মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২২ ১৮:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২ ১৬:৩২ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
আমরা জানি, যেকোনো দুর্র্ধর্ষ আসামি কিংবা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করতে সেই নিরিখেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু অতীতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে এবং আজ যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে প্রতীয়মান হয় - আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আমলে সতর্কতার বিষয়টি তেমনভাবে ছিল না। আজ ২০ নভেম্বর দুপুরে রাজধানীর রায়সাহেব বাজার মোড়সংলগ্ন ঢাকার সিজেএম আদালত ফটকের সামনে থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত সামির ও মোহাম্মদ আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিবকে তাদের সহযোগীরা ছিনিয়ে নেয়।
আমাদের স্মরণে আছে, অতীতে যখন এমন ঘটনা ঘটেছিল ময়মনসিংহে তখনও অনেক কথা শোনা গেছে। কিন্তু কার্যত ব্যবস্থা কি ততটা নেওয়া হয়েছিল? আজ ঢাকায় ফের যে ঘটনাটি ঘটল, তাতে আমাদের সামনে কয়েকটি বিষয় এসেছে। বিশ্বের দেশে দেশে জঙ্গিদের ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা অতীতে অনেক ঘটেছে। আজ ঢাকায় যে ঘটনাটি ঘটল, তাতে সেই পুরোনো প্রশ্নই আবার নতুন করে সামনে এসেছে, এই জঙ্গিদের ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না? ঘটনার পর দেশজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে পারলে দশ লাখ টাকা করে মোট কুড়ি লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। আগে সন্ধান করা জরুরি, কীভাবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার নকশা তাদের সহযোগীরা করেছে কিনা। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের মধ্যে কাউকে কাউকে ‘ম্যানেজ’ করে এমন ভয়ঙ্কর অপরাধের যোগসূত্রের জাল বোনার বিষয়টিও কারও মনে আসতেই পারে। আমি মনে করি, যদি এরকম কোনো সন্দেহের উদ্রেক হয়, তাহলে ত্বরিত এর উৎসে নজর দেওয়া জরুরি। দায়িত্ব পালনে যাদের ব্যর্থতার কারণে পুনর্বার এ ধরনের ঘটনা ঘটলো, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াসহ জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা জানি, সম্প্রতি দেশে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যানারে জঙ্গিরা ফের সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে সমতলের নতুন জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন আঁতাত দেশের স্থিতিশীলতার জন্য কিছুটা হলেও শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। সন্দেহ নেই, জঙ্গিবাদ কিংবা উগ্রবাদ নির্মূলে আমাদের আইনশৃঙ্খলারক্ষা বাহিনীর সদস্যদের যথেষ্ট সফলতা রয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি এও সত্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা পরিকল্পনা কিংবা কৌশলগত ত্রুটিও দেখছি। আজকের ঘটনার মধ্য দিয়ে ফের এ প্রশ্নও দাঁড়াল- এত গুরুতর মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের আদালত ফটকের সামনে থেকে ছিনিয়ে নেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢিলেঢালার বিরূপ ফল নয় কি? ছিনিয়ে নেওয়া জঙ্গিদের আটক করতে সাঁড়াশি অভিযান চালানো জরুরি। এই অভিযান হোক চিরুনি চালানোর মতো। আমরা যতোই মনে করি না কেন, দেশে জঙ্গি কার্যক্রম গুটিয়ে গেছে কিংবা জঙ্গিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এমনটি ঠিক নয়। ছোট পরিসরে হলেও তারা যে সক্রিয়, আজকের ঘটনাটি এরও নজির। কাজেই এ সবগুলো বিষয় আমলে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কৌশল ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে তাদের আরও সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি দুর্বলতাগুলো কাটানো প্রয়োজন।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (আইসিএলডিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক