শাসনব্যবস্থা
ড. মোহীত উল আলম
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৪ ১৩:০৩ পিএম
সামনের পথটি একান্ত বন্ধুর ও সতর্কতার। সাহস ও সঠিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন প্রতিটি ক্ষেত্রে। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পরিচালনায় নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর জাতির প্রত্যাশা চরমে। জাতি ভালো কিছু চায়। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু ধারণা পেশ করছি। শুরুতেই বলি, সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনগুলো নিয়ে। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংসদে বিলুপ্ত হওয়ার পর দলীয় রাজনৈতিক সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদের নির্বাচনগুলো জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ছিল না। ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফলে গঠিত সংসদগুলোয় জনরায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। প্রায় বলা যায় নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্যতা জাতির বিবেকের কাছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে গৃহীত ছিল না। অথচ এর বিপরীতে ১৯৯১ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো ছিল ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক, স্বতঃস্ফূর্ত ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল।
বৃক্ষের পরিচয় ফলে-এ কথাটা মেনে নিলে বাস্তবের নিরিখে বলতে হয়, আমাদের দেশে নিরপেক্ষ, অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচনগুলো সফল হয়েছিল এবং পক্ষান্তরে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো সফল হয়নি। তার পরও এখনকার অন্তর্বর্তী সরকারকে এক দিন না এক দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পথে যেতে হবে। তখন তাদের হাতে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবকাশ থাকবে। এক. সংবিধানে ডকট্রিন অব নেসেসিটির আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাতিল হওয়া আইনটি পরিমার্জনার মধ্য দিয়ে আবার সংবিধানে প্রতিস্থাপন করতে পারেন, যেটি পরে নির্বাচিত সংসদে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া যাবে। অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি জনমত যাচাইয়ের জন্য গণভোটের মাধ্যমে জায়েজ করে নিলে বর্তমানের অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো নৈতিকভাবে ও আইনগতভাবে দায়মুক্ত থাকবে।
আমাদের দেশের জাতীয় মানসিক গঠন বিবেচনা করলে হয়তো দেখা যাবে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার দ্বারা নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এ সরকারের একটি মৌলিক অসুবিধা হলো, তা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার নয় বিধায় এখানে স্বেচ্ছাচারী ও অগণতান্ত্রিক কিংবা তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা নেওয়ার পেছনের দরজাটা সব সময় খোলা থাকে। এজন্য গণভোটের মাধ্যমে জনমত যাচাইয়ের কথা বলেছিলাম। সরকার পরিচালনে পৃথিবীতে যত ধরনের রাজনৈতিক মতবাদ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে জটিল ও সফল পন্থা হচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকার। এটি মূলত পশ্চিমা সংস্কৃতির বিকাশের আধার এবং প্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো এটিকে প্রবর্তনযোগ্য মনে করলেও দেখা যায় কতিপয় দেশ ছাড়া (যেমন ভারত, জাপান) অন্য দেশগুলো এটিকে ঠিক রপ্ত করতে পারেনি। পশ্চিমা এ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মূল ধারণা হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতা। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম চিন্তক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত হতে না পারি, কিন্তু তোমার মতামত ব্যক্ত করার স্বাধীনতা রক্ষার্থে দরকার হলে আমি জীবন দেব।’ আমাদের সমাজে এ ধরনের উদারতার কথা হয়তো চিন্তাও করা যাবে না। বিরোধী মতকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক পশ্চিমা দেশমাত্রই বিদ্যমান।
আমাদের দেশে দলীয় রাজনৈতিক সরকারের অধীনে দেশ পরিচালনার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো দলীয় আনুগত্যের সঙ্গে মেধা কিংবা যোগ্যতা গুলিয়ে ফেলা। এটির বড় উদাহরণ হলেন ড. ইউনূস নিজেই। পূর্বতন সরকার তাকে দলীয় আদর্শের বাইরের লোক মনে করায় তাকে হেনস্থার চূড়ান্ত করেছিল। অথচ দলীয় আনুগত্য আর মেধা দুটি পরস্পর নিরপেক্ষ উপকরণ। দলীয় আনুগত্যধারী লোক মেধাবী বা যোগ্য হতেও পারে, না-ও হতে পারে। কিন্তু দলীয় আনুগত্য প্রায়ই আদর্শের চেয়েও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ব্যক্তিপুজোয় রূপ নেয়। তখন মানুষ দেশ দেখে, সমাজ দেখে নেতা যেভাবে দেখে সেভাবে। কিন্তু মেধা হচ্ছে ব্যক্তিমানুষের প্রতিভা, দূরদর্শিতা ও কর্মস্পৃহার একটি সম্মিলন, যার কিছুটা পরিবার ও সমাজ দিয়ে তৈরি কিন্তু বেশিরভাগই ঈশ্বরপ্রদত্ত। মেধা সব সময় প্রশ্ন করবে, চ্যালেঞ্জ করবে, বদলাতে চাইবে এবং তাই মেধাকে দলীয় আনুগত্যের ছাদনাতলায় পোষ মানানো কঠিন।
তার পরও মেধাবী লোকেরা সাহসের অভাবে কিংবা আরও নানান রকমের হিসাবের কারণে হয়তো দলীয় আনুগত্য মেনে নেয়; কিংবা চুপচাপ থাকে কিংবা মেকি একটা অবয়ব নিয়ে থাকে। তবে দিনের শেষে কথা হলো, মেধার আপসকামী শ্রেণিচরিত্রের কথা যদি মেনেও নিই, তার পরও মেধার বা সরল অর্থে বুদ্ধির কোনো বিকল্প নেই, তদুপরি রাজনৈতিক কূটনৈতিক বুদ্ধির তো বিকল্প নেই-ই। গোঁয়ার্তুমি, আস্ফালন, বাগাড়ম্বরতা ইত্যাদি আপাতদৃষ্টে মনে হয় সহজ ও মোক্ষম পথ, কিন্তু দিন শেষে এটি মেধার কাছে পরাজিত হবেই। মানবসভ্যতা তা-ই বলে। অন্ধ দলীয় আনুগত্যকে যদি পেশির সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে মেধার জগৎ হলো মগজে। এ মগজ, বুদ্ধি বা মেধার ব্যাপারটি বিগত সময়গুলোয় সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হয়েছিল বলে আমার ধারণা।
মেধারও একটি সমস্যা আছে। এটি একটি ছুরির মতো। ছুরি দিয়ে যেমন পেঁয়াজ কাটা যায়, তেমন মানুষও খুন করা যায়। অপরাধবিজ্ঞানে বলা হয়, অপরাধীরা অতিশয় মেধাবী হয়। বলা বাহুল্য, ইহুদি নিধনকারী, মানবজাতির শত্রু অ্যাডলফ্ হিটলার কম মেধাবী ছিলেন না। তাই মেধাকে সুপথে পরিচালিত করার জন্য একটি রাজনৈতিক আবহ দরকার যেখানে নৈতিকতা ও যুক্তির চর্চা সমভাবে হবে। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিই। ভারতের জনপ্রিয় লেখক খুশবন্ত সিংয়ের আত্মজীবনী ‘ট্রুথ, লাইজ অ্যান্ড আ লিটল ম্যালিস’ গ্রন্থে সিং লিখছেন, ১৯৮৪ সালে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির আক্রমণ করার পর শিখ সম্প্রদায়ের নেতা জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে নিহত হলে সারা ভারতে অস্থির পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তখন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে সারা ভারতের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের একটি বৈঠক ডাকেন। তখন খুশবন্ত সিং ছিলেন মুম্বাই থেকে প্রকাশিত ‘ইলাসট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া’র সম্পাদক এবং সেই সূত্রে নিমন্ত্রণপ্রাপ্ত। বৈঠকে আলোচনার এক পর্যায়ে ইন্দিরা গান্ধী খুশবন্তকে বলেন, ‘সর্দারজি, আপনি ভারতের এক নম্বরের সাংবাদিক হতে পারেন, কিন্তু আপনি রাজনীতির কিচ্ছু বোঝেন না।’ সঙ্গে সঙ্গে খুশবন্ত সিং জবাব দেন, ‘মিসেস প্রাইম মিনিস্টার, আমি রাজনীতির কিচ্ছু বুঝতে না পারি, কিন্তু এটি বুঝি যে যেটা নৈতিকভাবে ঠিক নয়, সেটি রাজনৈতিকভাবেও ঠিক হতে পারে না।’
আমার মনে হয় পূর্বতন সরকারের জাতীয় মানস বুঝতে পারার মধ্যে নৈতিকতার অভাব ছিল। এক হলো, সংসদীয় নির্বাচনগুলো ছিল নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য, আরেকটি হলো একটি কর্তৃত্ববাদী আচরণ সর্বত্র এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকে গিয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এমনও মনে হয়েছিল, যেটি উইলিয়াম শেকসপিয়র তার সনেট ৬৬-তে বলে গেছেনÑযখন মূর্খরা শিক্ষিতের মুখে টোপর পরায়, বা যেটি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘যারা অন্ধ, আজ সবচেয়ে বেশি চোখে দেখে তারা’। অর্থাৎ বৃহত্তর জনগণের মধ্যে তারা যেন শিশু, তারা যেন কিছু বোঝে না এ রকম একটি অভিঘাত তৈরির প্রচেষ্টা রাজনৈতিকভাবে হয়েছিল।
এ নৈতিকতার অভাব বা পরমত সহ্য করার অভাব যুক্তির অভাবে পরিণত হয়। আমরা আমাদের লেখালেখিতে নানানভাবে আকারে ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছিলাম যে, হাজার হাজার কোটি টাকার লোপাটের সঙ্গে জনগণের আস্থার অভাবের সম্পর্ক আছে, কিন্তু মনোযোগ দেওয়া হয়নি এসব কথায়। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম যে খাদটি বেশি দূরে নয়, কিন্তু বারবার বিশ্বাস করানোর চেষ্টা চলছিল যে খাদটি মোটেও কোথাও নেই। এবং এ উটপাখিসম অন্ধতার ফল হলো ছাত্রদের একটি সামান্য সহজে সমাধানযোগ্য সমস্যা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রূপ নিল। বিস্ময়করভাবে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সরকারের খুব অল্প দিনে পতন ঘটল।
সরকারের এ পতনকে অনেকে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ফসল মনে করছেন, আমিও তাই মনে করি। কিন্তু একটি দেশে বিপ্লব ঘটানো তখনই সম্ভব যখন দেশের ভেতরের জনগণের এটির প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকে। কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় এ কথাটি বাদ দেওয়া যাবে না যে, সারা দেশে দলীয় এবং নির্দলীয় সব স্তরের লাখ লাখ মানুষ বৈষম্যবিরোধীদের এক দফার ডাকে সাড়া দিয়েছিল। তবে শুরুতেই বলেছি, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনের পথটি, কবি নজরুলের ভাষায়, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’। জনগণ এখন অন্তর্বর্তী সরকার মেনে নিয়েছে। বিশেষ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো সর্বজনমান্য ব্যক্তিবর্গকে উপদেষ্টা করার ফলে মানুষ খুশি , কেননা এরা প্রত্যেকেই যাকে বলে সমস্যাসচেতন যার যার ক্ষেত্রে। এরা যদি অহেতুক এলিটিজমে না ভোগেন এবং দলমতনিরপেক্ষভাবে কোনো অযাচিত প্রভাব ও প্রতিপত্তির কাছে নতি স্বীকার না করে দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত থাকেন, তাহলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াবে। তবে একটা নির্বাচন তো দিতেই হবেÑআজ হোক, কাল হোক।
এখানে ছোট্ট একটা কথা বলি। দলীয় রাজনীতির যে ব্যক্তিস্তুতিনির্ভর শক্তিশালী কিন্তু নির্বোধ অপসংস্কৃতি আমরা তৈরি করেছি, দেশ আবার সেই প্রান্তিকে ফিরে যাওয়া কল্যাণকর মনে করি না। অর্থাৎ রামের জায়গায় শ্যাম এনে দেশের আপামর জনগণের কোনো কল্যাণ হবে না। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কীভাবে একটি সহনশীল, দলের বাইরে দেশÑএ ধরনের সংস্কৃতি তৈরি করানো যায়, সে ব্যাপারেও এ সরকার একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে; যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য সংলাপের বাতাবরণ তৈরি করবেন। এই প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হলেই কেবল বর্তমান সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আরেকটি কাজ হবে যেসব টাকা পাচার হয়েছে সেগুলো ফেরত আনার ব্যবস্থা করা। অর্থ পাচারকারী ও সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের আইনের আওতায় আনা।