যুক্তরাজ্যে দাঙ্গা
সারা খান
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৫৬ এএম
সারা খান
ব্রিটেনের ২১টি
শহরে কট্টরপন্থিদের আন্দোলন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে গোটা দেশের যে
ক্ষতি হয়েছে তা এখনই অনুমান করা কঠিন। বিশেষত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি এখনও
আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। অভিবাসীরা যেসব হোটেলে আশ্রয় নিয়েছেন সেখানে অগ্নিসংযোগ; ঘরবাড়ি
ভাঙচুর, মসজিদ ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং পুলিশ ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলার
মতো ঘটনা ঘটেছে। কবরস্থানেও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। আন্তর্জাতিক মহলেও ব্রিটেনের
ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেবে, এলিস এবং এলসিকে এক দুর্বৃত্ত ছুরিকাঘাতে হত্যার
পর তার পরিবার কতটা দুর্বিষহ সময় পার করছে তা বলে দিতে হবে না।
একটি মুক্তসমাজে
এমন ধ্বংসযজ্ঞ কখনই মেনে নেওয়ার নয়। এ ধরনের আচরণকেও কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত বলা যাবে
না। কট্টর ডানপন্থি নেতারা সব সময়ই অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে। দাঙ্গার
বিষয়টি নিয়ে তর্ক সব সময়ই চলবে। তবে একটি বিষয় আমরা এড়াতে পারব না, তা হলো কট্টরপন্থি
দলগুলো বিভিন্ন সময়ে ঘৃণার বার্তা এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রচার করেছে। ফলে অনেক মানুষ
আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন এবং প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করেছেন। এ ক্ষেত্রে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক
সংগঠনগুলো কিছুটা সতর্ক ছিল। ব্রিটেনের আইন মোতাবেক তাদের বক্তব্য যেন সন্ত্রাস উস্কে
না দেয় সেদিকে সতর্ক থেকেছে এই দলগুলো। অথচ বাস্তব সত্য হলো, তারা ব্রিটেনের সংখ্যালঘু
মুসলমান ও ইহুদি বিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে পুরোটা সময়ই সক্রিয় ছিল। এমনকি অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও
তাদের এই ক্ষোভ থেকে বাদ পড়েনি। গত কয়েক মাস ধরেই আমি নানা প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে
ধরেছি।
ব্রিটেনে উগ্রবাদ
ছড়াচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে কূটকৌশল
প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কূটকৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের
কৌশল রয়েছে। অনেক আগে থেকেই সচেতন মহল এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছে কিন্তু সরকার এ বিষয়ে
কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নতুন সরকারকে তাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছু বদল যে আনতে হবে
তা স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে সহিংসতা প্রতিরোধ করে এমন কোনো কৌশলের প্রয়োগ বেশি জরুরি। ২০২০
সালের পর থেকেই প্রশাসনিক অবকাঠামো ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উগ্রবাদ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ
নেওয়া হয়নি। অনলাইনে নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। বাকস্বাধীনতা
নিশ্চিত করে কিন্তু কোনোভাবেই ঘৃণা বা সহিংসতা ছড়ায় নাÑ এমন আইনি কাঠামো নির্ধারণ জরুরি।
নীতিনির্ধারণী
পর্যায় থেকে সামাজিক বিশ্লেষণে ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সারা দেশে একতাবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে
যেসব বিষয় জরুরি তা অনুপস্থিত। যেমন, উগ্রবাদীদের থামাতে কি ধরনের আইনি ব্যবস্থার প্রস্তুতি
রয়েছে তা আমাদের জানা নেই। বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদন জানাচ্ছে, যুক্তরাজ্যে যখনই
উগ্রবাদীরা আন্দোলন শুরু করে তখন সামাজিক সংহতি অনেক কমে যায়। ২০১১ সালের এক প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার ফলে সামাজিক সংহতি ১০ শতাংশ কমে। টাইম সিরিজের
তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত চার দশকে যুক্তরাজ্যের মানুষ সরকার ও পার্লামেন্টের
ওপর আস্থা কমেছে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যমের ওপরও তাদের আস্থা কমে আসছে।
আস্থাহীনতার এ সংস্কৃতি ব্রিটেনের কট্টরপন্থিদের জন্য একটি আদর্শ মঞ্চ। নতুন লেবার
পার্টির সরকার এ বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারবে না। আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার
জন্য এমনটি শুভবার্তা হতে পারে না।
সরকারের উচিত
এই সংকটগুলোকে আমলে নেওয়া। বিশেষত, সামাজিক সহিংসতা রোধে বিভিন্ন মহলের সতর্কবার্তা
ও পরামর্শও তাদের বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষত কেন দাঙ্গা হলো এবং বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে
পড়ল তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তদন্ত সাপেক্ষে সহিংসকারীদের শনাক্ত করতে হবে। আমরা ধরেই
নিচ্ছি, বহু সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাকে সমন্বয় করতে না পারায় এমন দাঙ্গা হয়েছে। এ ধারণাকে
ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বিত হতে না পারার বিষয়টি পুরোনো
ভাবনা। সরকারকে বরং যুক্তিসহকারে অভিবাসীদের সংকট ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরতে
হবে। অভিবাসনের ফলে স্থানীয় সম্পদের বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা থাকলে
তা কীভাবে রোধ করা যায়Ñ এ বিষয়ে দ্রুত ভাবতে হবে। যুক্তরাজ্যের সংখ্যালঘু অনেকেই এখন
আতঙ্কে সময় কাটাচ্ছেন। তাদের নানা ধরনের নির্যাতনও সহ্য করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে
এই দাঙ্গার জন্য তাদের দায়ী করা হচ্ছে। যদিও মুসলিম গোষ্ঠীর একটি অংশ প্রতিবাদ জানিয়েছে।
দেশের রাজনীতিবিদদের
এখন একত্রিত হওয়া দরকার। উগ্রবাদী যেকোনো আচরণের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড়াতে হবে। সাংবাদিক
হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে লেবার পার্টির অনেক নেতাকে দেখেছি ডানপন্থি উগ্রবাদিতার
বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়ার চেষ্টা করতে। আবার এও দেখেছি, অনেক রক্ষণশীল
রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইসলামি উগ্রবাদ নিয়েই বেশি আলোচনা করেন। তারা ডানপন্থিদের উগ্রবাদ
নিয়ে কথা বলেন না। সেদিকে তারা চোখ ফেরাতে চান না। একপাক্ষিকভাবে দোষারোপ করে যান।
সম্প্রতি ইউগভের এক পোলে দেখা গেছে, গোটা দেশের ৫২ শতাংশ মানুষ ইসলামি উগ্রবাদ এবং
৪৭ শতাংশ ডানপন্থি উগ্রবাদকে বড় শঙ্কা হিসেবে বিবেচনা করে। দেশের জন্য তারা যে একটি
বড় সমস্যা তা স্বীকার করতে পিছপা নন অনেকেই।
সমাজের নানাবিধ
সংকট নিয়ে একাধিক বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পুরোনো সংকটের পাশাপাশি সমাজে উদ্ভূত
নতুন সংকটকে বিবেচনা করতে হবে। শান্তিপূর্ণ একটি সমাজ গঠনের জন্য আমাদের সম্মিলিতভাবে
কাজ করতে হবে। অথচ এই মুহূর্তে আমরা একটি কৌশলগত পদ্ধতি গড়ে তুলতে পারিনি। এই কৌশল
নির্ধারণ করতে হবে। নয়তো যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
দ্য গার্ডিয়ান
থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন