ক্রিকেট
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৪ ১৪:৫৪ পিএম
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৪ ১৪:৫৪ পিএম
ষাটের দশক শুরুরও আগে আমার বয়ঃসন্ধিপূর্বের সেই স্বাধীন আনন্দময় দিনগুলোয় যে ক্রিকেট হতো এখন আর এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সে মাঠে সেই ক্রিকেট নেই। নেই ক্রিকেটের সেই সরলতা আর আবেদন। শীতের মিঠে রোদে সেই ক্রিকেটের আনন্দ ছিল অন্যরকম। এখন তো ক্রিকেট সারা বছরের খেলা। অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে টেস্ট ক্রিকেটের মুখ্য বৈশিষ্ট্যগুলো। শৈশবের সেই সুখস্মৃতির মধ্যে ডুবে থাকতে কী যে ভালো লাগে। ক্রিকেট যতখানি বর্তমান ততোধিক অতীত। ক্রিকেটে ইতিহাসের অতি মর্যাদা। এখনকার প্রজন্মের জন্যই পেছন ফিরে তাকানো।
বাঙালি খেলোয়াড়রা ২৩ বছরে কখনও পাকিস্তান টেস্ট দলে খেলার সুযোগ পাননি। স্বাধীনতার পর বাংলায় কথা বলা ১১ জন বাঙালি খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ দল প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশ নেয় ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে। সেবার প্রথম খেলায় (২৪ মে) পরাজিত করে স্কটল্যান্ডকে। এরপর দ্বিতীয় খেলায় পরাজিত করে টেস্ট খেলুড়ে দল পাকিস্তানকে (৩১ মে)। বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে নেমেই জয়। বিষয়টি অন্যরকম গুরুত্ব বহন করেছে। পাকিস্তানের ক্রিকেট প্রশাসন তো বছরের পর বছর বাঙালি ক্রিকেটারদের অবহেলিত এবং বঞ্চিত করেছে। যা হোক, এরপর পাকিস্তানের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ টেস্ট দল স্বাগতিক দেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলেছে ২০০১ সালে। এর পরের গড়িয়ে চলা ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের অজানা নয়। অজানা নয় টেস্ট ক্রিকেটে ২৪ বছরে বাংলাদেশ দলের ভূমিকা। চার বছর পর আবার পাকিস্তানের কন্ডিশনে বাংলাদেশ দুটি টেস্ট খেলবে। এ দুটি টেস্ট আবার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। এখানে পয়েন্টের বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পাকিস্তান দলটি ভারসাম্যময় এবং শক্তিশালী। তাদের ব্যাটার এবং বোলাররা বিশেষ করে পেসাররা দারুণ ছন্দে আছেন।
সঙ্গতভাবেই পাকিস্তান ‘ফেভারিট’ হিসেবে খেলতে নামবে এবং সর্বাধিক চেষ্টা করবে দুটি টেস্ট থেকে পূর্ণ পয়েন্ট সংগ্রহ করতে আর এটাই স্বাভাবিক। টেস্ট ক্রিকেটের মুখ্য বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এ সংস্করণে এখন টি-টোয়েন্টি এবং ওয়ানডের প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় হচ্ছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে, টেস্ট ক্রিকেটের ‘অ্যাপরোচ’ ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। নিস্তেজ ড্র থেকে বেরিয়ে আসছে টেস্ট ক্রিকেট। এতে একসময় ঝিমিয়ে পড়া পাঁচ দিনের ‘লাল’ বলের ক্রিকেট আবার নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দর্শক মাঠে আসছে। বাংলাদেশ দল পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলবে রাওয়ালপিন্ডি এবং দ্বিতীয় টেস্ট করাচিতে যথাক্রমে ২১ থেকে ২৫ আগস্ট এবং ৩০ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪। এ দুটি ভেন্যুর উইকেট সম্পর্কে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট পুরোপুরি অবগত। পাকিস্তানের উইকেট ভালো। পেসারদের জন্য বাউন্স থাকে। স্পিনারদের জন্য ভালো টার্ন থাকে। ধৈর্য ধরে ব্যাট করলে ইনিংসের বড় সংগ্রহ সম্ভব। টেস্ট ক্রিকেট তো ‘সেশন বাই সেশন’ খেলতে হয় দলের প্রয়োজনে। এ ক্রিকেটে তাড়াহুড়া করে প্যাভিলিয়নে ফিরে এসে উড়োজাহাজ ধরার কর্মসূচি থাকে না।
টেকনিক, ফর্ম, প্রস্তুতি, ইতিহাস আর অতীতের ক্রিকেটের ভুল থেকে সংশোধিত হয়ে খেলার কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে অনেক কথা। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্নায়ুর লড়াইয়ে দৃঢ়তা দেখানো। সর্বাত্মক চেষ্টা করা টেস্ট ক্রিকেটের মৌলিক দিকটা মাথায় ঢুকিয়ে খেলা। দুনিয়ার সবকিছু ভুলে শুধু ক্রিকেটে মনোযোগ দেওয়া। নির্ভারতাই শেষ পর্যন্ত ভালো ক্রিকেট খেলতে সাহায্য করে। নির্ভার থাকলে দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেট শুধু উপভোগ নয়, পরিস্থিতির সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। টিমওয়ার্ক আর স্বাভাবিক খেলার কোনো বিকল্প নেই। পরিসংখ্যানে দুই দেশের টেস্ট লড়াই ভীষণ অসম। ১৩ টেস্টের ১২টিতে জিতেছে পাকিস্তান আর একটি ড্র হয়েছে। টেস্টে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করাটা জরুরি। ক্রিকেট দলীয় খেলা। এখানে ভালো করতে হলে ‘ইউনিট’ হিসেবে ‘দল’ হিসেবে ভালো খেলতে হবে। একজন বা দুজন ক্রিকেটার হয়তো হঠাৎ একদিন দলকে জেতার স্বাদ উপহার দিতে পারেন তবে সবাই মিলে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে পারফর্ম করার মধ্যেই সব সময়ের ভালো ফল নির্ভর করে। আত্মবিশ্বাস এবং মাঠে ‘প্রপার ইনপ্লিমেন্টেশন’ ছাড়া তো ক্রিকেট এলোমেলো।
গত মার্চের পর আবার বাংলাদেশ দল টেস্ট খেলতে নামবে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। বলা হয়েছে প্রস্তুতি ভালো হয়নি, এটাই কারণ। ক্রিকেটাররা পরিচিত কন্ডিশনে, দেশের দর্শকের সামনে কোন ধরনের ক্রিকেট খেলেছেন এটা সবাই দেখছেন। পাকিস্তানে যে স্কোয়ার্ড তৈরি হয়েছে এখানে অভিজ্ঞ এবং তরুণ খেলোয়াড় সমন্বয়ে ভারসাম্যময়। ক্রিকেট বোর্ডের পুরোপুরি আস্থা এবং বিশ্বাস থাকায় হেড কোচ হিসেবে পাকিস্তানে দায়িত্ব পালন করবেন হাথুরাসিংহে। যারা বিভিন্ন কারণ এবং মতলব হাসিলের জন্য বারবার হেড কোচ হাথুরাসিংহেকে বিদায়ের জন্য যুদ্ধ করছেন, তারা রীতিমতো হতাশ। স্পিন কোচ মুশতাক আহমেদকেও পাওয়া গেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে। এটি একটি বড় স্বস্তি। পাকিস্তানের কন্ডিশনে স্পিন কোচ মুশতাক আহমেদের অভিজ্ঞতা দলের কাজে লাগবে। দেশের ক্রিকেটে একজনের পেছনে আরেকজন লেগে থাকা আর বিরুদ্ধাচরণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে একটি খেলায় জিতেছে বাংলাদেশ দল। পাকিস্তান থেকে ফেরার পর বাংলাদেশ দল যাবে ভারতে। সেখানে খেলবে দুটি টেস্ট ও তিনটি টি-টোয়েন্টি। ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি টেস্ট। এরপর আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাদের কন্ডিশনে দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে এবং তিনটি টি-টোয়েন্টি। ভীষণ ব্যস্ত সূচি। আগামী কয়েক মাস শুধু ক্রিকেটের চিন্তা।
ক্রিকেটের তিন সংস্করণের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্বল টেস্ট ক্রিকেটে। গত ২৪ বছরেও বাংলাদেশ টেস্ট দল শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখতে পারেনি। টেস্ট হলো আসল ক্রিকেট। শক্ত ক্রিকেট। এ ক্রিকেটে সব সময় পরীক্ষা উত্তীর্ণ হতে হয়। এ দীর্ঘসময়ের ক্রিকেটে অভ্যস্ত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ এদিকে নজরটা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আছে কিনা সেটাই প্রশ্ন। এ ব্যাপারটি জরুরি। ঘরোয়া ক্রিকেটে দেশজুড়ে দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেট নিয়ে বাস্তবধর্মী উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ না করা হলে দেশের টেস্ট ক্রিকেট কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। এ বাস্তবতা বুঝতে হবে। পাকিস্তানের জন্য যে স্কোয়ার্ড নির্বাচকরা দিয়েছেন, এ ছাড়া কি আর খেলোয়াড় আছেন? দেশের ক্রিকেটে পাইপলাইনে খেলোয়াড় কোথায়? ১৮ কোটি মানুষের দেশে বোর্ডের ‘পুলে’ কি ৪০ জন খেলোয়াড় আছেন? কেন নেই এটি সবাই জানেন। বছরের পর বছর ধরে শুধু কথা আর প্রতিশ্রুতি। বাস্তবে তার দেখা নেই। বাতি জ্বালানোর জন্য লোক তৈরি করার ক্ষেত্রে ‘হয়ে যাবে’ এবং গা-ছাড়া ভাবের খেসারতের পাল্লা কিন্তু ক্রমেই ভারী হচ্ছে। ক্রিকেট কিন্তু আমাদের কাছে শুধু একটি খেলা নয়, এর চেয়েও বেশি কিছু। খেলোয়াড়দের সম্ভাবনা এবং প্রতিভা আছে। এদের এক সুতোয় বাঁধার দায়িত্ব হেড কোচের। হেড কোচ হাথুরার দায়িত্ব খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেওয়া। খেলোয়াড়দের ভেতরের বারুদ জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা।