সংঘাত-সহিংসতা
আব্দুল বায়েস
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩১ এএম
আব্দুল বায়েস
বৈষম্যবিরোধী
তথা কোটা সংস্কার আন্দোলনের ন্যায্যতা নিয়ে এখন আর কারও মনে কোনো প্রশ্ন আছে বলে মনে
হয় না। আপাতদৃষ্টে রাজপথের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা নিম্নমুখী, তবে উবে যাওয়ার
সম্ভাবনা নেই। কারণ আন্দোলনকারীদের একাংশের মতে, তাদের দাবি আংশিক পূরণ হয়েছে। ইন্টারনেট
কোন ‘আক্কেলে’ বন্ধ করা হয়েছিল, তা-ও টানা ১০ দিন, জানা নেই। তবে গুজব যে অন্ধকারে
আরও বেশি ডালপালা গজায়, সে কথা মগজে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ফলে অর্থনীতির
যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে তা কবে এবং কেমনে পূরণ হবে তা এক মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। আশা করি
আমাদের সবার প্রত্যাশা পূরণ সাপেক্ষে অচিরেই স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাব।
তবে পরিস্থিতি আবারও বিস্ফোরিত হতে পারে যদি সংশ্লিষ্ট সব মহলে সংশুদ্ধি না জাগে। আমরা যার পক্ষেই থাকি না কেন, রোগের লক্ষণ সঠিক বুঝে যেন নিরাময়ে ব্রতী হই এখন সেটাই কাম্য। অন্যথায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য, যতটুকুই বা ছিল নিকট অতীতে; ফিরে পাওয়া বেজায় কঠিন হবে। এতে আমার মতো সচ্ছল শ্রেণির মানুষের হয়তো তেমন কোনো কষ্ট হবে না, হয়নি তা কোনোকালে কোনো সংকটে, কিন্তু চরম আর্থিক অবনতি ঘটবে দরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষের। কদিন আগে গোলাগুলিতে যে ২ শতাধিক তাজা প্রাণ ঝরে পড়ল তার একটা বড় অংশ শ্রমিকশ্রেণি, ফুটপাতের দোকানদার কিংবা অন্য কোনো নিম্ন পেশার মানুষ। এদের সব প্রায় হাভাতে, হাঘরে। বস্তুত এরা কোটার পক্ষে-বিপক্ষে ছিল না; নিরেট নিরীহ গোছের, দিন আনে দিন খায়; মাঝেমধ্যে গুলি খেয়ে মরে। অন্যদিকে দুই বছর ধরে শুধু মূল্যস্ফীতির কারণে কয়েক লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে গেছে বলে জানাল বিশ্বব্যাংক। কাজেই আমরা কে কোটা আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে আছি তার চেয়েও বড় কথা স্মরণ করা যে, আমাদের কর্মসূচির অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের বন্ধনীতে থাকা মানুষের ওপর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের খেদোক্তি একটু স্মরণ করি, ‘ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্রপল্লীতে, এইখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’ তেমনি সংকটকালে সচ্ছলদের জন্য ‘রহমত’ এসে ধরা দেয় নানাভাবে, এমনকি সংকট কারও কপাল খুলে দেয় পর্যন্ত, অথচ ওদের বেলায় সংকট মানে স্বয়ং ‘আজরাইল’ এসে হাজির জান কবজের জন্য।
দুই
কারও হাইপথেসিস
এমন যে চলমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনটা একটা আচ্ছাদন বা অসিলামাত্র যা ভেদ করে কিছু দিন
আগের দেশব্যাপী অগ্ন্যুৎপাতের উৎপত্তি ঘটেছিল। বলা হয়, ছাত্রদের একটা বৃহৎ অংশের মধ্যে
বিরাজমান দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বা ক্রোধজনিত চাপা শব্দ এ বিস্ফোরণে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
স্বভাবতই দেশকে ‘স্বাভাবিক অবস্থায়’ ফিরতে হলে সরকারের উচিত হবে তরুণদের মনে জেঁকে
বসা ক্ষোভের কারণগুলো নির্ভুল শনাক্ত করে সমাধানের পথ খোঁজার প্রয়াস পাওয়া। এমন কয়েকটা
নিম্নরূপÑ
ক. ইচ্ছাকৃত বা
অনিচ্ছাকৃত, অতীতের একটা ভুলের জন্য সম্ভবত আন্দোলনকারীরা নীতিনির্ধারণী মহলের ওপর
আস্থা রাখতে পারছে না। অভিযোগটি এমন যে ভুলটা ছিল কোটা সংস্কারের বা বিলুপ্তির পরিপত্র
জারির পর দীর্ঘ ছয় বছর পর আবারও তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা। তার পরও দ্রুত ভুল শোধরানো
সমাধান দিতে পারত কিন্তু তা হয়নি। সরকারি পর্যায়ে অন্ধত্বের এ দায় উপদেষ্টাদের ওপর
কিছুটা হলেও বর্তায়। সুতরাং ক্ষমতাসীনদের কাজ হবে দৈহিক এবং মুখের ভাষা বদল করে আইভরি
টাওয়ার থেকে মাটিতে নেমে বাস্তবতা উপলব্ধি করা।
খ. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে
ছাত্রছাত্রীরা মেধাবী হয়েও হলে সিট পায় না, তারা তথাকথিত গণরুমে থাকতে বাধ্য হয় এমন
অভিযোগ দীর্ঘকালের। রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে হলে হলে সিট বরাদ্দ দেন নেতারা। ‘বড়
ভাই’ , ‘মিয়া ভাই’ এবং ‘দাদাগিরি’ ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন জেরবার করে তুলছে, কেউ এমনকি
মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবার মতো অবস্থায় পতিত হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রশাসন
নির্বিকার। অনেক লেখালেখি, প্রতিবাদ এমনকি প্রতিরোধ করেও অবস্থা যেন থোড় বড়ি খাড়া,
খাড়া বড়ি থোড়। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, এ ব্যবস্থা শুধু এই শাসনামলে ঘটছে বললে সত্যের
অপলাপ হবে; বরং বলা উচিত হবে আনুক্রমিক সরকার আমলের অবস্থা। সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায়,
‘পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয়’। অন্তত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের
তীব্র ক্ষোভ এবং ঘৃণার এও একটা অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে থাকতে পারে বলে সর্বত্র অনুমিত।
তবে অনুগত বেসরকারি
বাহিনীর ওপর ভর করে আন্দোলন দমনের পরিণতি কী হতে পারে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময় আমরা
প্রত্যক্ষ করেছি। কথায় বলে, ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
অতিসাম্প্রতিক ঘটনায় তার পরিচয় আবার মিলল। নেতার নির্দেশে ছাত্রলীগ মাঠে নেমে এখন মাঠছাড়া।
মোট কথা, মেধাবী এবং নিবেদিত ছাত্রছাত্রীর জায়গায় পেশি ও অর্থ শক্তিনির্ভর হাইব্রিড
সদস্যদের ভারে নৌকার নিমজ্জন হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। সুতরাং এ দিকটা সামাল দিয়ে পরিত্রাণের
পথ খোঁজা উচিত।
গ. এর খুব কাছাকাছি
কারণ নির্বাচিত ছাত্র সংসদের অনুপস্থিতি। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের
নির্বাচন একটা ঐতিহ্য এবং অহংকার রয়েছে; এমনকি অনির্বাচিত সরকারের আমলেও। অথচ নির্বাচিত
সরকারগুলোর আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দীর্ঘকাল নির্বাসনে, এটা কোনোমতেই মেনে নেওয়া
যায় না। বলা হচ্ছে যে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা যাবে না কারণ ছাত্ররা দেশের ভবিষ্যৎ
রাজনীতির হাল ধরবে। অথচ তাদের যথাযথ নেতৃত্বগুণ নিয়ে তৈরি হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে
না। এ স্ববিরোধী অবস্থান সুসমাহিত করা না গেলে অন্তত ক্যাম্পাস পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি
উন্নতি সম্ভব নয়।
ঘ. প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ আন্দোলনে জড়িত অধিকাংশ ছাত্র এবং শিক্ষক কোনো না কোনো নিম্ন আয়সম্পন্ন খানা থেকে এসেছেন এবং এসব খানা দুই বছর যাবৎ মূল্যস্ফীতির চাপে বিধ্বস্ত। তাদের পড়ার খরচ চালাতে বাবা-মা হিমশিম খাচ্ছেন অথচ সরকারি ভুল নীতির জন্য এ মাশুল গুনছে পরিবার। তা ছাড়া তাদের সামনে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুব কম। এক সমীক্ষা বলছে, ডিগ্রিধারীদের প্রায় ৪০ ভাগ বেকার। এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য দুঃসংবাদও : শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার, ঋণখেলাপি, দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার, ধনী-গরিব আয় ও সম্পদে তির্যক বৈষম্য। অথচ এগুলো সমাধানে তাদের সামনে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছে না। তরুণরা যেহেতু তাদের দেশকে অত্যন্ত ভালোবাসে তাই এসব অপকর্মের আইনি শাস্তিবিধান না দেখে তারা ভেতরে ফুঁসছিল। কোটা আন্দোলন সে অনুভূতি তীক্ষ্ণ করে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে অভিমত।
তিন
তথাপিও সেই বিস্ফোরণ
নিয়ন্ত্রিত এবং শান্তিপ্রিয় মিটিং-মিছিলের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছিল। হঠাৎ খলনায়ক মঞ্চে
এসে হাজির। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের চাদরে আবৃত সন্ত্রাসীরা মিছিলের স্রোতে গা ভাসিয়ে
ঝোপ বুঝে কোপ মারল। সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য, এমনকি অভিযোগ আছেÑবাই হুক
অর বাই ক্রুক সরকার উৎখাতের জন্য প্রত্যয়ী এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভেবেছিল মানব এবং ভৌত
সম্পদ শেষ করেও যদি সরকারের পতন ঘটানো যায় তবে তা-ই হবে উত্তম কাজ এবং করছে তা-ই। বাংলাদেশের
বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ঢুকে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাল, বিনিময়ে গুলি চলল,
প্রাণ ঝরল ২ শতাধিক। তার সঙ্গে যুক্ত রটানো গুজব। একের পর এক মিথ্যা তথ্যভিত্তিক সরকারবিরোধী
প্রচার সরকারকে দারুণ বেকায়দায় ফেলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের দাবিদার বর্তমান সরকারের
হাতে এ গুজব ফেস করার প্রযুক্তি কিংবা অন্য কোনো পথ নেই ভেবে আমরা বিস্মিত। আওয়ামী
লীগের আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসংশোধনের তাগিদ এসেছে নানা মহল থেকে। মনে হয় এ তাগিদ অমূলক
নয়।
শেষ কথা হলো,
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশ এখন এক মহাদুর্যোগের মুখোমুখি। এ মুহূর্তে
সরকারের উচিত হবে অতিদ্রুত দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ছাত্রছাত্রীদের
সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই এবং গণগ্রেপ্তারের তীব্র
প্রতিবাদ জানাই। বিচারিক কথায় আছে, দোষী ছাড়া পাক কিন্তু নির্দোষ যেন শাস্তি না পায়।
ইতোমধ্যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশ্বস্ত করেছেন প্রয়োজনে
তার সরকার এ তদন্তে জাতিসংঘের সাহায্য নেবে। তার এ আহ্বান প্রশংসার দাবি রাখে। তবে
প্রলম্বিত বিচার যেমন বিচারকে অস্বীকৃতি জানাবার শামিল, তেমন অতিদ্রুত বিচার সঠিক না-ও
হতে পারে। সাধারণত রাজনীতি অর্থনীতির নিয়ামক হয়, এবার না হয় অন্তত কিছু সময়ের জন্য
অর্থনীতি হোক রাজনীতির নিয়ামক। শেষ কথা হচ্ছে সংলাপ।
কনফ্রন্টটেশন
ক্যান বি কাউন্টার-প্রোডাক্টটিভ। চেঞ্জ হ্যাপেনস বাই লিসেনিং অ্যান্ড দ্যান স্টাটিং
অ্যা ডায়লগ উইথ দ্যা পিপল হু আর ডুয়িং সামথিং ইউ ডন্ট বিলিভ ইজ রাইট।
-জেন গুডঅল, ওয়াল্ড-রিনিউড সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড হিউম্যানিট্রিয়ান