× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও বনে দখলদারদের থাবা!

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৪ ১১:৫০ এএম

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৪ ১১:৫০ এএম

পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও বনে দখলদারদের থাবা!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দার্শনিক রাল্ফ ওয়াল্ডো এমারসন যথার্থ বলেছিলেন, ‘প্রকৃতি সর্বদা আত্মার রঙ পরিধান করে।’ আরও স্মরণ করি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিক ডি রুজভেল্টকে।  তিনি বলেছিলেন , ‘যে জাতি তার মাটিকে ধ্বংস করে সে নিজেকে ধ্বংস করে। অরণ্য আমাদের ভূমির ফুসফুস, যা বাতাস বিশুদ্ধ করে মানুষকে সতেজ শক্তি দেয়’। পরিবেশবাদীসহ আরও অনেকেই বন কিংবা প্রকৃতি-বৃক্ষ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু আমাদের চলা যেন এর বিপরীতে। বন-পাহাড়-প্রকৃতি কতিপয় ক্ষমতাবানের লোভের গ্রাসে ক্রমাগত বিলীন হচ্ছে, এর বিস্তর নজির রয়েছে। ঢাকার অদূরে গাজীপুর বনের ঘটনাটি এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ১৭ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশ, সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় গত ১৩ দিনে প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কতিপয় প্রভাবশালী সরকারি বনের জমি দখল করে আবাসন গড়ে তুলেছেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে যূথবদ্ধভাবে সংঘটিত এই অপকাণ্ডে দখল হয়ে গেছে অনেক বনভূমি এবং বন বিভাগের দায়িত্বশীলরা বাধা দেওয়ায় তাদের ওপর হামলা চালায় দখলকারীরা।

এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়। বন দখল ও বনের বৃক্ষ লোপাটকারীরা ৫ আগস্ট গাজীপুরের চন্দ্রা ফরেস্ট অফিস ও খারাজোরা চেকপোস্ট, থানায় হামলা চালায়। তারা ফরেস্ট অফিস থেকে ছিনিয়ে নেয় আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নেয় দুর্বৃত্তরা। বনভূমি বা প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্টকারীরা সেখানে গড়ে তুলেছে শতাধিক ঘরবাড়ি। ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে তারা অভিযানে নামবেন। গত জুনে সহযোগী একটি সংবাদমাধ্যম গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বন দখল ও বৃক্ষ লোপাটের চিত্র তুলে ধরে। গাজীপুরের শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও সদর উপজেলায় দখলকারীদের কবলে রয়েছে ১২ হাজার ৩২১ একর বনের জমি। এর মধ্যে ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে প্রায় ৫শ একর। গত এপ্রিলে বন বিভাগ ও গাজীপুর জেলা প্রশাসন সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছে ৮.৭৯ একর বনভূমি। অবশিষ্ট বনভূমি রিসোর্ট, বাড়িঘর-দোকানপাট, হাটবাজার ও কৃষিজমি হিসেবে ব্যক্তি বা মহল বিশেষের দখলে রয়েছে।

গাজীপুরের যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে তা খণ্ডিত দৃষ্টান্ত। সারা দেশেই সংরক্ষিত কিংবা অন্য বনাঞ্চল বনখেকোদের উদরে ঢুকে যাচ্ছে। দখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে অতীতে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেই সমন্বিত ও পরিকল্পিত পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কারণ, যখন যে দলের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তখনই দলীয় প্রভাবশালীরা এবং বন বিভাগের কতিপয় অসাধুর যোগসাজশে এমন অপকাণ্ড ঘটিয়ে আসছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি কিংবা অন্য দলের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শিক বিরোধ থাকলেও দখল-লুটপাটে রাজনৈতিক বলবানদের যোগসূত্রের বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। নিকট অতীতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বনভূমি দখলে যে তথ্য উপস্থাপন করেছিল তা উদ্বেগজনক বললেও কম বলা হয়। তাদের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে বনের জমি জবরদখলকারীর সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজারেরও ওপরে এবং তাদের দখলে রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার একরেরও বেশি বনভূমি, যা মোট বনভূমির উল্লেখযোগ্য অংশ বলা যায়।

আমরা দেখেছি, বনের জমি দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের ছত্রছায়ায় এ ধরনের অপকাণ্ড বেশি হয়ে থাকে, তাও আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এ ব্যাপারে অনেক কিছু করণীয় আছে বলে আমরা মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমরা বলতে চাই, যেহেতু তারা বিভিন্ন ধরনের সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক কদাচারের প্রতিবিধান করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, সেহেতু দখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে তাদের নির্মোহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আমরা আশা করব, তারা জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন এবং সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে সমর্থ হবেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থের পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষায় যথোপযুক্ত কাজ করতে তারা কারো প্রতি কোনো অনুকম্পা প্রদর্শন করবেন না।

পরিবেশবিদদের মতে, যেকোনো দেশে মোট আয়তনের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের আছে মাত্র ১৫ শতাংশ, যার মধ্যে প্রাকৃতিক বনের সংখ্যা খুবই কম। আমরা এও দেখছি, সৃজন বনের পরিমাণ বাড়লেও সংরক্ষিত বা প্রাকৃতিক বনের পরিমাণ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। আমাদের ধারণা, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে যাওয়া বনভূমি উদ্ধার করা কঠিন কোনো কাজ নয়। কিন্তু যেসব বনভূমি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে গেছে সেগুলো উদ্ধার করতে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি মহলের যথাযথ সহযোগিতা প্রয়োজন। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, বন বা বনভূমির মালিক দেশের জনগণ। সরকারের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় কিংবা জনগণের সম্পদের সুরক্ষা প্রদান করা। আমরা অতীতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছি, উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও বনভূমি সংরক্ষণের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি দায়িত্বশীল মহলের নাকের ডগায় দেশের বনাঞ্চল ক্রমাগত কীভাবে সংকুচিত হচ্ছে, আমরা এই প্রশ্নও রাখতে চাই।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আরও আছে, উচ্ছেদ অভিযানের নামে বরাবরই এক ধরনের সাপ-লুডু খেলা চলে আসছে। বনভূমি দখল, বনের বৃক্ষ নিধনে স্বার্থান্বেষী মহলের সঞ্চিত শক্তি প্রয়োগ এবং অসাধু দায়িত্বশীলদের যোগসাজশের বিষয়টিও নতুন কিছু নয়। অনেকাংশেই দেখা যাচ্ছে, বনভূমি দখল করেই দখলদাররা ক্ষান্ত নন; তারা নির্বিচারে টিলাভূমিও কেটে নিচ্ছেন এবং এর অভিঘাত পরিবেশে-প্রতিবেশে ভয়ংকরভাবে লাগছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বন বিভাগের অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে বিস্মিত না হয়েও পারি না। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেই তারা গৎবাঁধাভাবে বলতে থাকেনÑ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে, দখলদারদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এর যথাযথ প্রতিবিধান আশা করি। আমরা দাবি জানাই, দখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হোক এবং সর্বত্র চালানো হোক সাঁড়াশি অভিযান। বনভূমি দখলে কিংবা বৃক্ষনিধনে বলবানদের আগ্রাসী থাবা পড়তেই থাকবে অথচ এর কোনো প্রতিবিধান হবে না তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়। আমরা বনখেকোদের মূলোৎপাটন চাই, বনভূমি দখলমুক্ত দেখতে চাই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা