শিক্ষা
মাহরুফ চৌধুরী, তানভীর আহমেদ, সাজেদুর রহমান ও এটিএম শাফিউল আলম
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৪০ এএম
বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়
ছাত্র-জনতার সম্মিলিত গণঅভ্যুত্থান ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়
সংস্কার তথা বিনির্মাণ। নতুন প্রজন্ম বিনির্মাণের দাবি তুলেছে এবং হাত লাগিয়েছে
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মকাণ্ডে। কাজের মাধ্যমেই তারা দৃষ্টান্ত স্থাপনের
প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেটাও প্রশংসিত হয়েছে সর্বত্রই। মানব উন্নয়নের
গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক হাতিয়ার শিক্ষা। বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়তে শিক্ষাব্যবস্থাকে
শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। এই
বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় প্রাধান্য দিতে হবে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মৌলিক
সঙ্ঘবদ্ধতার শক্তি ‘বৈষম্য’ ও ‘স্বৈরাচার’
বিরোধী অবস্থান। সেটাকে অঙ্গীকার করেই শিক্ষাব্যবস্থাকে
নতুন করে গড়তে হবে,
যাতে আমরা বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে
পারি। সক্ষম ও সচল শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হলো।
এক্ষেত্রে প্রথম কাজ হতে হবে শিক্ষা প্রশাসনের পুনর্গঠন। আমাদের
শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি মন্ত্রণালয়ই যথেষ্ট। শিক্ষাকে একটা সেক্টর হিসেবে
বিবেচনা করে, সেই সেক্টরের মাঝে কয়েকটা সাব-সেক্টর থাকতে পারে। যেমনÑ শিশু-কিশোর
ও প্রাথমিক শিক্ষা,
মাধ্যমিক শিক্ষা, পেশাগত ও কারিগরি শিক্ষা, বয়স্ক, অব্যাহত
ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য
একজন মন্ত্রী ও প্রতিটি সাব-সেক্টরের একজন করে প্রতিমন্ত্রী থাকতে পারেন। অথবা
একাধিক সাব-সেক্টরের জন্যও একজন প্রতিমন্ত্রী থাকতে পারেন। শিক্ষার পরিকল্পনায়
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ যেখানে প্রাধান্য পাওয়ার কথা, সেখানে
প্রায়শই প্ৰশাসনিক ব্যক্তিবর্গের প্রভাব দেখা যায়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার
স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। শিক্ষা প্রশাসনের মূল কাজ শিক্ষা পরিকল্পনা
ফলপ্রসূভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রশাসনের
মূল কাজ হওয়া উচিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা।
দ্বিতীয়ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত
করা। প্রয়োজনে আইন করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নামে বেনাম দলীয় রাজনীতির
লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক
নিয়োগ প্রভৃতির ক্ষেত্রে দলীয়করণ করা প্রতিরোধ করতে হবে এবং কেউ এসব কাজ করলে
অথবা জড়িত থাকলে,
তাকে আইনের আওতায় শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক ও
শিক্ষার্থীদের রাজনীতি যদি করতেই হয়, সেটা সীমাবদ্ধ থাকতে হবে
নিজেদের অধিকার আদায়,
শিক্ষার পরিবেশ ও মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত
বিষয়গুলোর মধ্যে। প্রকৃতপক্ষে পেশাজীবীর কোনো দলীয় পরিচয়
থাকতে পারে না। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীসহ কোনো পেশাজীবী নামে-বেনামে
দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে না। যদি তারা সেটা করেন, তবে
তাদের নিজ নিজ পদ ও পেশা ত্যাগ করেই সেটা করতে হবে।
তৃতীয়ত শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও জ্ঞান বিকাশে বিকেন্দ্রিক
শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের
আগ্রহ অনুযায়ী জানা ও শেখার সুযোগ তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সৃজনশীলতা বিকাশের
সুযোগ করে দিতে হবে। শিক্ষাকে শুধু শ্রেণীকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষাক্রমের গণ্ডিতে বদ্ধ
না করে, বিকেন্দ্রিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের
সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে।
চতুর্থত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কার করা প্রয়োজন।
সর্বস্তরে শিক্ষক নিয়োগে শুধু মৌখিক পরীক্ষা কিংবা লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক
নিয়োগ চূড়ান্ত করা যাবে না। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ
নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে, নিয়োগ পরীক্ষা ও
সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর সাময়িক নিয়োগ প্রদান করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে সাময়িক নিয়োগের সময়কালের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচার-ব্যবহার ও তাদের সহায়তা করার বিষয়াদি
মূল্যায়নের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নিয়োগ প্রদান করতে হবে।
পঞ্চমত শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূরীকরণ ও সমমর্যাদা
নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে প্রচলিত নানামুখী শিক্ষাধারা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
কারণে যে বৈষম্য বা শ্রেণীকরণ দৃষ্টিগোচর হয়, সেটা বন্ধ করতে হবে। সাধারণ
ধারা, ইংরেজি মাধ্যম ধারা ও মাদ্রাসা ধারার শিক্ষার্থীর প্রতি যেসব
পক্ষপাতিত্ব বা বৈরিতা রয়েছে; সেগুলো বন্ধ করতে হবে। যেকোনো ধারায় বা
প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। বিদ্যমান ধারা বা
প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে যদি শিক্ষার গুণগত মানে অসমতা থাকে কিংবা জ্ঞান ও দক্ষতার
ক্ষেত্রে কোনো রকমের শূন্যতা থাকে, সেসব পূরণের
ব্যবস্থা করতে হবে।
ষষ্ঠত ছাত্রজীবনে কাজের অভিজ্ঞতা ও অর্থ উপার্জনের সুযোগ
থাকা বাঞ্ছনীয়। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি
প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করা একাধিক কারণে অত্যন্ত জরুরি। ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় সংকটকালীন
এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, যা তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে অপরিহার্য করে তোলে। এই অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখবে এবং তাদের
বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন, অর্থ উপার্জন ও জীবনের বাস্তবতা উপলব্ধি
করতে সহায়তা করবে। তা ছাড়া এটি তাদের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা বিকাশে, দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে সহায়ক হবে;
যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। যে শিক্ষার্থীরা
স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এই ধরনের কার্যক্রমে জড়িত থাকবে,
তাদের সেই অভিজ্ঞতার জন্য বিশেষ সনদ প্রদান করা যেতে পারে।
সপ্তমভাগে গবেষণালব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতেই শিক্ষাব্যবস্থায়
পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আমরা অতীতে লক্ষ করেছি, যেকোনো রাজনৈতিক দলই সরকারি ক্ষমতায় এসে শিক্ষাব্যবস্থার খোল নলচে পালটে
ফেলার চেষ্টা করে। এতে করে একদিকে ধারাবাহিকতার অভাবে শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়
এবং অপরদিকে শিক্ষকদের কাজ বাড়ে। ফলে অনেক ভালো পদক্ষেপেরও সুফল পাওয়া যায় না।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেডিং পদ্ধতির পরিবর্তন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই ক্ষেত্রে
লক্ষণীয় যে, সমস্যার মূলে না গিয়ে বাহ্যিক কিছু পরিবর্তন
আনা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীর কোনো উপকার তো হয়েইনি, বরং
সমস্যা আরও বেড়েছে। শিক্ষায় যেকোনো পরিবর্ধন, পরিবর্তন ও
পরিমার্জন কর্মকাণ্ড গবেষণালব্ধ তথ্য ও উপাত্তনির্ভর হওয়া উচিত।
অষ্টম ভাগে শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে
ব্যবহার করতে না দেওয়া। অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলো শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে তাদের
দলীয় ধ্যানধারণা এবং মতাদর্শ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে।
অথচ জাতীয় শিক্ষার লক্ষ্য কখনই দলীয় মতাদর্শ প্রচার করা নয়। শিক্ষার মূল লক্ষ্যই
হলো ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উৎকর্ষ সাধনের জন্য
মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও মননশীলতার উন্নয়ন। কাজেই জাতীয়
শিক্ষাব্যবস্থা যাতে কোনোভাবেই কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষায়
ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
নবমপর্বে শিক্ষা সম্পর্কে জনমনে বিদ্যমান বিভ্রান্তি
দূরীকরণ ও সঠিক ধারণার প্রচার প্রয়োজন। শিক্ষাবিষয়ক কিছু মৌলিক ধারণা সম্পর্ক
জনমনে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে এবং সেগুলোকে জনগণের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরা।
বিভ্রান্তি দূর করতে নানা কলাকৌশল অবলম্বন করা। একমুখী শিক্ষার ধারণাকে উদাহরণ
হিসেবে উল্লেখ করা যায়। আমরা মনে করি, একমুখী
শিক্ষার ধারণাটা হচ্ছে প্রতিটি নাগরিক যে ধারা বা প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করুক না
কেন, সবারই মন ও মনন গড়ে উঠবে আমাদের রাষ্ট্রীয় দর্শন,
আদর্শ এবং নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও আনুগত্যের ভিত্তিতে।
জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা শাখা-প্রশাখাকে একত্রিত করে শেখানোকে একমুখী শিক্ষা বলে না। এ
ধরনের আরও অনেক ধারণা আছে যেগুলোকে দূর করা জরুরি।
দেশের সচেতন প্রত্যেক নাগরিকের দাবি বৈষম্যমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। আমরা আশা করব, শিগগিরই আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বির্নিমাণে কাজ শুরু করবে এবং নিবন্ধে আলোচ্য বিষয়গুলো গুরুত্বসহ বিবেচনা করবে। আমরা আগামীতে উপরোক্ত সুপারিশ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন নিবন্ধে আরও বিস্তারিত আলোচনা করার আশা রাখছি। আন্দোলন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠবে, যখন আমরা একটা গণমুখী ও জীবন-জীবিকামুখী বাস্তবসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হব। বিপ্লবী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সুযোগ আমাদের হাতে এসেছে, তাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার বির্নিমাণ করতে হবে। আমরা আশা করছি, জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে শহীদদের আত্মত্যাগকে অর্থবহ করতে এবং দেশের গণদাবিকে বাস্তবায়িত করতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করে নব প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের হতাশা থেকে মুক্তি দেবে। আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বিনির্মাণের প্রত্যাশায় রইলাম।