রাষ্ট্রচিন্তা
এম হাফিজ উদ্দিন খান
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৪ ১০:২৮ এএম
এম হাফিজ উদ্দিন খান
এখন সবার আগে
জরুরি শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এ দিকটায় প্রথমেই গভীর মনোনিবেশ
করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন অহিংসভাবে শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত
চরম সহিংস হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা রকম বিশ্লেষণ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছিল। সচেতন
কেউই অজ্ঞাত নন যে, একটি অভাবনীয় পরিস্থিতির মধ্যে দেশ-জাতি নিপতিত হয়েছিল। পরিস্থিতি
ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠেছিল। দেখা গেছে, প্রায় সব শ্রেণির মানুষ এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত
হয়। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত-সহিংসতায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে
সংবাদমাধ্যমে উপস্থাপিত প্রতিদিনের সংখ্যাচিত্র অনুসারে তা যে কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে তাতে
তো কোনো সংশয় নেই। ইতোমধ্যে অনেক রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং এযাবৎ ধ্বংসকৃত সম্পদের
ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় করা এত দ্রুত খুব কঠিন। এসবই ফ্যাসিবাদি শাসনের ভয়াবহ বিরূপ ফল।

জীবন ক্ষয়ের কোনো
ক্ষতিপূরণ হয় না। ইতোমধ্যে যেসব মানুষের প্রাণ ঝরে গেছে এবং যারা আহত হয়ে কাতরাচ্ছেন
তাদের পরিবার-স্বজনদের ব্যথা-বেদনা ভুক্তভোগী মাত্র জানলেও আমাদেরও কম ব্যথাতুর করে
না। ফিরে তাকাই পেছনে। আইয়ুব খানের মার্শাল ল যখন জারি হলো তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়ি। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। তারপর ’৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, ছয় দফা
আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধীন দেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছি।
রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রাম
কিংবা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ অর্জনের যে প্রত্যয় ছিল এ যে পূর্ণ হয়নি
তা মিথ্যা নয়।
স্বাধীনতার পূর্বাপর
যে অধ্যায়গুলোর আন্দোলনের কথা উল্লেখ করলাম এর চেয়ে এবারের আন্দোলন বহুলাংশে তীব্র
ছিল। একই সঙ্গে এবারের আন্দোলনে সরকার যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে অতীতে এত উৎকটরূপে তা
দেখাও যায়নি। এটা একটা অভাবনীয় এবং অকল্পনীয় অধ্যায় তো বটেই, একই সঙ্গে অত্যন্ত মর্মান্তিক
ও খুব কষ্টের। সংবাদমাধ্যমের ছাপা ও অনলাইন সংস্করণ এবং একই সঙ্গে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয়
গত কয়েক দিনে যে চিত্র উঠে আসে তাতে সঙ্গতই প্রথমত প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিলÑএর শেষ কোথায়?
দুদিন আগে একটি দৈনিকে সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন রেখেছিলাম, গুলি-গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি
কি সামাল দেওয়া যাবে? এ পন্থায় কি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব? অভিজ্ঞতা বলেছিল,
সম্ভব নয়। চোখের সামনে যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো ঢাকা দিয়ে রাখার চেষ্টা করা আরও বেশি
ভুল ছিল। তা ছাড়া বর্তমান জমানায় প্রযুক্তির বিকাশ এতটাই ঘটেছে কোনো কিছুই ধামাচাপা
দিয়ে রাখা মোটেও সহজ বিষয় নয়। ইন্টারনেট কিংবা সমাজমাধ্যমসহ প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যম
বন্ধ করে দিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকা দিয়ে রাখা কঠিন। আগেই বলেছি,
আগের আন্দোলনগুলো থেকে এবারের আন্দোলনের পার্থক্য বিস্তর এবং কারণও স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের
সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযুক্তির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পরিস্থিতি শুধু
কোটা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে মিশেছে মানুষের অনেক
ধরনের চাপা ক্ষোভ কিংবা কষ্ট।
প্রশ্ন উঠতেই
পারে সেই চাপা ক্ষোভ কিংবা কষ্টের কারণ কী? মানুষ যখন তার পুঞ্জীভূত দুঃখ কিংবা ক্ষোভ
প্রকাশে ন্যূনতম সুযোগ পায় তখন তা অনেক ব্যাপকভাবে বিস্ফোরিত হয়। দীর্ঘদিনের টানা মূল্যস্ফীতির
ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বমুখী পারদ, বৈষম্য, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতার
অপসংস্কৃতি এ পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্য বড় উপসর্গ হিসেবে কাজ করেছে। চলমান আন্দোলনে হতাহতের
কারণ বিশ্লেষণে অনেক রকম তথ্য উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি হতাহতের প্রায় ৭৫ ভাগ
কম বয়সি এবং ৭৮ ভাগ নিহতের শরীরে প্রাণঘাতী বুলেটের চিহ্ন রয়েছে। প্রাণঘাতী বুলেট পুলিশ
ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ ছাড়া ছাড়তে পারে না, এটি সিআরপিসি এবং অন্যান্য আইনে বলা আছে।
কিন্তু এবারের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে যারা হতাহত হন, তাদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম
লক্ষ করা গেছে তা-ও সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ। ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি ছুড়লেও তা
হাঁটুর নিচে করতে হবে এটিও বিধান। কিন্তু আমরা দেখলাম যারা গুলিতে হতাহত হয়েছেন তাদের
শরীরের বিভিন্ন স্থানে বুলেট বিদ্ধ হয়েছে।
সন্দেহ নেই যে,
এবারের আন্দোলনে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মর্মস্পর্শী
প্রাণহানির ঘটনা জনমনে আরও উত্তাপ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে পুলিশ
খুব কাছ থেকে আবু সাঈদকে গুলি করে এবং তিনি বুক ও পেটে গুলিবিদ্ধ হন। অথচ পুলিশের অভিযোগে
উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের গুলিতে ও ইটপাটকেলে আবু সাঈদ প্রাণ হারিয়েছেন। এমন
অসত্য বক্তব্য সাধারণ মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করে। কারণ তারা স্পষ্টতই দেখল এক আর রুজু
করা মামলায় বলা হলো এর বিপরীত কথা। সত্য মিথ্যা দিয়ে ঢাকলে বা বিকৃত করলে তাতে জনমনে
ক্ষোভ আরও বেশি সঞ্চারিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে কয়েকজন শহীদ
হওয়ার পর ঘটনা কীভাবে দ্রুত মোড় নিয়েছিল। হতাহতদের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে
তদন্ত করে, বিচারের ব্যবস্থা কেমন করে তা দেখার বিষয়।
দেশের অর্থনীতির
অবস্থা এমনিতেই নাজুক। আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার অন্ত নেই। বিভিন্ন রকম অনিয়ম-দুর্নীতির
অপচ্ছায়া পড়েছে এ খাতে। এর ফলে দেশ-জাতির ক্ষতির চিত্র আরও স্ফীত হয়ে উঠছে। বিদ্যমান
পরিস্থিতিতে অর্থনীতির ওপর আরও বড় অভিঘাত লেগেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, রেমিট্যান্স
প্রবাহে ভাটা, রপ্তানি খাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া, একই সঙ্গে আমদানি প্রক্রিয়ায়
বিঘ্ন ঘটা ইত্যাদির অভিঘাতও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্রমেই বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব ক্ষত উপশমে কিংবা দুরবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একের পর এক সুপারিশও এসেছিল।
কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বিদায়ী সরকারের সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হয়নি। নিশ্চয় তা
দুঃখজনক। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে অর্থনীতির ওপর অভিঘাত ক্রমেই
বাড়তে থাকবে এবং তা কোনোভাবেই দেশ-জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
সুশাসন, ন্যায়বিচার,
বৈষম্যের নিরসন এসব ব্যাপারে দীর্ঘদিনের জনদাবি রয়েছে। কিন্তু এর কোনো ক্ষেত্রেই ইতিবাচক
কিছুই একদিন পরিলক্ষিত হয়নি। বিচারব্যবস্থা নিয়েও আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছিল। ভুক্তভোগী
অনেকেরই বক্তব্য আইনি প্রতিকারের পথ মসৃণ নয়। আমরা দেখছি, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে অনেকেই
শিশু-কিশোর; অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এক একটি মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয় শত
শত মানুষকে। দেশে-বিদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা উঠে। কোটা সমন্বয়
আন্দোলনের ছয়জন সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে রাখায় আইনের শাসন কিংবা বিচারব্যবস্থার প্রতি
মানুষের কঠোর সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের আটক করে রাখা
কোনোভাবেই আইনানুগ ছিল না। আমরা দেখছি, পুরোনো বহুবিধ উপসর্গের সঙ্গে নতুন করে আরও
অনেক উপসর্গ যুক্ত হয় যা ব্যাপক ক্ষত সৃষ্টি করে।
এও বলেছিলাম,
বলপ্রয়োগের পথ পরিহার করা উচিত। শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার দ্রুত সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া
বাঞ্ছনীয়। আমাদের অনেক সমস্যা আছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিভাজন দৃশ্যমান। আমরা যদি আমাদের
কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে চাই তাহলে বিগতভ সরকার যে পথে
হাঁটছে তা পরিহার করতে হবে, এও বলেছিলাম। সাংবিধানিক অধিকার নাগরিকরা যাতে ভোগ করতে
পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। যে বিভাজন দৃশ্যমান তা কোনোভাবেই মঙ্গলজনক নয়। আমরা দেখছি
ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়েও আমরা এক হতে পারি না। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।
আমরা শান্তি
চাই। যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে রক্তপাত-হানাহানি এবং জীবনবৈরী সব কর্মকাণ্ড। যে
পরিস্থিতি দৃশ্যমান তা শুধু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারই বড় কারণ হিসেবে জিইয়ে থাকেনি একই সঙ্গে
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আমাদের ভাবমূর্তি এ কারণে অনেকাংশে ম্লান হয়েছে। তা পুনরুদ্ধার
করতে হবে। বিদায়ি সরকার কেন সংঘাতময় পরিস্থিতির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল তা কোনোভাবেই
ধারণার বাইরে থাকার বিষয় নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দৃশ্যমান
হোক।