প্রেক্ষাপট
সাইফুজ্জামান
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৪ ১০:১০ এএম
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা
কতটুকু জ্ঞান সঞ্চয় ও বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারছেÑ এ প্রশ্ন আসা
স্বাভাবিক। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে উচ্চতর শিক্ষার
সুযোগ গ্রহণের বঞ্চনা প্রত্যক্ষ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
ও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতে পারে না। অনেকে বিদেশে
পাড়ি দিচ্ছে, আবার অনেকে নামসর্বস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ অর্থের বিনিময়ে পড়তে বাধ্য
হচ্ছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই শিক্ষার মান ও সার্টিফিকেট প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন
তুলেছে।
ঢাকা শহরের যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। বিদেশি
বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অভিহিত কিছু বিশ্ববিদ্যায় সরকারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিরাট অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে-এমন অভিযোগ আছে। অস্বীকার যাবে
না যে, উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আড়াইগুণ বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়টির শিক্ষার গুণগতমান কতটুকু উন্নত, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
ব্যবহারিক ক্লাস, ক্লাসে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি আধুনিক না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের
সংখ্যা বৃদ্ধি কাজে লাগবে না।
স্বল্পসংখ্যক স্থানে অধিক ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। অবকাঠামোগত সুবিধা নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ছিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
বেশ কয়েকটি পাশ্চাত্য অবধি খ্যাতির নাম ছড়াচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থীরা এ দেশে প্রযুক্তি,
চিকিৎসা ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা নিতে বাংলাদেশে আসছেন। তার পরেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
নামে কয়েকটিতে ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। সাধারণ জনগণের অর্থ দিয়ে আমাদের রাজস্ব আয় হয়।
এ আয় শিক্ষাক্ষেত্রের বাজেটের সিংহভাগে ব্যয় হয়। আর শিক্ষিত জাতি উপহার না দিতে পারলে
আমাদের কুসংস্কার, দীনতা ঘুচবে না। প্রযুক্তি উন্নয়ন, জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক জাতি নির্মাণে
ব্যর্থ হলে অন্ধকার নেমে আসবে, যা কাঙ্ক্ষিত নয়। বিশ্বে মাথা উঁচু করে আত্মপরিচয়ে গৌরবের
অংশীদার আমরা হতে চাই। নতুন প্রজন্ম শিক্ষিত না হলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত
হবে। শিক্ষাগ্রহণ যারা করছেন তাদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে সামান্য
লেখাপড়া জানা শিক্ষার্থীকে ছোট ব্যবসাতে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। এখন উচ্চ লেখাপড়া করে সামাজিক
প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রবণতার পাশাপাশি চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও পেশাজীবী
হওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মনোযোগ দিচ্ছে। শহরে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া
করার প্রবণতা বেশি। এসব ছেলেমেয়ের অনেকে দেশ ছাড়ছে উচ্চশিক্ষা ও অধিক অর্থ উপার্জনের
জন্য। তারুণ্যের স্মার্টনেস মুগ্ধ করার মতো। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত
মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে কার ছেলে, কার মেয়ে কোথায় পড়ছে, কী পড়ছে এ নিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থায়
বহুমুখী পদ্ধতি চালু আছে। বিশ্ববাজার অর্থনীতি আর পৃথিবীর বাস্তবতায় একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা
চালু সম্ভব নয়।
শিক্ষা অর্জনের বিকল্প নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
পাঠ কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়।
প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত নাগরিক তৈরি করতে না পারলে আমরা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থাকব।
ঘরে বসে শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশের লাইব্রেরি, গ্রন্থ, গবেষণা নিবন্ধ ডাউনলোড করতে পারছে। লাইব্রেরি লাইব্রেরি ঘুরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রয়োজন কমে এসেছে। সেই সঙ্গে প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহার শিক্ষা সম্প্রসারণে সহায়ক হবে এটাই কাম্য। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ; শিক্ষা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষার সঙ্গে জড়িত নীতিনির্ধারকদের সমবেত পরিকল্পনা। শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান নৈরাজ্য কাটিয়ে উঠতে তা সাহায্য করবে, সে ব্যাপারে দ্বিমত নেই। নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত, যুগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে।