× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্থানীয় সরকার

কাঠামো শক্তিশালী করে স্বশাসন দিন

ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৪৪ এএম

ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ

ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ

চলতি বছর এক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন পরিসরে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রা শুরু হওয়ার ক্ষেত্রে সংস্কার ও সামাজিক সংহতি বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে বিধায় আশাবাদী হতে হয়। তবে একটি স্থিতিশীল সরকারের পতন ঘটায় সার্বিক প্রশাসনিক কাঠামো এখনও নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কাজ করার প্রস্তুতিপর্বে রয়েছে। ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় যেমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্য খাতের স্থিতিশীলতা এখনও নিশ্চিত করা যাচ্ছে নাÑ তবে প্রত্যাশা সুসমন্বিত হোক। যখন এ লেখাটি লিখছি তখন জানা গেল দেশের সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়েছে এবং তাদের জায়গায় সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ৬০ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সব পৌরসভার মেয়রকেও অপসারণ করার খবর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। আমি মনে করি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কোনো প্রয়োজন নেই। একইসঙ্গে এও মনে করি, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে সংস্কারের জন্য একটি কমিশন গঠন প্রয়োজন।

আমরা দেখেছি, বিগত এক সপ্তাহে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাহীনতা বেশ কিছু সংকট সৃষ্টি করেছে। তবে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ তাদের নাগরিক দায়িত্বের যে পরিচয় দিয়েছে তা দেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের অনন্য সংযোজন। ভারতীয় গণমাধ্যম এখনও এখানে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছেÑ এমন তথ্য প্রচার করছে। তবে এখনও উল্লেখযোগ্য কিংবা বড় ধরনের কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। এই মুহূর্তে সংখ্যালঘু বা কোনো ব্যক্তির গায়ে দলীয় পরিচয়ের সিল না মেরে আমাদের বাংলাদেশি পরিচয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে নামতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের স্থানীয় সরকারকে যদি প্রক্রিয়াগতভাবে চালু করা যায়, তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়। গত বুধবার স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বলা হয়েছিল, যেসব উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও প্যানেল চেয়ারম্যান কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন, সেসব উপজেলায় জনসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং তা হলোওএই মুহূর্তে সারা দেশে জননিরাপত্তাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে কার্যকর ফল পাওয়ার জন্য স্থানীয় সরকারকে সক্রিয় করার বিকল্প নেই। তবে আমাদের স্থানীয় সরকার কাঠামোর সংস্কারের বিষয়টিকেও ব্যাপক গুরুত্ব দিতে হবে। যদি এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে সহযোগিতা না করতে পারে, তাহলে এই সরকারব্যবস্থাকে বিলোপ করে দেওয়াই সমুচিত বলে মনে করিÑএকথা আগেও বলেছি।

অতীতে এই স্তম্ভেই লিখেছি, দেশে স্থানীয় সরকার ধারণাটি কাঠামোগতভাবে ভুল। স্থানীয় সরকার কাঠামো সব সময় সরকারের একটি বর্ধিতাংশ হিসেবে কাজ করেছে। অথচ যে উদ্দেশ্য নিয়ে স্থানীয় সরকার গড়ে তোলা হয়েছিল তার সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা কখনই করা হয়নি। স্থানীয় সরকারের যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে সেগুলোতে এখন কঠিন বার্তা পৌঁছে দেওয়া উচিত। যেসব উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রয়েছেন তাদের বলতে হবে, আপনাদের ভোটারদের নিরাপত্তা যদি আপনারা নিশ্চিত করতে না পারেন তাহলে বিলম্বে স্বপদ থেকে সরে যান। এই মুহূর্তে যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তুতিপর্ব তাই দেশের নাজুক সময়ে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে এলাকা পাহারা দেওয়া, এলাকায় চাঁদাবাজি রোধ, বাজার মনিটরিং করার পাশাপাশি দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের নানা ভালো পদক্ষেপে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে তা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শোভাবর্ধন করবে এবং একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে আস্থা গড়ে উঠবে। আর যদি তা না করতে পারে, তাহলে এই সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়াই ভালো। স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য বরাদ্দ রয়েছে। তার সুষম বণ্টন এখন নিশ্চিত করার নতুন সময় এসেছে। কিন্তু এই কাঠামোই যদি জনগণের স্বার্থে না আসে তাহলে বরং এই কাঠামো বিলোপ করে দেওয়াই শ্রেয়। অর্থনীতির নাজুক এই সময়ে যখন আমাদের সাশ্রয়ের পথে যেতে হবে তখন এমন অকেজো কাঠামো রাখার প্রয়োজন নেই।

এ কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাদের স্বশাসন ক্ষমতা দেওয়া জরুরি। এই সরকারব্যবস্থা তার নিজস্ব এলাকার কর আদায় থেকে শুরু করে সব ধরনের নাগরিক সেবার দায়িত্বে থাকবে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থাপনার বিকেন্দ্রীকরণ ত্বরান্বিত হয়। ১৮৮১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা তাদের দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর অনুকরণে এখানেও এই সরকারব্যবস্থার প্রচলন করে। উল্লেখ্য, তাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা তখন বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছিল। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড রিপনই মূলত এখানে ও পাঞ্জাবে এই সরকারকাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তবে ১৮৮৩ সালে লর্ড রিপন দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় তার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। যদি ওই সময় এ স্থানীয় সরকার কাঠামো গড়ে তোলা যেত, তাহলে সেটিই সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হয়ে উঠত। পরবর্তীতে সিভিল ব্যুরোক্রেসি শক্তিশালী হয়ে যাওয়ায় দেশে স্থানীয় সরকার কাঠামো সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। অথচ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে স্থানীয় সরকারই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আমরা দেখেছি পঞ্চায়েত ব্যবস্থা রয়েছে। তা ছাড়া বিশ্বের অনেক স্থানেই স্থানীয় সরকার কাঠামো রয়েছে, যারা নিজেরা স্বশাসন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার কাঠামোর পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমরা দেখেছি, দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সংস্কারের তুলনায় স্থানীয় সরকার কাঠামোর সংস্কারকে পরীক্ষামূলকভাবে দেখা যেতে পারে। আমরা দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারই সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। কিন্তু ২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই তুলে দেওয়া হলো। এরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজিত হয়েছে এবং এই তিনটি নির্বাচনের বিষয়েই ভোটারের অসন্তোষ বারবার উঠে এসেছে। এমনকি স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন নিয়েও নানাবিধ অভিযোগ উঠে এসেছে। অথচ স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রতিটি নির্বাচনই উৎসবমুখর পরিবেশে হয়ে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে ভোটারের দূরত্ব তৈরি হয়েছেÑ এমনকি নাগরিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা বেড়েছে। এই দূরত্বের সুযোগ নিয়েই বেড়েছে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনিয়ম। এমনকি প্রশাসনের ক্ষমতাও নানাভাবে রাজনৈতিক প্রভাবে হ্রাস পেয়েছে। এসব সমস্যা দূর করার জন্যই এই পুরোনো কাঠামোর সংস্কার জরুরি, পরিবর্তন নয়। পরিবর্তন মানে একদমই নতুনভাবে গড়া। কিন্তু আমাদের যে কাঠামোর ক্ষতি হয়েছে তা সংস্কার করলে আমরা কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা পেতে পারি। তারপরও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকবেন। তার সঙ্গে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে সংযুক্ত করে নির্দিষ্ট কার্যালয় ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। এমনকি স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম সুচারু করার জন্য একজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মতো বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগের অধ্যাপক বা সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা যেতে পারে।

স্থানীয় সরকার যেন পরিকল্পনা, কর আদায়, স্থানীয় উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার কাজগুলো নিজেদের স্থানীয় বৈশিষষ্ট্য অনুসারে নিতে পারে তেমন একটি সমন্বয়মূলক ব্যবস্থায় যেতে পারলে ভালো হয়। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকারকে মূলত অর্থায়ন করে থাকে। কিন্তু এই অর্থায়নের প্রক্রিয়া রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় স্থানীয় সরকারের সম্পদ বণ্টনের বৈষম্যের অভিযোগ প্রায়শই পাওয়া যায়। এই বণ্টনের ক্ষমতা রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর থাকায় অনেক অঞ্চলেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নয়ন হচ্ছে না। তাই স্থানীয় সরকার কাঠামোর স্বশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কাঠামোর অধীনে বিভিন্ন সামাজিক জরিপ পরিচালনাও করা যেতে পারে। এসব জরিপ পরিচালনায় থাকবেন একজন বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের এসব কাজে অন্তর্ভুক্ত করে সামাজিক গবেষণার সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। এগুলো অনেক সময় স্থানীয় বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সামাজিক কর্মসূচি নির্ধারণে মাঠ পর্যায়ের তথ্য হিসেবে কাজ করে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রের সংস্কারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তাদের যদি এভাবে সুযোগ করে দেওয়া যায়, তাহলে তারা সরাসরি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করবে। আর এই কাজগুলো আমরা পরীক্ষামূলকভাবে স্থানীয় সরকার কাঠামোর মাধ্যমেই আদায় করতে পারি।

দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় সরকার কাঠামো নিয়ে গবেষণা করছি, লিখছি। অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, এ বিষয়টি নিয়ে এখনও যে বড় পরিসরে ভাবা হয়েছে বা হচ্ছে এমনটি বলা যাবে না। তবে সময় পরিবর্তনের এই সময়ে আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে রাজনীতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বিকেন্দ্রীকরণের। সেই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে হবে।

  • স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা