এলিনা খান
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৪ ১৪:৪৬ পিএম
এলিনা খান
৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা সংস্কার আন্দোলকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার ইচ্ছা
প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গণভবনের দরজা খোলা। কোটা
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আমি বসতে চাই। তাদের কথা শুনতে চাই। আমি সংঘাত চাই না।’ কোটা সংস্কার
আন্দোলন যখন প্রাথমিক পর্যায়ে, সাধারণ মানুষ তখন এই আন্দোলনকে ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবেই
দেখেছে। ন্যায্য অধিকারের দাবিতে তারা পথে নেমেছিল এবং সাধারণ মানুষের সহানুভূতিও অর্জন
করেছিল। ছাত্রদের এই আন্দোলনে তৃতীয় একটি পক্ষ হয়তো স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করেছিল,
কিন্তু আন্দোলনের প্রথমে বড় কোনো সমর্থন তারা পায়নি। ছাত্ররাই এই আন্দোলনকে পরিচালিত
করেছে। ছাত্রদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সময়োপযোগী উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮
সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাষ্ট্র পেশিশক্তির ব্যবহার করেছিল। এবারও পেশিশক্তির
ব্যবহারে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়। পুরো বিষয়টিকে সরকার গুরুত্ব যে দেয়নি, তা এই
কদিনের নানা ঘটনায় স্পষ্ট। আন্দোলনের প্রথম থেকেই ক্ষমতাসীন দলের কারও কারও বক্তব্যে
এক ধরনের দাম্ভিকতা দেখা গেছে। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ
কার্যক্রম ও যৌক্তিক দাবিকে তারা পাত্তা দেয়নি।
আমরা দেখেছি, আন্দোলনের একপর্যায়ে ছাত্রলীগকে আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা
ও মন্ত্রী মাঠে নামার নির্দেশ দেন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি দল যাদের রয়েছে
সমৃদ্ধ ইতিহাস, তারা ছাত্রদের ব্যবহার করেছে ছাত্রদের আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য,
এটা ভাবতেও বিস্ময় লাগে। এমনটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগত ভুল। শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করার
পেছনে এক্ষেত্রে সরকারের দায় অস্বীকার করার
উপায় নেই। শুরুতেই আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা কঠিন কিছু ছিল না। তেমনটি
না করে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল আরও কয়েকজন নেতা দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য
দিয়েছেন। রাষ্ট্রে জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের দায়বদ্ধতা থাকে এবং এক্ষেত্রেই সম্পর্কের
সেতু নির্মিত হয়। যে শ্রেণিরই হোক, ওই শ্রেণির সঙ্গে চাহিদার যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে
সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবার। বিশেষত দলের গুরুত্বপূর্ণদের বক্তব্যেও যখন আমরা
দাম্ভিকতার পরিচয় পাই, তখন রাষ্ট্রীয় অবস্থা জটিল হওয়াই স্বাভাবিক। পরিস্থিতি যে ক্রমেই
জটিল আকার ধারণ করছে, তা শুরুতেই ভাবা উচিত ছিল। একটি রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক যেভাবে
কোনো বক্তব্য দিতে পারেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কেউ সেভাবে কোনো বক্তব্য দিতে পারেন
না। রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য আরও সংযত হওয়া জরুরি। সর্বোচ্চ
দায়িত্বশীল পদে থাকাকালীন তাকে দেশের মানুষের চাহিদা, দাবি, ক্ষোভের বিষয়টি আমলে রাখতেই
হয়। এমনটি করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিক্ষোভের উত্তাপ দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিগত এক-দেড় দশকে আওয়ামী লীগ তাদের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিল। অন্যভাবে বলা যায়, তাদের
অর্জনও কম ছিল না। সাংগঠনিক কার্যক্রম, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা একটি ইতিবাচক
অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিল। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তাদের এই ভাবমূর্তি পুরোপুরি
ধ্বংস হয়ে গেছেÑএমন মন্তব্য অমূলক বলে মনে করি না। অন্য কেউ নয়, বরং নিজ হাতে তারা
নিজেদের ভাবমূর্তি ধ্বংস করেছে। তরুণ প্রজন্ম এখন যথেষ্ট রাজনীতি সচেতন। তাই কোনো বক্তব্য
রাখার সময় রাজনৈতিক মহলকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ইন্টারনেটের বদৌলতে এবং সাম্প্রতিক
সময়ে রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখায় তারা আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে। বায়ান্নর
ভাষা আন্দোলনের সময় যোগাযোগের ক্ষেত্র এত সহজ মাধ্যম ছিল না। তখনও মেধাবী ছাত্ররা সংগঠিত
হয়েছে। আর এখন যোগাযোগ যখন অনেক সহজ, নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করায় বিঘ্ন কম, তখন ছাত্রদের
সংগঠিত হওয়াও সহজ। আধুনিকতার সঙ্গে খাপখাইয়ে চলা এই তরুণরাই রাষ্ট্রকে পথ দেখিয়েছে
এবং দেখাবেও। এই তরুণ প্রজন্মের চিন্তাধারাকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। ক্ষমতাসীন
দলের বক্তব্য যেভাবে বিক্ষুব্ধ করেছে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের, তার সমাধান করা
কঠিন। যদিও পরে নানা ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যে দাবানল
ছড়িয়ে পড়েছে তা নেভানো কতটা কঠিন বিদ্যমান বাস্তবতাই এ সাক্ষ্য দিচ্ছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুরু করেছিলেন
এবং তা ছিল অহিংস। এই আন্দোলনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সমাধান
করা কঠিন ছিল না। কিন্তু অদূরদর্শিতার কারণে এই আন্দোলন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের
মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের নিরীহ শিশুরা পক্ষীশাবকের মতো। এই ক্ষুদ্র পাখিদেরও
প্রাণ হারাতে হয়েছে। মৃতের সরকারি একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে যার সঙ্গে বাস্তবিক হিসাব
মিলছে না। পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই কয়েক
দিনে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতি এড়াতেও সরকার সক্ষমতার পরিচয় দিতে
পারেনি। চলমান আন্দোলনে মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিটিভিতে হামলা হয়েছে। পাকিস্তান শাসনামল
তো বটেই, পরবর্তী অনেক আন্দোলন সংগ্রামেও বিটিভি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। রাষ্ট্র সব সময়
এই গণমাধ্যমকে নিরাপত্তাবলয়ে রেখেছে। প্রশ্ন হচ্ছেÑরাষ্ট্রীয় এই সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল? প্রযুক্তির এই যুগে সবকিছুরই প্রমাণ থাকে।
কারা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের শনাক্ত করা কঠিন নয়। বিবৃতি দিয়ে এখন সাধারণ
মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। চারদিকে জননিরাপত্তা যখন চরম সংকটের মুখে পড়েছিল, তখন
রাষ্ট্রীয় সম্পদ অরক্ষিত কীভাবে থাকে, এ প্রশ্নের উত্তরও জানা জরুরি। সড়কে বিজিবি মোতায়েন
করা হয়েছিল। তাদের সড়কে টহলরত রাখার পাশাপাশি মেট্রোরেল বা বিটিভির আশপাশে মোতায়েন
করা যেত। রাষ্ট্র বরাবরই আমাদের জামায়াত-শিবিরের সহিংসতাকারীদের কথা বলছে। এই এক কথা
দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকে তাদের এই ব্যর্থতার জবাবদিহিও
করতে হবে। জামায়াত-শিবিরের পরিচয় তো আমাদের জানাই আছে।
দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন ভিন্নরূপ নিয়েছে। আন্দোলন দমনে যে ধরনের সহিংসতার
আশ্রয় নেওয়া হয়েছে তার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। বিশেষত নিরীহ শিশুরা নিহত হয়েছে।
তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যারা আহত হয়েছে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
শুধু তাই নয়, অন্যায়ভাবে অনেক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের
মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ আগস্ট। আমরা দেখছি, অনেক শিশুকে
গ্রেপ্তার করে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর
উচিত ছিল শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। আমাদের সংবিধান তো বটেই মানবাধিকার চুক্তিতেও
আমরা স্বাক্ষর করেছি। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কাউকে বিনা দোষে আটক করা যাবে না। কাউকে
আটক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আর যদি কারও বিরুদ্ধে
অভিযোগ থাকেই তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উপযুক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
আমরা দেখেছি, কোটা সংস্কার আন্দোলনের ৬ সমন্বয়কারীকে ডিবি অফিসে আটক রাখা হয়। তাদের
নিরাপত্তার অজুহাত দেওয়া হয়। হাইকোর্ট যদি এ বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা না করতেন, তাহলে
অন্যায়ভাবে তাদের আরও অনেক দিন হয়তো আটক রাখা হতো। এখানেও একটি প্রশ্ন রয়েছে। এই ছয়জনেরই
কী নিরাপত্তা প্রয়োজন ছিল? জানামতে সারা দেশে আরও ৬০ জন সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়ক রয়েছেন,
তাদের নিরাপত্তার কী হবেÑএমনটি ভাবা হয়েছিল কি? ছয়জন সমন্বয়কারী তাদের পরিবারের সঙ্গেই
ছিলেন এবং তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। আচমকা কেন এই ছয়জনকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রয়োজন
পড়ল, এর সদুত্তর পাওয়া যায়নি। সমন্বয়করা মুক্তি পাওয়ার পর জানা গেল তারা অনশন করেছেন।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এই অমানবিক আচরণের দায়িত্বও সরকারকে নিতে হবে। আমরা দেখছি, বিদ্যমান
অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীলরা নিজেদের আড়াল করে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা
করছেন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মানবাধিকার ও শিশু অধিকার লঙ্ঘনও করা হয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা
সারা দেশে এক ধরনের বিভাজন তৈরি করেছে।
আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে অনেকদূর এগিয়েছিÑএমন কথা প্রায়ই বলা হয়। অথচ দেশে
টানা কয়েক দিন ইন্টারনেট পরিষেবা ছিল না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি
একেক সময় একেক বক্তব্য দিয়েছেন। একবার বলেছেন দুর্বৃত্তরা ইন্টারনেট অবকাঠামো ধ্বংস
করেছে। আবার পরে বললেন, নিজে থেকেই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে। স্মার্ট বাংলাদেশের অবকাঠামো
গড়ে তুললে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা থাকার কথা। দায়িত্বশীল পক্ষের
এমন বক্তব্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ফ্রিল্যান্সার ও ব্যবসা
খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আরও বিভিন্ন খাতে। এই ক্ষতি পোষাবে কে?
সমস্যার জরুরি সমাধান করতে না পারার জবাব ও সুষ্ঠু উত্তর প্রত্যাশা করি আমরা। মানবাধিকারের
চরম লঙ্ঘন ঘটছে। এমনটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার নয়। পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠতে
শুরু করেছে।
সংঘাত সহিংসতার বলি হলো কত প্রাণ। এভাবে কত মর্মন্তুদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে কতিপয় দায়িত্বশীলের দায়িত্বহীনতার কারণে তা তো ছিল অচিন্তনীয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনগণই সর্বময় ক্ষমতার উৎস, তা কি শাসকদের ভুলে থাকার অবকাশ আছে? জনগণ জেগে উঠলে তাদের দিকে তেড়ে আসা অনুচিত। তাদের কথা শুনতে হবে, যৌক্তিক দাবি মানতে হবে। পরিস্থিতি শান্ত করতে অবিলম্বে দায় স্বীকার করে করণীয় যা কিছু তা সরকারকেই করতে হবে। রাজনীটির পাণ্ডুলিপি যেন আর ভুলে না ভরে।