শাসনব্যবস্থা
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৪ ১৪:১৯ পিএম
অলঙ্করণ প্রবা
বিগত এক মাসের বেশি সময়ের বাংলাদেশ উত্তাল ও নবজাগরণের বাংলাদেশ। বিগত এক মাসের বেশি সময়ের বাংলাদেশ জীবনের ক্ষয় ও পারিপার্শ্বিকতার ক্ষতচিহ্ন ধারণকারী বাংলাদেশ। ৫ আগস্টের পর বিগত দুই দিনের বাংলাদেশে দেখা গেল আরও বহুবিধ উপসর্গের প্রেক্ষাপটে জনজীবনে ত্রাস আর আন্দোলনের ফাঁকে গড়ে ওঠা সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্তচক্রের নখরাঘাত। যখন লেখাটি লিখছি, তখন সামনে রয়েছে আরেকটি নতুন অধ্যায় শুরুর প্রস্তুতি, নতুন পর্বের বাংলাদেশের প্রস্তুতি। ৮ আগস্ট রাত থেকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শাসিত বাংলাদেশের যাত্রা হলো। বহু মেরুকরণের সমীকরণে কষা বর্তমান বাংলাদেশের যাত্রা এক নতুন গন্তব্যের দিকে, যার লক্ষ্যকেন্দ্রে রয়েছে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিচর্চার নাগরিক সমাজের সমানাধিকারের বাংলাদেশ। ৮ আগস্ট রাত থেকে এমন এক গন্তব্যের দিকে অভিযাত্রা যেখানে রয়েছে প্রত্যাশার সব নাভিকেন্দ্র।
আমরা জানি, ক্ষয়ে-জয়ে ৫৩ বছরের আজকের বাংলাদেশে রাজনীতিকদের ভুলে-স্বার্থপরতায়-স্ববিরোধিতায় অনেক মহত্তম অর্জনের বিসর্জন ঘটেছে। অর্জন ও তার পরবর্তী ধাপগুলোর দিকে এ দেশের পোড়খাওয়া সচেতন মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকবে। শপথ নেওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘কারও ভুলে বিজয় যাতে বেহাত না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।’ অন্যদিকে ক্রান্তিকালে রাষ্ট্রের শাসনভার কাঁধে নিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রতিশ্রুতি দেন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টির ব্যাপারে সেনাবাহিনী সব রকম সহযোগিতা করবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর তিনি এও বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত উনি আমাদের একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।’ জনপরিসরেও প্রত্যাশার পাহাড় এবং একই সঙ্গে বহুবিধ প্রশ্নও আছে। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে এত বড় পরিবর্তন ঘটে গেল, এর সুফল কোনো মহলবিশেষের ঘরে ওঠে কি না এ প্রশ্নও রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ বলেছেন, ‘কোনো দলের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য অভ্যুত্থান করিনি।’
৭ আগস্ট ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির বিশাল সমাবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার ভিডিও বক্তব্যে বলেছেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়। আসুন ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। আসুন আমরা তরুণদের হাত শক্তিশালী করি।’ তার বক্তব্যের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে যুক্ত হয়ে ভার্চুয়াল বক্তব্যে জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘শক্তহাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করুন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’ একই দিন আমরা এও দেখলাম, সদ্যসাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিদেশে বসে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে সাহস নিয়ে দাঁড়াতে হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি বলেছিলাম, আমার পরিবার আর রাজনীতি করবে না। তবে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে হামলা হচ্ছে এ পরিস্থিতিতে আমরা হাল ছেড়ে দিতে পারি না।’ দুই মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের তার ওই ভিডিও বার্তায় আরও অনেক কথাই আছে। যে প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা সহিংস ছিল না এবং তাতে কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও ছিল না। পরবর্তীতে কীভাবে তা অহিংস হয়ে ওঠে এবং ভিন্ন মোড় নেয় তা-ও সচেতন মানুষমাত্রেই জানা। এখন ওই প্রেক্ষাপটে যেসব রাজনৈতিক বক্তব্য আমরা শুনতে পাই, তা এ লেখার মূল ভিত্তি নয়। প্রসঙ্গক্রমে যেটুকু প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে শুধু সেটুকুই তুলে ধরলাম।
আমরা দেখেছি, ৫ আগস্ট অপরাহ্ণ থেকে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন কার্যত স্থবির ছিল। পুলিশ দায়িত্ব পালনে ছিল নিষ্ক্রিয়। ৫ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। জানমালের নিরাপত্তাও চরম হুমকির মুখে পড়ে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খুন-খারাবি, ডাকাতিসহ বহুবিধ জীবনবৈরী কর্মকাণ্ডে থরো থরো হয়ে ওঠে জনজীবন। প্রতিকার চাওয়া কিংবা প্রতিবিধান করার কার্যত অনেক কিছুই ছিল অনুপস্থিত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে অনেক রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও স্থাপনায় চলে ধ্বংসযজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও স্মৃতির ওপরও কঠিন অভিঘাত লাগে। প্রথম থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা বলে আসছেন, কোনো ধ্বংসযজ্ঞে তারা জড়িত নন। তাদের কথা আমরা অবিশ্বাস করিনি, করবও না। কারণ, এমন ধ্বংসযজ্ঞ কোনো শুভবোধসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এসব তারাই ঘটিয়েছে যারা সব সময়ই পরিস্থিতির মওকা নিতে পথ খোঁজে। এ ব্যাধি আমাদের রাজনীতি ও সমাজের নতুন নয়, সময়ে সময়ে এর চরিত্র বদলেছে মাত্র।
আমাদের অভিজ্ঞতায় আরও আছে, যেকোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিংবা সংঘাত-সহিংসতায় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষই বেশি আক্রান্ত হন। এর ব্যতিক্রম এবারও ঘটেনি। মন্দির-উপাসনালয় সেই পুরোনো কায়দায়ই আক্রান্ত হয়েছে। হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের যেসব ঘটনা ঘটেছে এর মোকাবিলায় যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। সংখ্যালঘুদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সহায়সম্পদ কেড়ে নেওয়ার বার্তাও মিলেছে সংবাদমাধ্যমেই। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ বাড়ির সঙ্গে বাংলাদেশে অভ্যুদয় থেকে শুরু করে এর পূর্বাপর অনেক কিছুর সম্পৃক্ততা রয়েছে, যা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একজন ব্যক্তিই নন, তিনি বিশ্ব ইতিহাসে বাঙালির অবিস্মরণীয় নেতা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। ইতোমধ্যে আমরা কারও কারও উচ্চারণে এও শুনেছি, বাংলাদেশে কোনো ভাস্কর্য থাকবে না। এর আলামত ক্রমেই পুষ্টও হচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাঁধে ভর দিয়ে এই যে অনভিপ্রেত-অনাকাঙ্ক্ষিত হীন রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, এ ব্যাপারে অবশ্যই ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সতর্ক থাকতে হবে। তাদের অর্জন ছিনিয়ে নিয়ে যাতে কোনো দল বা মহল বিশেষ হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার উপাদান না পায়, এ ব্যাপারেও সজাগ থাকা জরুরি।
আমরা আক্রান্ত হতে দেখেছি সংবাদমাধ্যমও। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী প্রায় এক মাসের ও এর পরবর্তী তিন-চার দিনের প্রেক্ষাপট এ সবকিছুর বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্নমাত্রিক। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, কোনো রাজনৈতিক সরকারের আমলেই সংবাদমাধ্যমের পথ মসৃণ ছিল না। প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়েই চলতে হচ্ছে সংবাদমাধ্যমকে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায় সবার আগে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রতিটি সহিংস ঘটনার শিকড় সন্ধান এবং যথাযথ তদন্তক্রমে আইনি প্রতিবিধান দ্রুত নিশ্চিত করাও জরুরি। আইনশৃঙ্খলা মধ্যে যে কদিন সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিল তখন সংঘটিত সব জীবনবৈরী ঘটনার অনুসন্ধানে তাদের যথাযথ সহযোগিতা দরকার। একই সঙ্গে জরুরি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তারুণ্য ফের বাংলাদেশে যে দৃষ্টান্তযোগ্য নজির সৃষ্টি করেছে তা যেন সামনে থাকে। তারা জাগরণ ঘটিয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে, অধিকারের সমতল মাঠ গড়ে তোলার লক্ষ্যে। তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের সড়কে দাঁড়িয়ে ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে দেখিয়ে দিয়েছে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা মোটেও দুরূহ নয়, যদি সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ থাকেন। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা আমাদের অনেক পুরোনো দাবি। সুশাসন নিশ্চিত হলে যেকোনো অপচ্ছায়া সরতে বাধ্য। আমাদের স্মরণে আছে, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতারণা ও ভুলের সব অধ্যায়ের কথাও।
৮ আগস্ট স্বদেশে ফিরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে জয়ের মিছিল আগেও বহুবার বের হয়েছে কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছার আগেই তা থেমেও গেছে। অর্থাৎ অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। এবারের মিছিল অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে সেই প্রত্যয়ে জাগিয়ে রাখুক প্রজন্মকে। বৈষম্যের ছায়া সরুক। অধিকারের মাঠ হোক সমতল। তারুণ্যের অমিত শক্তি পুঁজি করে বিনির্মাণের কাজ চলুক যূথবদ্ধ প্রয়াসে। উচ্চারণ আর অন্তরের কথা যেন এক হয়। বহুমাত্রিক রূপান্তরের প্রয়োজনে এর কোনো বিকল্প নেই। এবারের গণজাগরণের শিক্ষা রাজনীতিকদের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা, ক্রান্তিকালে তারা যেন হয় সর্বজনের।তাদের কাছ থেকে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার শাসনকার্য পরিচালনায় রাষ্ট্রকে গণমুখী করে তোলার শিক্ষা নিক। যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে এর উপশসসহ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি জনহিতকর নয় এমন কোনো কিছু তাদের দ্বারা সৃষ্টি হবে না।
লেখক : সাংবাদিক ও কবি