× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শাসনব্যবস্থা

অন্তর্বর্তী সরকার আর পরিবর্তনের স্লোগান

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৪ ১০:০২ এএম

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

দীর্ঘ পনেরো বছর পর ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। শুধু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থতা নয়; দীর্ঘকাল ধরে সমাজের সর্বস্তরে অনাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সর্বস্তরে ঘুষ-দুর্নীতি, ক্ষমতাসীনদের ফুলে-ফেঁপে বড়লোক হয়ে ওঠা এবং প্রায় সবক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিগ্রহে সবারই পরিবর্তনের জন্য ব্যাকুলতা অনেক দিনের। আমলাদের দৌরাত্ম্য সিভিল সমাজের মানুষকে প্রতিনিয়ত নিগ্রহের মধ্যে পতিত করে। বিশেষ করে শিক্ষক সমাজ যেন অপাঙক্তেয় শ্রেণিতে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের একচেটিয়া কর্তৃত্ব দীর্ঘকালের। সাম্প্রতিক সময়ে তা বাণিজ্য কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। এসব বিষয় নিয়ে লিখলেও অপমানের শিকার হওয়ার শঙ্কা ছিল সর্বক্ষণ। থানাগুলো যেন টোল আদায়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়। সচিবালয় হয়ে ওঠে নথি ধরে রাখার কেন্দ্র। টাকা না দিলে কোনো নথি ওপরে ওঠার সম্ভাবনা ছিল না। যেকোনো প্রকল্পে আমলাদের বিদেশ ভ্রমণ থাকা চাই। শিক্ষাসংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় বৃত্তিতে সিংহভাগ তারা নিয়ে নেন।

নাগরিক সমাজের কোনো পরামর্শ সরকার গ্রহণ না করে, বরং আমলারাই ছিলেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক। শুনেছি অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ মন্ত্রীরাও ছিলেন অসহায়। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করায় ক্রয়ক্ষমতা মানুষের নাগালের বাইরে যেতে থাকে। রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেওয়া একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এক কথায় রক্ষক সরাসরি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এ পরিস্থিতিতে একটি বিপ্লব কাঙ্ক্ষিত ছিল। চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন শুরু হলেও শিক্ষার্থী ও শিশুদের হত্যাকাণ্ডের পর এটি ছাত্র-গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ফলে অনেক প্রাণহানির পর শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি দেশত্যাগের আগে অনেকেই মন্তব্য করছিলেন যে, শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের মতো তাকে গণভবন ছেড়ে চলে যেতে হবে। আবার অনেকে এই আন্দোলনকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের ছাত্র-গণআন্দোলনকে বাংলাদেশ বসন্ত হিসেবে আখ্যায়িত করতে আগ্রহী। যারা নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিশেষ করে শিক্ষার্থীবৃন্দ তাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মনে হয় এই নামটি মানুষ খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে।

সমাজে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে তা একমাত্র তরুণসমাজই পরিবর্তন করতে পারে। এই তরুণসমাজ তাদের স্লোগান শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজে সমতা, ন্যায্যতা, ন্যায়পরায়ণতা ও আইনের শাসনের কথা বলে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। তাদের এই অঙ্গীকার ঠিক থাকলে খুব কম সময়ের মধ্যে সমাজে পরিবর্তন দেখা যাবে। কিন্তু ইতোমধ্যেই লক্ষ করা গেল যে, মানুষের জানমাল অনিরাপদ হয়ে উঠছে।দেশের অনেক স্থানে মানুষের ওপর আক্রমণ হয়েছে, হচ্ছে। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে শত শত প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর দেশের অধিকাংশ মানুষ এর প্রতিবাদ জানায়। ঠিক একইভাবে বর্তমানে যা কিছু চলছে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অতীতের মতো শুধু ভিন্নমতের কারণে মানুষ হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের শিকার হবে, তা একটি সমতাভিত্তিক সমাজে কাম্য নয়। যারা আইন লঙ্ঘন করেছেন বা অপরাধ করেছেন তারা আইনের আওতায় যাবেন এবং নিয়মানুযায়ী বিচারের সম্মুখীন হবেন। আইন হাতে তুলে নেওয়া কোনো নিয়ম হতে পারে না।

আমরা খুব উদ্বেগের সঙ্গে যে বিষয়টি লক্ষ করি তা হলো, যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হন। তাদের বাড়িতে হামলা, তাদের জমি দখল, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, এমনকি নারীরা ধর্ষণের শিকার হন। এটি কোনো সভ্য সমাজের আচরণ নয়। বরং সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা সংখ্যাগুরুদের দায়িত্ব। ইসলাম ধর্মসহ পৃথিবীর কোনো ধর্মই বোধহয় সংখ্যালঘুদের এভাবে নির্যাতন সমর্থন করে না। অথচ হরহামেশা এই সমাজে এটি ঘটছে। জেনারেল এরশাদের সময়ে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ধ্বংস করা হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মম আক্রমণ চলে। আওয়ামী লীগের আমলে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংস করা হয়। এই সময়ে অনেক প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা সংখ্যালঘুদের জায়গা-জমি দখল করে। এভাবে সমাজে তারা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে।

মনে রাখা দরকার, যে সমাজে যত বেশি ধর্ম ও বর্ণের মানুষের বসবাস, সেই সমাজ তত বেশি বৈচিত্র্যময়। আমরা ধীরে ধীরে এই বৈচিত্র্য হারাচ্ছি। একসময় এ দেশে কামার, কুমার, মুচি, ঋষি, ডোম, ময়রা, ধোপা প্রভৃতি শ্রেণির মানুষের বসবাস ছিল। কিন্তু এখন তাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছেড়ে চলে গেছে। ফলে আমরা একটি বৈচিত্র্যময় সমাজের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বর্তমান বিপ্লবের পর আমরা এই প্রত্যাশা করতে চাই যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ দেশে ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু আর কমবে না। তারা সম্মান নিয়ে এ দেশে বসবাস করবে। কারণ এটি তাদেরও দেশ। তাদের পূর্বপুরুষরা এদেশের মানুষ ছিলেন। তারা তাদের সাধ্যমতো এ দেশের সেবা করে গেছেন। এ জন্য আমরা তাদের বর্তমান প্রজন্মকে আগলে রাখব।

আওয়ামী লীগের পতনের পর ইদানীং স্থানীয়ভাবে সন্ত্রাস, রাহাজানি ও খুনখারাবি সীমা অতিক্রম করেছে। ডাকাতি হচ্ছে প্রায় প্রতি রাতে। প্রতিদিনই প্রায় আওয়ামীপন্থি সাধারণ কর্মীদের বাড়িঘর আক্রান্ত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল-ভাস্কর্য ভাঙা, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ধ্বংস, জাতীয় সংসদ ভবনকে বিধ্বস্ত, খুলনার গণহত্যা জাদুঘরে আগুন লাগানোর মতো বিষয়গুলোকে হয়তো শেখ হাসিনার ওপরে ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে চালিয়ে দিতে পারি। ডাকাতিকে বলতে পারি এটি ‘ডাকাত লীগ’-এর কাজ। সব সন্ত্রাসকে বলতে পারি ‘সন্ত্রাস লীগ’ এগুলো করেছে। মনে রাখা দরকার, এটি সেই পুরোনো স্টাইল। যত দোষ নন্দ ঘোষ। আওয়ামী লীগ সব অনাচারের জন্য বিএনপিকে দোষারোপ করত। বিএনপি মাঠে-ময়দানে কোথাও নেই। তথাপি বিএনপির ভূত তাদের মাথায় চেপে থাকত। একইভাবে বিএনপি আমলেও এই অপসংস্কৃতি বিরাজমান ছিল। যেহেতু আমরা পরিবর্তনের স্লোগান দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছি, তাই এ ধরনের হীন অতীত সংস্কৃতিকে পরিহার করব। তা না হলে সমাজে এক মারাত্মক বিভাজন তৈরি হবে, যা উন্নয়নের জন্য মোটেই সহায়ক নয়।

উন্নয়নের বড় শর্ত মানুষের নিরাপত্তাবোধ। নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে কেউ তার কাজে মনোনিবেশ করতে পারবে না। ফলে সময়ের কাজ সময়ে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে উঠবে। বহু বছর ধরে এই নিরাপত্তার সংকটে মানুষ তাদের সময় অতিবাহিত করেছে। বিগত সময়ে মতপ্রকাশের কোনো স্বাধীনতা ছিল নাÑ এটি আমরা সচরাচরই বলেছি। কিন্তু শাসকশ্রেণি এটিকে আমলে নেয়নি। মানুষকে কথা বলতে দিলে প্রতিদিনের অনিয়ম বা ভুল সরকার বা রাষ্ট্র জানতে পারে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হলে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণও সহজতর হয়। কিন্তু সেটি শাসকরা মানতে নারাজ। আমরা বিশ্বাস করি, এসব অবস্থার পরিবর্তন হবে। আর যদি বলি ‘আগে তো এমন হয়েছে’  তাহলে পরিবর্তন সুদূরপ্রসারী হয়ে যাবে। পরিবর্তন মানে সবক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন। মানুষের মননের পরিবর্তন। যেমন দুজন সমন্বয়ক ইতোমধ্যে উপদেষ্টার দায়িত্ব লাভ করেছেন। বোধহয় পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী তারা। সচিবদের তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, একজন অতিরিক্ত সচিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মুখে স্যার সম্বোধন শুনতে চান। এখন তাদেরকে এই পরিবর্তন মেনে নিতে হচ্ছে। আবার সরকার পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিবর্গের পরিবর্তনশীল মানসিকতায় অতীতের লুটেরা শাসকশ্রেণি যেন লজ্জা পায়, তেমনভাবে কর্মসম্পাদন হবে বলে আশায় বুক বাধি।

সাম্প্রদায়িকতা ও গুজব বর্তমান বাংলাদেশে একটি মারাত্মক ব্যাধি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজা দরকার। বর্তমান পরিবর্তনের পর যে আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ আমাদের সামনে সমুপস্থিত, সেখানে এই হীন মানসিকতার সুযোগ নেই। মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনার বোধ যেন সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজে তার প্রতিফলন থাকার প্রয়োজন হবে। সহনশীলতা, পরমত সহিষ্ণুতা, ঔদার্যের মধ্যে দিয়ে মানবিক সমাজ গড়তে হবে। যেখানে বৈষম্য নয় সাম্যের আলো ছড়াবে। আর একটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে হয়, তা হলো আমরা অনেক দিন যাবত জেনে আসছি বাংলাদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। এগুলো ফেরত আনার ব্যবস্থা করা এবং এর সঙ্গে যুক্তদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তির ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের শাস্তির জন্য যদি বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে অর্থ পাচারকারীদের বিষয়েও একই ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যদি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, তাহলে এটি বিপ্লব হিসেবে গণ্য হবে না। বিপ্লব মানেই সমাজের আমূল পরিবর্তন এবং তা অবশ্যই ইতিবাচক অর্থে। মানুষের জীবনের ও মননের সার্বিক পরিবর্তনই বিপ্লব। সেটি যদি না হয় তাহলে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল হিসেবে গণ্য হবে। দেশের আপামর মানুষ তা প্রত্যাশা করে না।

  • শিক্ষাবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক। সাবেক উপাচার্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা