পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু
ড. মো. ইদ্রিস আলম
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৪ ১০:১৫ এএম
ড. মো. ইদ্রিস আলম
শিশু এবং কিশোরদের
পানিতে ডুবে মৃত্যু একটি অবহেলিত জাতীয় সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর ২০১৯
সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে ২ লাখ ৩৬ হাজার লোক পানিতে ডুবে মারা যায়। যার ৯০% ঘটে
নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশসমূহে। বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী এক থেকে চার বছরের শিশুরা পানিতে
ডুবে সবচেয়ে বেশি মারা যায় এবং দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ বয়স হলো পাঁচ থেকে নয় বছর। হুর ২০১৭-এর
তথ্য অনুযায়ী ছেলেশিশুরা মেয়েশিশুর তুলনায় দ্বিগুণ পানিতে ডুবে মারা যায়। পানিতে মৃত্যু
পরিহারযোগ্য তবে পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিহারে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল
দেশে অপেক্ষাকৃত কম।
বাংলাদশের প্রথম
স্বাস্থ্য এবং তথ্য জরিপ (২০১৩) অনুযায়ী এক থেকে ১৭ বছরের শিশুদের অপমৃত্যুর প্রধান
কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু; যা যৌথভাবে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি এবং কলেরা দ্বারা মৃত্যুর
চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাস্থ্য এবং তথ্য জরিপ (২০১৬) অনুযায়ী বছরে ১৪ হাজার
৪৩৮ জন (এক-১৭ বছর বয়সি) শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ
বয়স্কদের তত্ত্বাবধানের অভাব, গ্রামে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের অভাব, অতিদারিদ্র্য,
পুকুর-জলাধারে নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব এবং সাঁতার না জানা। বাংলাদেশে প্রায়ই সাঁতার
না জানায় আট-নয় বছরের শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। ২০২২ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন
থেকে জানা যায়, পাঁচ বছর বয়সিদের ৮০ শতাংশ পানিতে ডুবে মৃত্যু ঘটে বসতঘর থেকে ২০ মিটার
দূরত্বের মধ্যে পুকুর-জলাশয়ে। বাংলাদেশে একাধিক শিশু বিশেষভাবে জোড়া শিশু একই স্থানে
একই সঙ্গে পানিতে ডুবে মারা যেতে দেখা যায়। সাধারণত একটি শিশু অন্য শিশুকে পানিতে ডুবে
মারা যাওয়ার সময় বাঁচাতে গিয়ে একসঙ্গে মারা যায়। এতে বোঝা যায় শিশুকে পানি থেকে নিরাপত্তা
কৌশল বিশেষত নিরাপদ উদ্ধার কৌশল সঠিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় না।
সচেতনতার অভাব,
বয়স্কদের দ্বারা শিশু তত্ত্বাবধানের অভাব এবং অবহেলাকে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর অন্যতম
প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। হু ২০১৭ সালে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে ছয়টি
প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। যথা প্রাক-স্কুল বয়সি শিশুদের পানি থেকে
নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ, পানিতে গমনপথে বেষ্টনী প্রদান, সাঁতার শেখানো এবং পানি থেকে
নিরাপত্তা কৌশলে প্রশিক্ষণ প্রদান, বন্যা ও অন্যান্য পানি থেকে সংঘটিত দুর্যোগ থেকে
সুরক্ষা, পানি থেকে শিশুদের নিরাপদে উদ্ধার এবং সিপিআর প্রশিক্ষণ প্রদান, বোট, জাহাজ
এবং ফেরিতে নিরাপদে যাতায়াতে কার্যকর বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন এবং প্রতিষ্ঠাকরণ। ওপরোল্লিখিত
ছয়টি নিবারণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে হু চারটি কৌশল প্রণয়নের সুপারিশ করে। যেমন বিভিন্ন
সেক্টরের কর্মকাণ্ডে সমন্বিতভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা বিবেচনা করা, কৌশলগত যোগাযোগের
মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যু
নিবারণে সৃজনশীল কৌশল প্রণয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থা বৈশ্বিক পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করছে। ২০২৩ সালের
প্রতিবেদনে পানিতে ডুবে মৃত্যুসংশ্লিষ্ট মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক
উল্লেখ করে নিবারণ কৗশল বাস্তবায়নের জন্য জোর দিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার
আমন্ত্রণে হু বিশ্বব্যাপী পানিতে ডুবে মৃত্যু বিষয়ে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনে সম্মত
হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২৫ জুলাই বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু পরিহার
দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট মৃত্যু
মোকাবিলায় দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রস্তুতি এবং নিবারণমূলক কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
থাকলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু বিষয়ে কার্যক্রম অত্যন্ত অপ্রতুল। বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালের
স্বাস্থ্যনীতিতে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকেও একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত
করে। শিশু নিরাপত্তায় পাইলট প্রকল্পে পানিতে ডুবে মৃত্যু বিবেচনা করলেও সরকার কর্তৃক
বাস্তবায়িত প্রকল্প এখনও সীমিত।
ডিজাস্টার অ্যান্ড
ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন (দাদু) পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা,
জনসচেতনতা এবং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং জলাধার থেকে সুরক্ষা কৌশল
শেখানো, অনিরাপদ জলাধারে বেষ্টনী প্রদান এবং কমিউনিটি ডে কেয়ার স্থাপনে কাজ করছে। অর্থসংকট,
বাস্তবায়নের সক্ষমতার অভাব এবং অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণে হু কর্তৃক প্রদানকৃত
নিবারণ কৌশল দেশব্যাপী বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। এ অবস্থায়, ব্যক্তিগত, পারিবারিক
এবং সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে ভূমিকা
পালন করা যেতে পারে। সমাজের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমরা সবাই শিশুমৃত্যু নিবারণে
ভূমিকা পালন করতে পারি। যেমন ১. শিক্ষা ঘর থেকে শুরু হয়Ñপানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বিষয়টি
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেয়ার করা ২. বাড়িতে শিশু পানি থেকে নিরাপদ কি না পর্যবেক্ষণ
করা ৩. পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ভয়াবহতা পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীর
সঙ্গে আলাপ করা ৪. বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার আড্ডায় অন্য বিষয়ের সঙ্গে এ বিষয়টি উপস্থাপন
করা ৫. প্রতিবেশীদের বাচ্চারা নিরাপদ কি না পর্যবেক্ষণ করা ৬. উঠান বৈঠকের ব্যবস্থা
করা ৭. জলাধারের পাশে বেষ্টনী প্রদানের ব্যবস্থা করা ৮. নিজে সমাজমাধ্যমে প্রচার করা
এবং অন্যকেও উৎসাহিত প্রদান ৯. আর্থিক সক্ষমতা থাকলে দরিদ্র পরিবারকে বেষ্টনীযুক্ত
খেলাঘর প্রদান ১০. শিশুদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করা (একটি সুস্থ বাচ্চা চার-পাঁচ
বছর বয়সে সাঁতার শেখা শুরু করতে পারে) ১১. ইউটিউব ও স্বীকৃত প্রশিক্ষণকারীর কাছ থেকে
সিপিআর প্রশিক্ষণ ১২. এলাকায় যুবকদের সমন্বয়ে ক্যাম্পেইন দল গঠন ১৩. জাতীয় জনসচেতনতা
ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ ১৪. এলাকায় কমিউনিটি ডি কেয়ারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং পারলে
বাস্তবায়ন করা।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণে সরকারি ছাড়াও এনজিও, কমিউনিটি অর্গানাইজেশন এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রম এখনও সীমিত। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিবারণ কৌশল বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ এবং অবদান রাখা জরুরি।