× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চলমান উন্নয়ন প্রকল্প

অন্তর্বর্তী সরকার একটি কমিশন গঠন করতে পারে

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৪ ১০:১১ এএম

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। চারদিকে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। একই সঙ্গে এ সরকারের সামনেও রয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। এমন একটি সময়ে অন্তর্বর্তী এ সরকার দায়িত্ব নিয়েছে যখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভঙ্গুর। আর ভঙ্গুর এ অর্থনৈতিক সময়েও আমাদের অনেক অবকাঠামোর উন্নয়নকাজ চলমান। অনেক অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ অর্ধসমাপ্ত রয়েছে। আবার কিছু কিছু প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে মাত্র। কিছু কিছু অবকাঠামো নির্মাণের কাজ খানিকটা এগিয়েছে। এ অবস্থায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মাঝে কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য তা নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পূর্বতন সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি, তারা উন্নয়ন বলতে অবকাঠামো উন্নয়নকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। অথচ উন্নয়নের আরও বেশকিছু মাপকাঠি রয়েছে। বিগত সময়ে উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয়, ব্যবস্থাপনাসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে খুবই কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে অতীতে এমন কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে যেগুলো আসলে গুরুত্বের নিরিখে অতিপ্রয়োজনীয় ছিল না। বরং ওই অবকাঠামোগুলো নির্মাণ করা হয়েছে কারণ এগুলো নির্মাণের জন্য তখন অনেকেরই বিশেষ কিছু আগ্রহ ছিল।

বর্তমান সরকার মেট্রোরেল চালু করার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মেট্রোরেল দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। মেট্রোরেলের দুটি স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো মেরামত প্রয়োজন। এ মেরামত প্রসঙ্গে কদিন আগে বলা হচ্ছিল, অন্তত এক বছরের আগে মেট্রোরেল সক্রিয় করা সম্ভব হবে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকার মনে করেছে, মেট্রোরেলে যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং এগুলো সমাধান করে আপাতত চালানো যেতে পারে। যদিও ১৭ আগস্ট মেট্রোরেল চালুর বিষয়ে সরকার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে পরে তা স্থগিত করা হয়। এর বাইরে ইতোমধ্যে এক্সপ্রেসওয়ে চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল এবং টোল আদায়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষতিগ্রস্ত টোল প্লাজাগুলো সচল হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। এক্সপ্রেসওয়ের অবকাঠামো কিন্তু এখনও অসম্পূর্ণ। আমরা জানি, চলমান রয়েছে আমাদের বিআরটি প্রকল্পও।

অবকাঠামোগত এ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মাঝে অনেক প্রকল্পই যে প্রয়োজনবিহীনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে তা-ও কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ভেতরের একটি প্রকল্পের কথা। এখানে মূল শহরের ভেতর একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ওই শহরের বা নিকটবর্তী এলাকার জন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। আর এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়েই কিন্তু আমরা এক ধরনের ঋণের চক্রে আটকে গেছি। আমাদের বৈদেশিক ঋণের বোঝা ভারী হয়েছে। আমাদের পিঠে কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণ। এ ঋণের পাহাড় জমেছে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য। এ অবস্থা উত্তরণের জন্য আগামীতে আমাদের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। যখন এ বিষয়গুলো যাচাইবাছাই না করেই অবকাঠামো পরিকল্পনায় হাত দেওয়া হয় তখন তা প্রকৃতপ্রস্তাবে সাধারণের জন্য কোনো কাজেই আসে না। বরং বাড়িয়ে তোলে আমাদের বৈদেশিক ঋণের বোঝা। ইতোমধ্যে আমাদের যেসব অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে সেগুলোর ঋণ পরিশোধের সময়ও কিন্তু এগিয়ে এসেছে।

তাই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য এ মুহূর্তে একটি কমিশন গঠন করা জরুরি। আমাদের বড় বড় যে প্রকল্পগুলো চলমান রয়েছে সেগুলোর কোন কোনটি দ্রুত শেষ করা দরকার তা নির্ধারণ করবে এ কমিশন। কোন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে আস্তেধীরে এগোনো যায় তা-ও নির্ধারণ করবে। আবার যেসব প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি বা পরিকল্পনায় রয়েছে কিন্তু বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এখন সময় এসেছে সেগুলো নতুন করে যাচাইবাছাই করার। এজন্য যে কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে সে কমিশনই সব প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করার মাধ্যমে অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর বিষয়ে মত দেবে, যার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কাজ করা সহজ হবে। সেই সঙ্গে যে প্রকল্পগুলো আমাদের এখন প্রয়োজন নেই সেগুলো আপাতত বাদ দিয়ে দেওয়াই শ্রেয়।

এ কমিশন মূলত নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যতে অবকাঠামো বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী কী করণীয় রয়েছে তার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত, এ মুহূর্তে কোনো বড় অবকাঠামোগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা। কারণ আমাদের সামনে এখন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জই বড়। সে ক্ষেত্রে আমাদের যে রসদ রয়েছে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত কীভাবে করা যায় তা নিয়েই ভাবতে হবে। সেই সঙ্গে এখন যে অবকাঠামো রয়েছে সেগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি করা জরুরি। মোদ্দা কথা, এ অবকাঠামোগুলো চালু রাখতে হবে এবং যে উদ্দেশ্যে এদের চালু করা হয়েছে তা যেন বাস্তবায়িত হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এসব অবকাঠামো থেকে আমরা সর্বোচ্চ উপযোগিতা প্রত্যাশা করি।

অতীতে আমরা লক্ষ করেছি, পুরো দেশেই অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে খুব কমই ভাবা হয়েছে। পরিকল্পনাবিদদের পরামর্শও অনেক সময় গ্রহণ করা হয়নি। বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে যা পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এ ক্ষেত্রে হাওরাঞ্চলের অল ওয়েদার সড়কের কথা বলা যেতে পারে। এ ধরনের সড়ক নির্মাণের ফলে দেখা গেছে, হাওরে বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো সংকট বেড়েছে। মূলত এমন অনেক প্রকল্প রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ও উদ্দেশ্য থেকেই করা হয়েছিল। হাওরের সড়ক নির্মাণের সময় হাওরের পরিবেশ বিবেচনায় আনা হয়নি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময়ও বিবেচনায় আনা হয়নি এ অঞ্চলের পরিবেশ, যেখানে সংকটে পড়েছে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য।

স্থানীয় পরিবেশ-প্রতিবেশ বিবেচনায় না এনেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে এসব প্রকল্প। এ ক্ষেত্রে প্রকৌশলীরা কিংবা প্রশাসনও রাজনৈতিক ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। ফলে এ ধরনের প্রকল্পগুলোর সার্বিক উপযোগিতার তুলনায় পরিবেশের বিপর্যয় কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি আমরা। আমাদের প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোয় যত পরিকল্পনাই নেওয়া হোক না কেন তার প্রাক্কলন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের নকশাও হতে হবে সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত। কোনো প্রকল্প নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ওই এলাকার সার্বিক অবস্থা, অবকাঠামো নির্মাণে পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে তা যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের নির্মোহভাবে কাজ করতে হবে।

শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে কিছু বিষয় পুরো জাতিকে শিখিয়েছে। তারা দেখিয়েছে, যেকোনো কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে আগে। দেশকে ভালোবেসে সবকিছুই করা সম্ভব। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ যেন কোনোভাবেই প্রাধান্য না পায় আমাদের তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দেখছি, বাংলাদেশে স্বস্তা শ্রম থাকার পরও বিশাল জনসম্পদ কাজে লাগাতে পারিনি। আমাদের এখানে সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে অবকাঠামো নির্মাণব্যয় সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ। অতীতে এ প্রসঙ্গে আমরা বারবার বলেছি, এর পেছনে রয়েছে দুর্নীতির একটি বড় হাত। সামনের দিনে আমাদের অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

দেশ দুর্নীতিমুক্ত করা জরুরি। দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি প্রাধান্য দিতে হবে। দুর্নীতি বাদ দিয়ে যখন আমরা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারব তা হবে টেকসই এবং রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় রোধ করবে। নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সামগ্রিক ভৌত অবকাঠামো সামনে রেখে পরিকল্পনা সাজাতে হবে, গুরুত্ব দিতে হবে পুরো জনগোষ্ঠীর সুবিধাকে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ভৌত পরিকল্পনা থাকা জরুরি। সেটা আমরা স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পার হয়ে গেলেও তৈরি করতে পারিনি। অথচ মাইলের পর মাইল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। অনেক পৌর এলাকার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে অনুমোদন না দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। আবার এমন অনেক বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যেগুলো আমাদের শহরের মাস্টারপ্ল্যানে নেই। কিছু কিছু মন্ত্রণালয় বিচ্ছিন্নভাবে নতুন নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে যেগুলো মাস্টারপ্ল্যান সমর্থন দেয় না।

সারা দেশে উন্নয়ন বা যে কোনো কাজে পরিকল্পনাহীনতা দূর করার বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। বিভিন্ন শহরের যে মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে সেগুলো মেনেই যেন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় সেদিকেও মনোযোগ গভীর করা জরুরি। তবেই উন্নয়নের সুফল আমরা ভোগ করতে পারব। উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, এ বিষয়টিও আমরা যত দ্রুত অনুধাবন করব ততই দেশের জন্য মঙ্গল।

  • পরিচালক, আইপিডি । নগর পরিকল্পনাবিদ ও অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা