× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান

বৈশ্বিক-আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বহুমাত্রিক সমীকরণ

এম হুমায়ুন কবির

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৫৯ এএম

এম হুমায়ুন কবির

এম হুমায়ুন কবির

কয়েক দিন ধরে আমরা যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছি তা দেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকার বড় গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে বিদায় নিয়েছে। সরকার পতনের আগে যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তা এ অভ্যুত্থানের বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। স্বল্প সময়ে সংঘটিত এ অভ্যুত্থানের ফলে দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে আমাদের জন্য নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে প্রথম চ্যালেঞ্জটা একটু বিবেচনা করা জরুরি। স্বল্প সময়ে সারা দেশে একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ হিসেবেই এ আন্দোলনের ফল পেয়েছি আমরা। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় বিপর্যয় ঘটেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছে। নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে এ সরকার গঠিত হয়েছে। সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নয়ন। বিষয়টি যে বড় চ্যালেঞ্জ তা সরকারও উপলব্ধি করছে। কারণ বিমানবন্দরে অবতরণ করে প্রথমেই ড. ইউনূস বলেছেন, ‘আমাকে চাইলে প্রথমে অরাজকতা বন্ধ করতে হবে।’ সরকারের দায়িত্বগ্রহণের পরও তিনি এ কথাই জোর দিয়ে বলেছেন। আমরা দেখেছি ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী বেশকিছু স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এ কথা মানতে হবে, পুলিশ মানুষের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আবার মানুষও ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশেরও ক্ষতি করেছে। আমরা দেখছি, পুলিশ সদস্যরাও আস্তে আস্তে তাদের দায়িত্বে ফিরতে শুরু করেছেন। পাশাপাশি এ আন্দোলনের পুরোধা অর্থাৎ ছাত্রসমাজও দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক কন্ট্রোল কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়েছে। এলাকাভিত্তিক স্কোয়াড গঠন করে তারা আহ্বান জানাচ্ছেন এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং আহ্বান জানানোর পাশাপাশি জানমালের ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন যেন ক্ষয়ক্ষতির মুখে না পড়ে সেজন্যও নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। নতুন করে আরেকটা ইতিবাচক বিষয় লক্ষ করা গেছে, মাদ্রাসার ছাত্ররাও এ কাজে নিজেদের নিযুক্ত করেছেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় এক ধরনের সামাজিক সংহতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্র হয়ে কাজ করার যে সক্ষমতা দেখিয়ে চলেছেন তা প্রশংসনীয়। সামাজিক সংহতি প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে অতিদ্রুত সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পথ সুদৃঢ় করবে বলে মনে করি।

বহির্বিশ্বের কথাই যদি বলা হয় সেখানেও দেখা যাবে, দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েই তারা বেশি ভাবিত। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষত আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত চিন্তিত। ভারতের শঙ্কা দুই স্তরে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোয় এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারের বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারা এমন একটি চিত্র উপস্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছে যে সারা দেশই জ্বলছে। তারা দেখাতে চাচ্ছে, এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ব্যাপক প্রতিকূলতার মুখে রয়েছে। ফলে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। চীন ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে জড়িয়ে তারা এক ধরনের ধারণা তৈরি করতে চাচ্ছে। এ ধারণায় দেখানো হচ্ছে, দেশে এক ধরনের ডানপন্থি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। আমাদের এখানে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে বটে কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম যেভাবে নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরছে তা সঠিক নয় বলেই মনে করি। এ অপপ্রচার চ্যালেঞ্জ করাই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব বলেও মনে করছি। বহির্বিশ্বে বিশেষত প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের বিষয়ে কাজ করতে হবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে এক ধরনের ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু চুক্তিও সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদচ্যুতির পর ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে তা স্পষ্ট। ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ভারতের পার্লামেন্টে সর্বদলীয় সভায় একটি ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি মোটা দাগে ইতিবাচক বক্তব্যই দিয়েছেন। তবে তার ভাষণে বাংলাদেশের সার্বিক প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে তুলে আনেননি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুসারে পুলিশসহ কয়েকশ মানুষ সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে। এত বড় একটি প্রেক্ষাপটের পরিস্থিতি বোঝা না গেলে বর্তমান পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা বোঝা যাবে না। দেশের মানুষের এখন উচিত এ সার্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার জন্য সচেতন হওয়া। বিশেষত এ আন্দোলন পুরোপুরি ছাত্রদের আন্দোলন এবং এ আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক পক্ষই যুক্ত ছিল না। হয়তো আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে তারা যুক্ত হয়েছে কিন্তু এটি দলীয় রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে দেখা যাবে না। এমনকি এ আন্দোলনে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ ছিল নাÑএ ধরনের বক্তব্যগুলো জোরালোভাবে প্রচার হওয়া দরকার।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো যেভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে তাতে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা থাকে। তাই এ বিষয়ে আমাদেরই জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে এখানকার বাস্তবতা আসলে কী তা উপস্থাপন জরুরি। কোনো রাজনৈতিক পক্ষ যাতে তাদের ভ্রান্ত ধারণার মাধ্যমে মানুষকে ভুলপথে চালিত করতে না পারে এ চেষ্টা আরও জোরালোভাবে করতে হবে। দেশের ভাবমূর্তি যেন অহেতুক ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য পাশের দেশ ভারত এবং যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের মৌলিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে তাদের কাছে উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতে হবে। মূলত আমাদের প্রেক্ষাপটের বয়ান যাতে বস্তুনিষ্ঠ হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এ বিষয়টির সঙ্গে আমাদের জাতীয় ভাবমূর্তি জড়িয়ে রয়েছে। দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা গেলে মানুষও অস্বস্তিতে ভোগে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের উদ্যোগ ও শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাস্তবানুগ পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছিÑএ ধারণা প্রচার জরুরি।

দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের অর্থনীতি এক ধরনের চাপের মধ্যে আছে। পূর্ববর্তী সরকারও দীর্ঘদিনে এ সংকটের সমাধান করতে পারেনি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ইত্যাদি নিয়ে আমাদের এক ধরনের টানাপড়েন রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি ঘিরে যেসব চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির পাশাপাশি বহির্বিশ্বে আমাদের যে বাজার রয়েছে এ বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানির স্বাভাবিকতা নিশ্চিতকরণে দ্রুত নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয় সেদিকে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। পণ্য সরবরাহ, আমদানি ও রপ্তানিÑএ তিনটি প্রক্রিয়া সাবলীল থাকা জরুরি। বিশেষত উন্নয়ন সহযোগীরা যেন আমাদের পর্যাপ্ত সমর্থন দিতে পারে সেজন্য কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিতে হবে। দেশি-বিদেশি অনেক রাষ্ট্রের বিনিয়োগ রয়েছে এখানে। যখনই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয় তখন বেশি উদ্বেগে থাকেন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাই। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এ মুহূর্তে আশ্বস্ত করাটা বাড়তি গুরুত্ব পাওয়া জরুরি। বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সেজন্য দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ রয়েছে এমন একটি ধারণা উপস্থাপন করা জরুরি।

অর্থনৈতিক বা উন্নয়ন সহযোগীদের সংযুক্ত হওয়া দরকার আরও গভীরভাবে। যুক্তিসহকারে তাদের কাছে আমাদের সদিচ্ছার বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে। আমাদের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য তৃতীয় আরেকটি উপাদানের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। দেশের বাইরে বাংলাদেশি কমিউনিটির যারা রয়েছেন তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া দরকার জরুরি ভিত্তিতে। কারণ দেশের অস্থিতিশীল পরিবেশের আঁচ তাদের গায়েও লেগেছে এবং অনেকেই তখন নিজ নিজ স্থানে আন্দোলনে সম্পৃক্ততা জানিয়েছিলেন। তাদের এখন আশ্বস্ত করতে হবে। তারা যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে টাকা পাঠান তাহলে তা আমাদের অর্থনীতিকে সহযোগিতা করবে। এখন সবারই একতাবদ্ধ হয়ে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজে লিপ্ত হতে হবে। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারলে ব্যাংকিং চ্যানেল নিয়ে তাদের মধ্যে যে সংশয় রয়েছে তা দূর করা কঠিন কিছু নয়। তা ছাড়া আমরা প্রবাসী কমিউনিটির কাছে আবেদন জানাতে পারি, দেশ একটি বিশেষ সময় ও পরিস্থিতি অতিক্রম করছে এবং এ মুহূর্তে আপনারা যদি দেশের স্বার্থে বাড়তি কিছু করতে পারেন তাহলে আমাদের সংকটাবস্থা কাটানো কঠিন হবে না। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের যে বাস্তবতা এর নানা বিষয় বিবেচনা করলে প্রবাসীরা এগিয়ে আসবেন বলেই ধারণা করি।

এ মুহূর্তে আমাদের অর্থনৈতিক ফ্রেমওয়ার্কে এগোতে হবে। যেসব স্থানে অর্থনীতির নিবিড় মনোযোগ আমাদের আছে সেসব দিকে শ্যেনদৃষ্টি দিতে হবে। বিশেষত রাষ্ট্রর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। সবাই যাতে আশ্বস্ত হয় এবং রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করার সদিচ্ছা রাখে। অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে সবার। আঞ্চলিক-বৈশ্বিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং উন্নয়নে দূরদর্শিতার প্রতিফলন দৃশ্যমান করলে সুফল মিলবে নিশ্চয়।

  • কূটনীতি-বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা