ফিলিস্তিনে গণহত্যা
হামিদ দাবাসি
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৪৫ এএম
হামিদ দাবাসি
নিজ দলের প্রবল
চাপের মুখে অবশেষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন জো বাইডেন। যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অবস্থা নাজুক। কমলা হ্যারিসকে এমন একজনের বিরুদ্ধে নির্বাচন
করতে হবে যিনি নিজে ফ্যাসিস্ট এবং সাজাপ্রাপ্ত। আমেরিকার লিবারেলদের জন্য পরিস্থিতি
বেশ খারাপই ছিল। তবে কমলা হ্যারিস মনোনীত হওয়ার পর তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন।
এক রাতের ব্যবধানে হ্যারিসের ক্যাম্পেইনে প্রচুর অর্থ আসতে শুরু করে। ক্যারিবিয়ান ও
ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নারীকে ক্ষমতায় দেখার জন্যও আগ্রহী অনেকে। অন্তত মার্কিন রাজনীতির
হিসেবে হ্যারিস ট্রাম্প থেকে এগিয়ে।
এরপরই এলো বেনিয়ামিন
নেতানিয়াহুর মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ। এই যুদ্ধাপরাধী এক ভয়াবহ ভাষণ দিলেন। হ্যারিস অবশ্য
নেতানিয়াহুর এই ভাষণের দিন উপস্থিত থাকতে রাজি হননি। তিনি ওয়াশিংটন ত্যাগ করার একটা
ছুতো দিয়ে সরে যান। তবে এই যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ থামাতে পারলেন না। নিজেদের
সাক্ষাতে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধন কতটা দৃঢ় তার প্রশংসা করেন। ইসরায়েল
গণহত্যা চালালেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমর্থন দেবেÑ এমন কথাও বলেন। পরবর্তীকালে হ্যারিস
অনেকটা নিরপেক্ষ সুরে আসেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি জানান এবং তিনি এই
হত্যার বিপক্ষে চুপ থাকবেন না ঘোষণা করেন। এমন একটি বক্তব্য শুনলে আশা জাগতে পারে।
তবে বাস্তবে কি তাই?
হ্যারিস জানেন
তার দলের বামপন্থিদের সঙ্গে সখ্য রাখতে হবে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টিও তা বোঝে। তিনি ফিলিস্তিনে
আগ্রাসনের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। তবে যা বলেছেন তার গোপন অর্থ আরও ভয়াবহ। তার বক্তব্য,
‘আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গাজা সংকট নিয়ে আমার শঙ্কা জানিয়েছি। গাজায় এত
মৃত্যুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এমনকি সেখানে ২০ লাখ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার অভাব নিয়ে
আলোচনা করেছি। গাজায় গত ৯ মাসে যা ঘটেছে তা মেনে নেওয়ার মতো না। শিশুদের মৃত্যু, খাদ্যহীনতা
ও নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। এসব বিষয়ে আমাদের চুপ থাকার সুযোগ নেই। আমরা চুপ
থাকব না।’
পুরো পশ্চিমা
সম্প্রদায় ফিলিস্তিনে গণহত্যাকে মানবিক সংকট হিসেবে দেখাচ্ছে। কিন্তু এ ফাঁদে আমাদের
পা দিলে চলবে না। সংক্ষেপে বললে, কমলা হ্যারিস মানবিক সংকটকেই বড় করে দেখছেন। গণহত্যার
বিষয়টি তিনি লক্ষ করছেন না। ফিলিস্তিনিরা নিজ বাসভূমের জন্য লড়াই করছেন এ বিষয়টি যেন
তার জন্য মুখ্য বিষয় নয়। বরং তার এই অবস্থান ফিলিস্তিনিদের লড়াইয়ের অবস্থানকে আরও খেলো
করে তোলে। ইসরায়েলের সঙ্গে বাইডেনের যে সমঝোতা ছিল, কমলাও সেদিকেই হাঁটছেন। তাদের কথার
মানে কী? ইসরায়েলকে সব ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবেই। গণহত্যাকারী জায়নিস্টদের সব
ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। ফিলিস্তিনিদের লড়াই-সংগ্রামের বিষয়টি এখনও জঙ্গিবাদ হয়েই
থাকবে। হ্যারিস দুই রাষ্ট্রের মতো অযথা উক্তিই কপচাচ্ছেন। হ্যারিস ও তার উত্তরসূরিদের
মধ্যে পার্থক্য নেই। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তার বয়ান দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য।
গত ১০ মাসে বাইডেন
প্রশাসন ফিলিস্তিনি গণহত্যার জন্য ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্রের চালান দিয়েছে। হ্যারিস নিজেও
কি এই সিদ্ধান্তের অংশ ছিলেন না? তাহলে ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার সহানুভূতির অর্থ আসলে
কী? তিনি কীভাবেই-বা তাদের সহযোগিতা করবেন? তার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই লেখার
উদ্দেশ্য না। বরং আমার মনে হয়, মানবিক সংকট বলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল দিকে নিয়ে যাওয়া
হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের সংগ্রামকে বরং অরাজনীতিক করা হচ্ছে।
প্রধান যুদ্ধাপরাধীর সাথে দেখা করার পর, হ্যারিস
এই অপরাধে আতঙ্কিত বলে বেরিয়ে আসে। তাই কি? এটি কীভাবে গণহত্যামূলক
জায়নবাদের প্রতি তার দেশের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথাকে বিশ্লেষণ করে? তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রতি আমার অটুট
প্রতিশ্রুতি ছিল।’ আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, মরক্কো, ভারত, ইরান, মিসর, তুরস্ক, ফ্রান্স
বা ফিনল্যান্ড: অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিষয়ে কি তারা এভাবে কোনো কথা বলে কখনও? কেন
এই মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েলের ‘অস্তিত্বের’ প্রতি তাদের অঙ্গীকারের ওপর জোর
দিচ্ছেন? কারণ তারা জানেন এই ভূখণ্ড চুরি করা অর্থাৎ অন্যের জন্মভূমিতে নির্মিত হয়েছিল। এইভাবে, পশ্চিমে
একটি উদ্বেগ রয়েছেÑ যা স্পষ্টতই সেটলার কলোনির সমর্থনের এই সমস্ত অভিব্যক্তিকে
অস্বীকার করে।
এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস, হ্যারিস
যাতে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তার আচরণের সাথে প্রতিক্রিয়াশীল প্রত্যুত্তর না আসে তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ
করছে। প্রকৃতপক্ষে, উদার সাম্রাজ্যবাদের পুরো শাসন
ফিলিস্তিনি প্রশ্নকে মানবিক সংকটে রূপান্তর করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, কিন্তু
আমাদের কখনই সেই ফাঁদে পা দেওয়া উচিত নয়। ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ একইভাবে একটি
অশুভ বিভ্রান্তি,
যা জায়নবাদীরা একটি মরীচিকা হিসেবে তৈরি করেছে; যখন তারা আস্তে
আস্তে ফিলিস্তিনকে নিশ্চিহ্নই করে দিচ্ছে। তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অনেক ভূখণ্ডই এভাবেই
নিয়ে নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটভূমি একদিকে বিদেশে গুণ্ডা
সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশে জঙ্গি ফ্যাসিবাদ এবং বিদেশে উদার সাম্রাজ্যবাদ এবং অন্যদিকে
আধা-বুদ্ধিমান দেশীয় নীতির মধ্যে আটকে আছে। লাখ লাখ আমেরিকান ঠিকই হ্যারিসের
প্রতিদ্বন্দ্বী,
বর্ণবাদী চার্লাটান ট্রাম্পকে পুনরায় পদে বসতে বাধা
দেওয়ার জন্য ভোট দিতে প্রস্তুত। কিন্তু
এখন যখন একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধরত সেটলার কলোনির কথা আসে, হ্যারিস ভিন্নভাবে কিছুই করবেন না। তার অবস্থান তার পূর্বসূরিদের
মতোই হবে। এর বাইরে তিনি যাবেন না এবং তার যাওয়ার সুযোগও নেই। তিনি ইসরায়েলকে সশস্ত্র সহযোগিতা ঠিকই দিয়ে যাবেন।
এভাবে তিনি নেতানিয়াহুর নৃশংসতাকে সহজতর করবেন। এদিকে, বাকি
বিশ্বকে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও
অপরিসীম আত্মত্যাগের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। তাদের
মাতৃভূমিকে নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত মুক্ত করার দাবিকে দাবিয়ে দেওয়া চলবে না।
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন