× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অধিকার

ধ‍‍র্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা জরুরি

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৫৬ এএম

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

সমাজমাধ্যমে একটা পোস্টার ঘুরে বেড়াচ্ছে যেখানে লেখা আছে, সরকার বদলায় কিন্তু সংখ্যালঘুর ভাগ্য বদলায় না।’ সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত ধ‍‍র্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আবারও সামনে চলে এসেছে। রাজনৈতিক ডামাডোলের একটা সময়-স্পেসিফিক আলোচনার বাইরেও আমরা আমাদের পরিচিত মহলে প্রায়ই বলতে শুনি, সরকার আসে সরকার যায়, ভেদাভেদ নেই সংখ্যালঘু হামলায়।’ ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় যে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা এবং ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে তার মধ্যে অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল ধ‍‍র্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু। অনেকে একে এভাবে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন যে, বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বঞ্চিত, নিপীড়িত, নি‍র্যাতিত এবং বহুবিধ বৈষম্যের শিকার মানুষ নিজেদের রাগ, ক্ষোভ এবং জ্বালা মেটানোর জন্য আওয়ামী লীগের নানান স্থাপনায় হামলা করেছে, ভাঙচুর করেছে, নাশকতা করেছে এবং জ্বালিয়ে দিয়েছে। রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশের জন্য এভাবে জ্বালাও-পোড়াও ঠিক নাকি বেঠিক সে বিত‍‍র্কে যাব না।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑধ‍‍র্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর বসতভিটায় হামলা করা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, মন্দির ধ্বংস করা এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পতনের সম্প‍‍র্ক কী? আওয়ামী লীগের পতন হলে সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা করতে হবে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কেননা যখনই নি‍র্বাচন হয় কিংবা সরকার পতনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়, তখনই সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসে সাম্প্রদায়িক হামলা, ভাঙচুর, নাশকতা এবং ধ্বংসযজ্ঞ। যদি আমরা ১৯৯০ সালকে ধরে নিই গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা, সেই ১৯৯০ সাল থেকে দেখছি, আওয়ামী লীগ নি‍র্বাচনে জয়লাভ করলে পরাজিতরা সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা করে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়। আবার বিএনপি জয়লাভ করলে সংখ্যালঘুদের আওয়ালী লীগের দোসর মনে করে তাদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে বিজয়ের উৎসব করে! কিন্তু এবার কেন হলো বা হচ্ছে? বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে যে বিজয়, সে বিজয়ের পরপরই কেন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা? এ প্রশ্নের আদৌ কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর আছে কি না আমার জানা নেই।

প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় উল্লেখ্য, জাতিগত সংখ্যালঘু বা আদিবাসী জনগোষ্ঠী জাতিসত্তার জায়গা থেকে সংখ্যালঘু হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ধ‍‍র্মীয় বিবেচনায়ও সংখ্যালঘু। কেননা বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধ‍‍র্ম হচ্ছে ইসলাম কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ হচ্ছে মোটাদাগে অমুসলিম। তাদের কেউ সনাতন ধর্মাবলম্বী, কেউ বা রূপান্তরিত খ্রিস্টান, কেউ বা বুড্ডিস্ট, কেউ বা প্রকৃতিপূজারী (আমরা অ্যাকাডোমিক ভাষায় বলি রিচুয়ালিস্ট)। কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিম নেই বললেই চলে। ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ‘বাই-ডিফল্ট’ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অন্ত‍‍র্গত। অ‍‍র্থাৎ জনতাত্ত্বিক বাছবিচারে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী হচ্ছে ‘ডাবল মাইনরিটি’ : জাতিগত সংখ্যালঘু ও ধ‍‍র্মীয় সংখ্যালঘু। সে কারণেই যখন সংখ্যালঘুর ওপর কোনো সাম্প্রদায়িক হামলা হয়, তখন আদিবাসী জনগোষ্ঠীও বিপুলভাবে আক্রান্ত হয়।

সংবাদমাধ্যম এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারা দেশে ৫২ জেলায় কমপক্ষে ২০৫টি হামলা ঘটেছে। কেবল ৫ ও ৬ আগস্ট দুই দিনেই ২ শতাধিক সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে বলে ৭ আগস্ট সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশিত হয় যার জন্য বাংলাদেশ পাবলিক ইউনিভা‍র্সিটি টিচা‍র্স নেটওয়া‍র্ক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক প্রেস কনফারেন্সে বলেন, ‘অনেক মন্দির হামলার পর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অনেক নারী নিগৃহীত হয়েছেন। কয়েকটি স্থানে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। আক্রান্ত হয়েছেন অন্য সংখ্যালঘুরাও। মূলত ৫ আগস্ট থেকে এ সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সারা দেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর শঙ্কা, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।’ সংগঠন দুটির দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়। এ জেলায় মোট ১৬টি হামলা ঘটেছে। এরপর ময়মনসিংহ জেলায়, ১০টি। বান্দরবানে বসবাসরত আমার এক পরিচিত চাকমা আদিবাসী কলেজশিক্ষকের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৫ আগস্ট রাতে; যা খুবই দুঃখজনক।

ধ‍‍র্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা বাংলাদেশে নতুন নয়। বরং বলা যায় এটি একটি নিয়মিত ঘটনা। এক হিসাব অনুযায়ী ২০২২-এর জুলাই থেকে ২০২৩-এর জুন প‍‍র্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত মোট সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ১ হাজার ৪৫টি। উইকিপিডিয়ার ডেটাবেস অনুযায়ী, এর মধ্যে ৪৫টি হত্যাকাণ্ড, ৭টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা, ১০ জনকে হত্যার চেষ্টা, ৩৬ জনকে হত্যার হুমকি, ৪৭৯ জনকে হামলা বা নির্যাতন, ১১ জনের কাছে চাঁদা দাবি, ১০২টি হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা, ৪৭টি জমি দখলের ঘটনা, ৪৫টি দখল বা উচ্ছেদের হুমকির ঘটনা, ১১টি দেশত্যাগের হুমকি, ১৫টি দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টা, ৭টি শ্মশানভূমি দখলের চেষ্টা, ১৪টি মন্দিরে হামলা, ৪০টি প্রতিমা ভাঙচুর, ২৫টি ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা, ১২টি অপহরণ বা ধর্মান্তকরণের ঘটনা, আটজন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটক, ৩২টি জাতীয় নির্বাচনে এবং পাঁচটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখের পরের সাম্প্রদায়িক হামলার ভয়াবহতা অন্য হামলাগুলোর চেয়ে ছিল অধিকতর ভয়‍ংকর। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কষ্ট ও প্রশ্ন হচ্ছে এ জায়গায় যে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে কিন্তু আমাদের অপরাধ কী?

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচার শাসকের পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক শক্তিগুলো সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়েছে, যেটা আগে এত অল্প সময়ের ভেতর আমরা দাঁড়াতে দেখিনি। সংখ্যালঘুরা ভিন্ন কোনো গ্রহ বা দেশ থেকে আসেনি। তারা এ দেশেরই সন্তান। আমার যে অধিকার, তারও সেই অধিকার। কিন্তু একটা সুযোগের প্রেক্ষাপটে দুষ্কৃতকারীরা সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করেছে অথবা যারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চায় না, তারা করতে পারে। বড় কথা হচ্ছে এ ঘটনার পর ছাত্র থেকে শুরু করে সামাজিক শক্তিগুলো যেভাবে পাশে থেকেছে, সেটি অনেক বড় পরিবর্তন। আমি আশা করি বিষয়গুলো সামনে আর ঘটবে না।’

আমরাও আশা করতে চাই, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বাংলাদেশে আর ঘটবে না। এটা স্বীকা‍র্য যে, সাম্প্রদায়িক হামলার একটা সংখ্যাতাত্ত্বিক চিত্র থাকলেও এবারের ঘটনায় এর একটা চমৎকার দায়িত্বশীলতার চিত্রও দেখা গেছে। দু‍র্বৃত্তরা যখন একের পর এক ধ‍‍র্মীয় সংখ্যালঘুর ঘরবাড়ি, বসতভিটা এবং মন্দিরে হামলার চেষ্টা করছে, তখন সাধারণ শিক্ষা‍র্থী, স্থানীয় জনগণ, এমনকি কিছু মাদ্রাসার শিক্ষা‍র্থীও রাত জেগে পাহারা দিয়ে সনাতনধ‍‍র্মীদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরের সুরক্ষা দিয়েছেন। মূলধারার মিডিয়া এবং সমাজমাধ্যম এগুলো বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ ও প্রচার করেছে। নিঃসন্দেহে এটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চমৎকার নজির। তাই আমরা আজকের তরুণ প্রজন্মের ওপর আস্থা রাখতে চাই; তাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই এবং তাদের অঙ্গীকারের ওপর ভরসা রাখতে চাই। ইতোমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের ধ‍‍র্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় অন্ত‍‍র্ব‍‍র্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সা‍র্বিক নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখানেও এটা স্বীকা‍র্য যে, কিছু মতলববাজ সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলার কিছু ফেক নিউজ প্রচার করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় উস্কানিও দিয়েছে; যা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত।

পরিশেষে বলব, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সমাজে বৈষম্য দূরীকরণের যে দ‍‍র্শন ও অঙ্গীকার নিয়ে গুণগত পরিব‍‍র্তন আনার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়েছে, আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই, সে সমাজ রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় সমাজে সব ধ‍‍র্মের, সব ব‍‍র্ণের, সব জাতের, সব ভাষার, সব বিশ্বাসের এবং সব লিঙ্গের মানুষের সমম‍‍র্যাদার সহাবস্থান নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। যেখানে ধ‍‍র্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুকে সামাজিক আর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না। তাই ধ‍‍র্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সামাজিক ও জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমন আমাদের সবার। এভাবেই আমাদের সবাই সম্মিলিত এবং আন্তরিক প্রচেষ্টায় এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারব যেখানে থাকবে সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক ম‍‍র্যাদা এবং সামাজিক সাম্য; যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল দা‍‍র্শনিক ও নৈতিক ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই, থাকতে পারে না

  • নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা