নয়, দেশের প্রতিটি নদ-নদীই এ সমস্যায় ধুঁকছে। একদিকে পলি জমে নদ-নদীগুলো হারাচ্ছে নাব্যতা, কমে যাচ্ছে পানি ধারণক্ষমতা। অন্যদিকে উজানে বাঁধের কারণে বছর ধরে থাকছে না নদীর স্বাভাবিক স্রোতধারা। ফলে বর্ষায় বন্যা দেখা দিচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে নদ-নদীগুলো মরা খালে পরিণত হচ্ছে।

এখন এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের করণীয় কী? এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, বন্যা-জলাবদ্ধতা অথবা মরুকরণ প্রবণতা রুখতে বহু বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা যা যা বলছেন তার কোনোটিরই প্রতিকার হয়নি। আর প্রতিকার হয়নি বলেই বারবার আমাদের ভুগতে হচ্ছে এবং প্রতিবারই অবস্থা প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। একসময় কখন বৃষ্টি নামবে বা কেমনভাবে নামবে, তা জানত মানুষ। আমাদের নদীগুলো পানি ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু নদীর সঙ্গে আজ আমাদের সম্পর্কের ছেদ পড়েছে। আমাদের মাঝে দেখা দিয়েছে নদীকে শাসন করার প্রবণতা। বন্যা আটকাতে আমরা বাঁধ দিয়েছি। কিন্তু সেই বাঁধ উপচেই আজ বন্যা আসে এবং সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রত্যেকেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আজকে বন্যার মতো যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ওপর নেমে আসছে, এর দায় তো পাশের দেশে বাঁধ দিয়ে নদীর পানি আটকে দেওয়ার পাশাপাশি আমাদেরও। আমাদের অবিবেচক কর্মকাণ্ডেরও ফল ভোগ করতে হচ্ছে জনগণকে। নদীর গতিপথের বাঁধায় প্রতিবছর নতুন নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বাড়ছে। আমরা যদি উজানের ঢলের নেমে যাওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করি, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই তার পথ তৈরি করে নিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করবে। এজন্য আমাদের কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই যেন প্রকৃতির ক্ষতিসাধন করে না হয়, তা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই নির্ধারণ করতে হবে। নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, নদ-নদীগুলো দখলমুক্ত করে এগুলোর যথাযথ খনন প্রক্রিয়ার দিকেও নজর দিতে হবে।

আমরা জানি, দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রতিটি আন্তর্জাতিক নদ-নদীর পানির ন্যায্য পাওনা নিশ্চিতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। যদিও সেই চেষ্টা খুব একটা সফল হয়নি। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির জন্যও আমরা অপেক্ষা করছি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। আমরা এখনও আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত। আমরা পানির নায্য হিস্যার বিষয়ে সরকারের তৎপরতার সঙ্গে প্রতিবেশীর ন্যায়সংগত আচরণও প্রত্যাশা করি।

নদী, জলাশয়, জলাভূমি বাঁচাতে হবেÑএই দাবি সব সময়ের। আমরা নদী, জলাভূমি, জলাশয়গুলো বাঁচানোর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় জলসম্পদের তালিকা তৈরির তাগিদ দিই। সেই সঙ্গে নদ-নদী ও খালগুলোর সীমানা চিহ্নিতের মাধ্যমে দখলমুক্ত করে সংস্কারের উদ্যোগের কথা বলি। যেকোনো ধরনের জলাশয় বুজিয়ে ফেলার প্রবণতাও রুখে দিতে হবে। অন্যথায় জীবনের অপর নাম যে পানি, সেই পানিই আমাদের জীবনে বারবার দুর্ভোগ, দুর্দশা ও বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা