বিশ্ববিদ্যালয়
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩৭ এএম
আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৪ ১২:২৭ পিএম
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
‘ঘোড়ায় চড়ে হেঁটে
চলেছে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ শিরোনামে ১৮ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত
প্রতিবেদনে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবদুল বাসেতের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির
যে চিত্র উঠে এসেছে তা যেন আরব্য উপন্যাসের রূপকথাকেও হার মানায়। মধ্যযুগে প্রচলিত
সেই প্রবাদটি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে আবদুল বাসেতের ক্ষেত্রে। প্রবাদটি হলো, ‘ঘোড়ায় চড়িয়া
মর্দ হাঁটিয়া চলিল,/কিছু দূর গিয়া মর্দ রওনা হইল।/ছয় মাসের পথ মর্দ ছয় দিনে গেল!/লাখে
লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার,/শুমার করিয়া দেখি পঞ্চাশ হাজার…’ । ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু গত চার বছরেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের
স্থায়ী ক্যাম্পাস হয়নি এবং উল্লিখিত সময়ে উপাচার্য বাসেত তার ‘মগের মুল্লুক’ কায়েম
করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি সিলেট বিভাগ তো বটেই, ভাটি বাংলার স্বপ্নের একটি নাভিকেন্দ্র
হিসেবে জনমনে ব্যাপক উৎফুল্লের সৃষ্টি করলেও তা যেন ক্রমেই মিইয়ে যেতে বসেছে। আহারে,
আহা; এ যেন স্বপ্নের অপমৃত্যু।

বিশ্ববিদ্যালয়টি
শুরু থেকেই পড়েছে দ্বন্দ্ব-চক্রান্তের বেড়াজালে। হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য
অ্যাডভোকেট আবু জাহির ও হবিগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খানের
মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার স্থান নিয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। প্রথমে অ্যাডভোকেট
আবদুল মজিদ খানের ঐকান্তিক চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থান বানিয়াচং উপজেলার নাগুরা
কৃষি ফার্মে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নির্ধারিত হলেও শেষ পর্যন্ত ‘অতি ক্ষমতাবান’ সাবেক সংসদ
সদস্য আবু জাহির তা পাল্টিয়ে নিয়ে আসেন হবিগঞ্জ সদরের ভাদৈ এলাকায় একটি বাড়িতে (অস্থায়ী)।
চার বছর পরও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি!
অথচ বানিয়াচংয়ের নাগুরা কৃষি ফার্মটি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ছিল উপযুক্ত স্থান এবং
এখনও তা-ই। বিগত রাজনৈতিক সরকারের স্থানীয় ক্ষমতাবানদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিশ্ববিদ্যালয়টি
যাত্রার শুরুতেই ললাটে লেপ্টে যায় অনিশ্চয়তার দাগ। তবে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির হোতা
ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আবদুল বাসেত তার আখের গুছিয়ে নিতে কোনো প্রতিবন্ধকতার
মুখোমুখি হননি!
এমন আবদুল বাসেতের
সংখ্যা কম নয়। দেশের পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাবেক-বর্তমান অনেক উপাচার্যের
সঙ্গেই পেশাগত প্রয়োজনে আমার শ্রদ্ধা-স্নেহ-প্রীতির বন্ধন রয়েছে । সেই সূত্রে তাদের
অনেককেই নমস্য-প্রণম্য বলে সব সময়ই মনে হয়েছে এবং এখনও হয়। কিন্তু আবদুল বাসেতের মতো
নিমজ্জিত হিমশৈলীর চূড়ামাত্র হিসেবে চিহ্নিত উপাচার্যদের খতিয়ানও তো কম দীর্ঘ নয়। অনেকেরই
হয়তো মনে আছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত উপাচার্য ড. শিরিন আখতার দায়িত্বে থাকতে
এত অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন যে, তার পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষকরা দীর্ঘদিন আন্দোলন
করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে পদায়ন পাওয়ার জন্য জোর তদবির করে ব্যর্থ হয়ে নিকট অতীতে মেয়াদের
শেষ দিনে ৩৭ জন কর্মচারীকে তিনি বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দিয়ে সংবাদমাধ্যমে চরম নেতিবাচকভাবে
আলোচনায় এসেছিলেন। গত বছর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. সাদেকুল আরেফিনের
কাণ্ডকীর্তিও সচেতন মানুষমাত্রেই জানা। শেষ পর্যন্ত তার বিদায়েও ক্যাম্পাসে সাধারণ
শিক্ষার্থীরা মিষ্টি বিতরণ করে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। বাসেত, শিরিন, সাদেকুলদের ঘাড়ে
অনেক মাথা। আবারও বলি, তাদের সংখ্যা কম নয়। তাদের অনেক রাজনৈতিক ‘প্রভু’ ছিলেন যাদের
তুষ্ট করে তারা নিজেদের আখের গোছানোর পাশাপাশি এক একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের
দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছেন। মো. আবদুল বাসেত তাদেরই একজন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবদুল বাসেতের
দুর্নীতির যে খতিয়ান উঠে এসেছে, তাতে প্রতীয়মান হয় তিনি কত বড় কদাচারী। বিগত রাজনৈতিক
সরকারের আমলে তিনি তার রাজনৈতিক ‘প্রভু’দের তুষ্ট করে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে
শুধু অনাচারের চারণভূমিই করেননি, একই সঙ্গে নবজাতক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গলা টিপেও
ধরেন। একটি ভাড়া বাড়িতে কোনোরকমে চলছে এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। কিন্তু উপাচার্য
আবদুল বাসেত কোনোরকমে নয়, বরং সাড়ম্বরে জীবনযাপন করছেন। উপাচার্য নিয়োগের অন্যতম শর্ত
তাকে ক্যাম্পাসে থাকতে হবে। কিন্তু তিনি সেখানে অবস্থান করেন খুবই কম এবং নিয়মিত অফিসও
করেন না। তিনি সাড়ম্বরে তার চাকরিজীবন কাটাচ্ছেন সিলেট ও ঢাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী
একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট ও অর্থ কমিটির সভাও হয় ঢাকায়। বিস্ময়কর হলো, শিক্ষক নিয়োগ
থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী পর্যন্ত তার পছন্দের প্রার্থীরা চাকরি
বাগিয়ে নিয়েছেন এবং অধিকাংশ নিয়োগ ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে ঢাকায় বসে মুঠোফোনে পরীক্ষার আগের
রাতে প্রার্থীদের এসএমএস দিয়ে অবৈধ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করেন। সিংহভাগ প্রার্থী নিয়োগ
পরীক্ষায় ডাকও পাননি। তার স্থানীয় রাজনৈতিক ‘প্রভু’ সাবেক সংসদ সদস্যর পছন্দের লোকজনও
রয়েছেন অনেক এবং এ দুজনের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ পর্ব চূড়ান্ত হওয়ার
অভিযোগও রয়েছে বিস্তর।
আবদুল বাসেত ২০১৬
সালে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। তখন সেখানে বিভিন্ন বিভাগে
৫৫ জন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে প্রশাসন। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় তৎকালীন রেজিস্ট্রার
ড. বদরুল ইসলাম শোয়েবকে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন নিজের পছন্দের প্রার্থী নিয়োগ
দিতে চান আবদুল বাসেত। কিন্তু রেজিস্ট্রার শোয়েব তার অবৈধ দাবি না মানায় মো. আবদুল
বাসেত তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন এবং এর ফলে গড়ে ওঠা তীব্র আন্দোলনের মুখে তিনি
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে
গঠিত নীতিনির্ধারণী সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের কোনো কাঠামোয় হবিগঞ্জ তথা সিলেট
বিভাগের কোনো শিক্ষাবিদকে রাখেননি আবদুল বাসেত ও আবু জাহির। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়টিকে
আবদুল বাসেত ও আবু জাহির যে জায়গায় নিয়ে গেছেন সেখান থেকে উত্তরণ সহজ নয়। নিয়োগের
ভাগাভাগির ক্ষেত্রে শুধু আবদুল বাসেত সাবেক সংসদ সদস্য আবু জাহিরকেই তুষ্ট করেননি,
স্থানীয় আরও অনেক ‘বলবান’কেই তুষ্ট করে নিজের আখের গোছানোর পথ মসৃণ করেন।
নবজাতক হবিগঞ্জ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে উপাচার্য মো. আবদুল বাসেত কীভাবে পঙ্গু করে দিয়েছেন সেই বার্তা
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) পৌঁছলে সেখানের দায়িত্বশীলরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন
খোঁজখবর নিয়ে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুঃখজনক কিন্তু নির্মম সত্য হলো,
এই ‘খোঁজখবর’ নেওয়ার প্রক্রিয়াও কোনো অদৃশ্য কারণ বা ইশারায় যেন থেমে যায়। এভাবে দেশের
কত পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র বিবর্ণ হয়ে পড়েছে এর হিসাব মেলানোও ভার।
প্রশ্ন রাখতে চাই, ইউজিসি কর্তৃপক্ষের কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ কবে হবে? দেশের পরিবর্তিত
প্রেক্ষাপটে মো. আবদুল বাসেত সাবেক রাজনৈতিক ‘প্রভু’দের বদলে বর্তমান রাজনৈতিক ‘প্রভু’দের
আশ্রয় নিয়েছেন এমন অভিযোগও কম নয়। এও শোনা গেছে, নতুন রাজনৈতিক ‘প্রভু’দের তুষ্ট করতে
তাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী আরেক দফা নিয়োগপ্রক্রিয়া খুব দ্রুতই সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
দুর্মুখেরা এও বলেন, দুই কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলে মো.
আবদুল বাসেত হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদটি বাগিয়ে নেন এবং তার বিনিয়োগকৃত
অর্থের কয়েক গুণ বেশি ইতোমধ্যে কামাইও করে নিয়েছেন কদাচারের মধ্যে দিয়ে। আমাদের দাবি,
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আবদুল
বাসেতের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের তদন্তক্রমে প্রতিবিধান নিশ্চিত করুক। অবৈধ প্রক্রিয়ায়
যত নিয়োগ হয়েছে সব বাতিল করা হোক। একই সঙ্গে মৃতপ্রায় হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রাণসঞ্চারে করণীয় সব কিছু দ্রুত নিশ্চিত হোক।
ড. মো. আবদুল বাসেতরা হলেন শর্ষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভূত। তাদের আগাছা বললেও অত্যুক্তি হয় না। আগাছারা মাটির উর্বরাশক্তি তো খায়ই, মূল গাছও কখনও কখনও ঢেকে ফেলতে চায়। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে অবক্ষয়ের সর্বগ্রাসী ছায়া কতটা বিস্তৃত হয়ে পড়েছে উল্লিখিত ঘটনাগুলো এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্তমাত্র। ধারণা করা যায়, কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদন্তক্রমে আরও অনেক কদাচারের চিত্রই উঠে আসবে। দেশ-জাতির ঘাড়ে ব্যক্তি বা মহল বিশেষের কৃপায় জঞ্জাল মো. আবদুল বাসেতরা চেপে বসে থাকতে পারেন না। জটাজালের মতো জিইয়ে থাকা এই জঞ্জালদের সরাতেই হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে সুশাসন। অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা বরাবর আবেদন, এর যথাযথ প্রতিবিধানে বিলম্বে হলেও পদেক্ষপ নিন। লজ্জহীনতার অপসংস্কৃতি ও অপরাধপ্রবণতা সমাজে কীভাবে ক্রমেই জেঁকে বসেছে এরই একটি মাত্র দৃষ্টান্ত হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আবদুল বাসেত। রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বশীল সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কিংবা সদস্য কিংবা শীর্ষজন যখন লজ্জাহীনতার অপসৃংস্কৃতি কিংবা অপরাধের হোতা হন তখন সঙ্গত কারণেই দেশ-জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দাঁড়ায়। সর্বাবস্থায় প্রয়োজন শুদ্ধাচার ও জবাবদিহির পাঠ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কোনোভাবেই যাতে আর আবদুল বাসেতরা কোনো অনুকম্পা না পান তা-ও নিশ্চিত করা। আমরা জানি, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার জাতির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, সবকিছু সংস্কার করেই তারা পরবর্তী ধাপের পথ সুগম করবে। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় যেন এই সংস্কারের বাইরে না থাকে। দূর হ অন্ধকার, দূর হ।