শাসনব্যবস্থা
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৪০ এএম
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ
পৃথিবীর বুকে আন্দোলন ও বিপ্লবের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ইতিহাসমতে খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩০ সালে অর্থাৎ আজ থেকে ৪৭৫৪ বছর আগে মিসরে সর্বপ্রথম বিপ্লব হয়। কুখ্যাত ফেরাউন বংশের শেষ সম্রাট খাসেখেমিকে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ইতিহাসের এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের নাম প্রথম উঠে আসে ১৯৭১ সালে। এরপর ১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালে বড় পরিবর্তনের কারণে বিপ্লবের ইতিহাসে ঠাঁই পায় বাংলাদেশের নাম। আর ২০২৪ সালে পৃথিবীতে চমকে দিয়ে দেশের ছাত্র-জনতা ইতিহাসের পাতায় আবারও লিখিয়েছে বাংলাদেশের নাম, তবে এবার স্বর্ণাক্ষরে। আন্দোলন ও বিপ্লবের সুপ্রাচীন ইতিহাস বিপ্লবের পরপরই প্রতিবিপ্লব কিংবা জননিরাপত্তার অভাবকেন্দ্রিক অঘটন ঘটার সাক্ষ্য দেয়। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবং ভিন্ন ভিন্ন কারণে একটি আন্দোলন বা বিপ্লব ঘটে এবং চূড়ান্ত বিচারে তা সফল কিংবা ব্যর্থ হয়। এ সময় অনেকের দীর্ঘদিনের না-পাওয়ার বেদনা, পেয়ে হারানোর হতাশাসহ নানাবিধ কারণ গ্রাস করে গোটা সমাজকে। তাই আন্দোলন বা বিপ্লব-পরবর্তী প্রতিবিপ্লব বা অঘটনের নেপথ্যে থাকে ভিন্ন ভিন্ন উপসর্গ। সাধারণভাবে সামরিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও বিদেশি শক্তির ইন্ধনেই ঘটে বিপ্লব ও পরবর্তী প্রতিবিপ্লব বা অঘটন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সফল আন্দোলন ও বিপ্লবের পর আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী তথা সেনা, নৌ বিমান বাহিনী এযাবৎ যে ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে, তা সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ বিশেষত ছাত্রসমাজের মনের ভাষা ও যৌক্তিক দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে শত প্রতিকূলতার ও উস্কানির মাঝেও অস্ত্র সংবরণের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত প্রতিরক্ষা বাহিনীর বর্তমান নেতৃত্বকে অমর করে রাখবে। কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকা ক্ষমতাধর নেতানেত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তারা। এর বিকল্প হতে পারত রাস্তাঘাটে এসব নেতানেত্রীকে ক্রোধান্ধ মানুষের সম্মুখীন করা, যার ফল অনুমান করাও কঠিন। আমাদের ছাত্রসমাজ সফল বিপ্লব ও বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশ গড়া ও সাজানোর কাজে নিজেদের উজাড় করে দিয়ে প্রশংসিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। রাস্তাঘাটে যদি তাদেরই হাতে বা তাদের নাম ভাঙিয়ে কোনো তৃতীয় পক্ষের হাতে প্রকাশ্যে ক্ষমতাচ্যুত রাজনীতিবিদরা হেনস্থা হতেন বা হতাহতের শিকার হতেন, তবে জাতি হিসেবে তা আমাদেরই কলঙ্কিত করত। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়,
আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অর্জন কম নয়। বিশ্ব দরবারে তাদের সঙ্গে দেশের অন্য বাহিনীর
সদস্যরা খ্যাতি অর্জন করেছেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে।
তাদের গৌরব-সম্মান-অর্জন সবই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সার্বিক ব্যর্থতাই ২০২৪-এ ছাত্রসমাজকে রাজপথে নামিয়েছিল। প্রথমে তারা মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য রাজপথে দাঁড়িয়ে তাদের গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু রাজনীতিবিদদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার কারণে তাদের দাবি আদায়ের ছোট জমায়েত আন্দোলন হয়ে বিপ্লবে পরিণত হয়। মানুষের বেঁচে থাকার ও বিচার পাওয়ার অধিকারকে যারা অসম্মান করেছে, আগে আর পরে তারাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সুতরাং অতীতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা রাজনীতির খোলসে থাকা অপরাধীদের আইনের আওতায় শাস্তি প্রদানই হবে বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত, আইন হাতে তুলে নেওয়া নয়। অপরাধীর বেঁচে থাকার ও বিচার পাওয়ার অধিকারকে অসম্মান বৈষম্যবিরোধী সমাজের চেতনা পরিপন্থি।
একটি দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশের অস্তিত্ব শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার মূর্ত প্রতীক। এ বাহিনী কদর্য হলে দেশের কী হয় আর পুরো বাহিনী হঠাৎ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললেই বা দেশের কী হয়Ñউভয় অভিজ্ঞতাই দেশবাসীর হয়েছে। তাই দ্রুততার সঙ্গে পুলিশের যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে রাষ্ট্রীয় অর্থে আবারও তাদের কর্মক্ষম করে তুলতে হবে এবং নতুন করে বিশুদ্ধ চেতনায় পথচলার সুযোগ করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। অতীতে পুলিশ পুনর্গঠনের নামে বহু বিদেশি তহবিল এসেছে এবং বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর পরও কোথায় ঘাটতি বা দুর্বলতা ছিল, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। নতুন করে এ দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কৌশল থাকতে হবে।
বিগত দিনে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা মনে হয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা কিংবা পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষÑযে-কেউ যেকোনো সময় আট-দশ বছরের জন্য কবরসম ঘরে নির্যাতিত হবেন কিংবা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারেন, এমন মানসিক চাপ নিয়ে মানুষ দিনাতিপাত করেছে। রাজনীতি করলেই সরকারি চাকরির আশীর্বাদে আলাদিনের চেরাগ কিংবা রাজনীতি করলে হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় এমন লালসা নিয়েই বড় হয়েছে একটি প্রজন্ম। নানা ইস্যুতে সমাজের স্তরে স্তরে বিভক্তি এবং সব প্রতিষ্ঠানে অনৈক্য ও অন্যকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছে বিগত দিনের শাসকরা। মনস্তাত্ত্বিক এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কত দিন লাগবে বলা মুশকিল।
ভেঙে পড়েছে দেশের আর্থিক খাত। একদিকে টাকা পাচার ও বৈদেশিক মুদ্রার খরা, অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপে বিপাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের টাকা কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই যথেচ্ছ ব্যবহার তথা লুটপাটের সংস্কৃতি পঙ্গু করে দিয়েছে ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারের মতো আর্থিক সব স্তম্ভ। অন্তর্বর্তী সরকারের থাকা তিন অর্থনীতিবিদকেই এ আর্থিক খাতকে টেনে তুলতে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কোন বৈদেশিক শক্তির কারণে আজ আমাদের এ পরিণতি কিংবা কার ইন্ধনে এ আন্দোলন বা বিপ্লব হলো, তা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ির সময় এখন নয়। এখন দেশের সবার একসঙ্গে চলতে হবে। এক সুরে মানবতার গান গাইতে হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নিয়ে তিক্ত আলোচনা, বিরূপ মন্তব্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজবের কারণে অতীতে অনেক মূল্য দিয়েছি আমরা। আর নয়। একই চাঁদ একই সূর্যের অকৃত্রিম আলোয় পবিত্র হোক সবার হৃদয়।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের দাবি নতুন নয়। যদি সুশাসন নিশ্চিত হয় তাহলে যেকোনো কিছুর অপচ্ছায়া অপসারিত হতে বাধ্য। নজর বাড়াতে হবে সুশাসনে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিগত রাজনৈতিক সরকারগুলো অঙ্গীকার কম করেনি, প্রতিশ্রুতি কম দেয়নি কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন ঘটেনি। অনাচার-দুরাচার অনেক ছড়িয়েছিল। ব্যক্তি বা মহল বিশেষের দাপটে অবস্থা হয়ে পড়েছিল ত্রাহি। আমরা এমনটির পুনরাবৃত্তি আর কোনো দিন দেখতে চাই না। বৈষম্যের ছায়া সরে সর্বত্র ছড়াক সাম্যের আলো। মনে রাখতে হবে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল ছাত্র-জনতা। এর সুফলভোগী যেন হয় সবাই। ব্যক্তি বা মহল বিশেষ যেন ফায়দা লুটে নিতে না পারে। আমরা বিশ্বাস করি, সমতা-সাম্য-অধিকারের পথ সুগম হলে এর আলো নিশ্চয় মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মেধাবী মানুষেরা এক হয়েছেন। তাদের কাছে সঙ্গত কারণেই আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। প্রত্যাশা পূরণে তারা সফল হবেন এও আশা রাখি। জনপ্রত্যাশা পূরণে যদি তারা সফল হন তাহলে এর সুফল বহুমুখী হতে বাধ্য। কেবল দেশ নয়, সারা বিশ্ব আজ তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। ৫৩ বছরের বাংলাদেশ এখনও সবার দেশ হয়ে ওঠেনি এ অভিযোগ যখন শুনি তখন খুব অন্তর্জ্বালা হয়। আমরা সর্বজনের বাংলাদেশ চাই। যদি সর্বজনের বাংলাদেশ গড়া যায় তাহলে জনঅভিযোগের ছায়া সরে যাবে। দেশ গড়ার কাজে দেশপ্রেমের চেয়ে বড় শক্তি নেই। এ শক্তি ধারণ করে আমাদের এগোতে হবে সামনে। দেশপ্রেম বোদে উজ্জীবিত সম্মিলিত শক্তিই কেবল পারে রাষ্ট্রের বিকাশে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে। বিনির্মাণের যে প্রত্যয় সামনে রয়েছে তা সফল হোক। রক্তগঙ্গা সাঁতরিয়ে যে বাংলাদেশ আমরা অর্জন করেছি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্বে, সেই বাংলাদেশকে নুতন করে গড়তে যূথবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। জয়ের বিস্তৃত খতিয়ানে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ হোক আরও আলোকোজ্জ্বল।