অন্তর্বর্তী সরকার
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৫৩ এএম
ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ
৮ আগস্ট রাতে
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু
হলো। এ সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা সঙ্গত কারণেই বেশি বিধায়, তাদের সামনে চ্যালেঞ্জও
অনেক। অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানিয়ে প্রত্যাশা করি, তারা জনগণের ভাষা বুঝে জনপ্রত্যাশা
পূরণে যথাযথ ভূমিকা রাখবে। এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সেটাই যথার্থ বলে মনে করি। এ মুহূর্তে সবচেয়ে
বড় কাজ হলো, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে জনমনে স্বস্তি আনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক
অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা কঠিন হবে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের
অর্জিত ফসলের পরিপ্রেক্ষিতে এ সরকারের যাত্রা হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলন কোন প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাতে কীভাবে জনসম্পৃক্ততা
ঘটে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতা পাহাড়সম আন্দোলনের রূপ নেয় তা এখন বহুলচর্চিত
বিষয়। এ আন্দোলন অনেক কিছু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কোনো আন্দোলন যখন গণতান্ত্রিক
রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংজ্ঞাসূত্র অনুযায়ী অহিংস পথে চলে তখন এর গ্রহণযোগ্যতাও সর্বজনীন
হয়। ইতিহাসে এমন অনেক সাক্ষ্য রয়েছে, এ ধরনের আন্দোলনে শাসকগোষ্ঠীর নানানরকম নিপীড়নের
মাত্রা বেড়ে যায়। আমাদের সর্বসাম্প্রতিক এ আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। রাষ্ট্রীয়
অনেক সম্পদ ধ্বংস তো হয়েছেই, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো জীবনের ক্ষয়। হতাহতের মর্মস্পর্শী
ঘটনা শুভবোধসম্পন্ন সবাইকে মর্মাহত এবং বেদনাকাতর করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আন্দোলনেরই
জয় হয়। শুরু থেকে জয় পর্যন্ত মধ্যের অধ্যায়টুকু কতটা মর্মস্পর্শী ছিল এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
নতুন করে নিষ্প্রয়োজন।
কদিন আগেও ছিল
চারদিকে লাশের মিছিল। বাতাসে পোড়া গন্ধ আর সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালেই হৃদয়বিদারক
দৃশ্যÑএমন বাংলাদেশ এ জীবদ্দশায় কখনও দেখতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি। ইদানীং বিভিন্ন যুগে
জন্ম নেওয়া মানুষকে নানা জেনারেশনে সংজ্ঞায়িত করার প্রবল প্রবণতা দেখছি। তবে কোনো
সংজ্ঞায় না গিয়ে সহজ করে বলা যায়, আমরা যারা ছোটবেলায় মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, তারা
যুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতার অভিশাপের তীব্রতা বুঝি। তাই আমাদের সন্তানরা এমন এক ভয়ংকর
বাংলাদেশ দেখুক তা কখনোই চাইনি। তাই না চাওয়া সেই ভয়ংকর বাংলাদেশ যখন বাস্তবে দেখতে
পাই, তখন অনুশোচনা হয়, অন্তর কাঁদে আর যারা আপনজন হারিয়েছেন তাদের কথা ভাবলেই চোখ
ভিজে যায়।
সাধারণ মানুষ
আস্থা রেখেছিল রাষ্ট্রের ওপর। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সে আস্থার
পুরস্কারস্বরূপ একটি শান্তির দেশ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন তা সম্ভব হলো না, এর
উত্তর খুঁজতে হবে আগামীতে শান্তিতে থাকার স্বার্থে। একটি দেশে না পাওয়ার বেদনায় দগ্ধ,
পেয়েও হারানোর শোকে কাতর কিংবা অপ্রত্যাশিত ও অবৈধভাবে অতিমাত্রায় পেয়ে ধরাকে সরা
জ্ঞান করা মানুষসহ নানা প্রকারের নাগরিক থাকাটাই স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ। আর রাষ্ট্র
তার নাগরিকের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজকর্মচারী ও বিজ্ঞজনের
বুদ্ধি, যুক্তি ও পরামর্শের সমন্বয় ঘটিয়ে সব নাগরিকের ওপর নজর রাখবে এবং শিষ্টের
লালন ও দুষ্টের দমন করে মানুষের চাহিদা পূরণ করবে এমন প্রত্যাশায় কেটে গেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী
প্রায় ৫৩ বছর।
পৃথিবীর যেকোনো
মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা হলো তার বেঁচে থাকার অধিকার। আর তাই তো পৃথিবীর বহু দেশেই
মৃত্যুদণ্ড নেই। আর যেসব দেশে আছে, সেসব দেশেও মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান ও তা কার্যকর
করতে গেলে পার হতে হয় দীর্ঘ সময়। কিন্তু যে বাংলাদেশ গত কয়েক দিন দেখা গেল, সেখানে
এই বেঁচে থাকার অধিকারই যেন হুমকির মুখে পড়েছিল, যা কখনোই কাম্য ছিল না। অবশেষে কালরাতের
শেষে যেন ভোরের আলো ফুটল। আপামর মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার দুই পাশে নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানকে নিয়ে জানালেন সমস্ত
হত্যা ও অন্যায়ের বিচার করা হবে, জনগণের দাবি পূরণ করা হবে এবং এমনভাবে দেশ পরিচালিত
হবে যে জনগণ আশাহত হবে না। ৫ আগস্ট বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ
করেছেন এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও সুশীলসমাজের
প্রতিনিধির সঙ্গে সুন্দর আলোচনার ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারই দেশ পরিচালনা করবেÑএমন
ঘোষণায় আস্থা ফিরেছিল মানুষের মনে। ‘ইনশা আল্লাহ আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম
হব’Ñসেনাপ্রধানের এমন কথায় দেশের মানুষ আস্থা রেখেছিল। সে অধ্যায় পেরিয়ে আমরা এখন
আরেকটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছি, অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনাধীনে। যেকোনো অরাজকতা,
শিক্ষার্থীশূন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নীরব কলকারখানা আর স্থবির বন্দরজনিত অপূরণীয় ক্ষতি
বহন করার মতো সক্ষমতা আর এ দেশের নেই।
৫ আগস্ট অপরাহ্ণে
যখন দেশের শাসনকার্য পরিচালনায় পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট দৃশ্যমান হলো তখন দেশের মানুষের
মধ্যে স্বস্তির আবহ ফিরে আসে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিজয়োল্লাসের ফাঁকে সুযোগসন্ধানীরা
মেতে ওঠে ধ্বংসযজ্ঞে। আমরা দেখেছি, কীভাবে তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করেছে
একই সঙ্গে লুটপাটও চালিয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে অনেক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং লুটতরাজের
ঘটনাও ঘটেছে। ৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী ৬ আগস্ট পর্যন্ত এমন চিত্র নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার
মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। দেশজুড়ে সৃষ্টি হওয়া গণজোয়ারের মধ্যে একশ্রেণির সুযোগসন্ধানীর নিয়ন্ত্রণহীন
এ লুটপাট এবং জীবনবৈরী কর্মকাণ্ড নিশ্চয়ই মেনে নেওয়ার মতো নয়। এ সুযোগে কেউ কেউ ব্যক্তিগত
ক্ষোভ মেটানোর প্রয়াস চালিয়েছেন এমন খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সরকারি-বেসরকারি
স্থাপনাসহ নাগরিক সমাজের অনেকের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা যে কদর্য অধ্যায়
সৃষ্টি করেছে এর নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই।
শুধু সেখানেই
সুযোগসন্ধানীদের অপতৎপরতা থেমে থাকেনি। দেশের বেশ কিছু জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর
ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে লুটপাটের খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এমনকি তাদের
মন্দির-উপাসনালয়েও হামলা ঘটেছে। ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় এসব কর্মকাণ্ড যারা চালিয়েছে তারা
কোনোভাবেই আন্দোলনকারীদের অংশীজন নয় এটা বিশ্বাস করি। কারণ শুভবোধসম্পন্ন কারও পক্ষেই
এমন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার মানসিকতা থাকার কথা নয়। একই সঙ্গে এও দেখা গেছে,
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর ওপর বহু হামলা ঘটেছে এবং অনেক
থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সবই অনভিপ্রেত-অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। আমরা বরাবরই এসব
কর্মকাণ্ডের চরম নিন্দা জানাই। জনগণের জানমাল রক্ষায় অবশ্যই শ্যেনদৃষ্টি রাখতে হবে
এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করার ব্যাপারেও কোনোভাবেই উদাসীনতা কাম্য নয়। আন্দোলন চলাকালে জনকাতারের কাউকে
কাউকে অস্ত্রধারী হিসেবে দেখা গেছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর তারা গুলিও চালিয়েছে। তাদের
চিহ্নিত করে ধরতে তো হবেই একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারেও জোরালো পদক্ষেপ
নিতে হবে। আমরা লক্ষ করেছি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা বরাবরই বলে আসছেন,
ধ্বংসাত্মকসহ কোনো ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডেই তারা সম্পৃক্ত নন। তাদের এ কথা আমরা
অবিশ্বাস করি না।
অন্তর্বর্তী সরকার
জননিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এটা আমাদের সঙ্গতই প্রত্যাশা। সহিংসতা
কিংবা জনবৈরী যেকোনো কর্মকাণ্ড শান্তির বড় অন্তরায়। আমরা এমনিতেই অনেক সংকটের মধ্য
দিয়ে চলেছি এর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট অন্যতম। আমাদের জাতীয় অর্থনীতি যখন সংকটকাল অতিক্রম
করছিল তখন হিংসাশ্রয়ীদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অভিঘাত এর ওপর নতুন করে লাগে। রাজনৈতিক-সামাজিক
স্থিতিশীলতা সমৃদ্ধ অর্থনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ। দেশপ্রেমবোধে উজ্জীবিত কেউই ধ্বংসাত্মক
কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে পারে না এটা দৃঢ় বিশ্বাস। আন্দোলন-সংগ্রাম-বিপ্লব-বিদ্রোহের
দেশ বাংলাদেশÑএ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। দেশের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে
অতীতে শুধু বিদেশি শাসককেই তাড়ায়নি, তারা দেশ গঠনেও বড় ভূমিকা রেখেছে। তাদের প্রতি
বরাবরই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। আমরা আশা করি, জননিরাপত্তা নিয়ে নাগরিকসমাজে যে শঙ্কা বিরাজ
করছে এর নিরসনে দ্রুত সব কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হবে। আমরা কোনোভাবেই অশান্তির
দাবানল দেখতে চাই না। আমরা শান্তি চাই, স্বস্তি চাই। জননিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে দ্রুত
সব ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
নিজ দেশের মানুষের প্রতি অনাবশ্যক গুলি না ছুড়ে আমাদের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী বিশেষত তিন বাহিনীর প্রধানগণ জনগণের আকাঙ্ক্ষার ও মৌলিক অধিকারের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছেন। আর তাই জনগণেরও উচিত সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানদের দেওয়া সম্মানকে মূল্যায়ন করা এবং দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীকে সহায়তা করা। শেষ করব মহাত্মা গান্ধীর একটি সর্বজনীন বাণী স্মরণ করে। তিনি বলেছেন, ‘চোখের বদলে চোখ এক দিন সমগ্র পৃথিবীকে অন্ধ করে দেবে।’