জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ
মোহাম্মদ আলী শিকদার
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৪ ১৪:১৬ পিএম
যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতের বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করি। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে তাদের সহিংসতায় এযাবৎ কম ক্ষত সৃষ্টি হয়নি। বিলম্বে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার যে অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছিল তা প্রশংসিত হয়েছে এবং এখনও এ বিচার প্রক্রিয়া চলমান। জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতাই ইতোমধ্যে দণ্ডিত হয়েছেন এবং তাদের অনেকেরই চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকরও হয়েছে। রক্তমূল্যে অর্জিত এ বাংলাদেশে স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও চেতনার পরিপন্থি কোনো কর্মকাণ্ড কখনই প্রত্যাশা করি না। পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ধারা স্বাধীন বাংলাদেশকে ভিন্নপথে চালিত করতে পারে—এ আশঙ্কা থেকেই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিগুলোর আন্দোলন ছাড়াও বেশ কয়েক বছর আগে একবার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব জোরেশোরে উঠেছিল। দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষও জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছে। তারাও চায় না জামায়াতে ইসলামী তাদের সহিংস রাজনীতি পরিচালনা করুক।
ফিরে দেখা যাক পেছনে। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নৃশংস ঘটনা থেকেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ
করার রব ওঠে। ওই সময় জামায়াত-শিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছয়টি আবাসিক হলে একযোগে হামলা চালায়। হামলায় তারা ছাত্রদল, ছাত্রলীগের নেতাসহ সাধারণ ছাত্রদের ওপরও চড়াও হয়। ওই
আক্রমণে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রমৈত্রীর নেতা জুবায়ের চৌধুরী রিমু নিহত হন। রিমু
ছিলেন বিএনপির তৎকালীন সাতক্ষীরা মহিলা বিএনপি সভাপতির ছেলে। তখন জাতীয় সংসদে
মুলতবি প্রস্তাব আসে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। তৎকালীন
ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছিলেন, জামায়াত এ দেশের কলঙ্ক, তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানে না, স্বাধীনতা মানে না। জামায়াতের
রাজনীতি করার অধিকার নেই। তাদের নিষিদ্ধ করা হোক, এ দাবি তো নতুন নয়। কিন্তু
বিএনপি সরকার শেষ পর্যন্ত এ পদক্ষেপ না নিয়ে পিছিয়ে গেল। অনেকে মনে করেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের পরামর্শে বিএনপি তখন পিছিয়ে গিয়েছিল।
বিএনপিকে বোঝানো হয়েছিল, জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে গেলে বিএনপি রাজনীতিসহ
অন্য কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে পেরে উঠবে না। রাজনৈতিক দলের স্বার্থ বিবেচনায়
ওই সময় বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর ফল যে ভালো হয়নি তা বর্তমানে
দেশের অবস্থার দিকে তাকালেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।
আমরা দেখেছি, একটা সময় জামায়াত-বিএনপি একাকার হয়ে গেল। দুটি
দলের মধ্যে শুধু নামেই ফারাক থেকে গেল। এ দুই দলের কাজকর্ম এক ধারায়
বয়ে চলল। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এও বলা
হলো,
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। এ ভ্রাতৃপ্রতিম
সংগঠনের দরুন জামায়াতের দুজন যুদ্ধাপরাধীকে মন্ত্রী বানায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার
যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে, তখন আমরা দেখেছি
জামায়াত-বিএনপি এ বিচার ঠেকাতে জ্বালাও-পোড়াও, ধ্বংসাত্মক
কার্যক্রম করেছে। জামায়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী দণ্ডিত হওয়ার পর দেশের পতাকা পুড়িয়েছে, শহীদ
মিনার ভেঙেছে। তখনও বিএনপি তাদের সমর্থন দিয়েছে।
এক যুগ ধরেই জামায়াতকে
নিষিদ্ধ করার কথা হচ্ছে। তবে অবশেষে নির্বাহী আদেশে এ দলটিকে নিষিদ্ধ করা হলো ১ আগস্ট
২০২৪ তারিখে। বিলম্বে হলেও নির্বাহী বিভাগের এ নির্দেশকে স্বাগত জানাই। সন্ত্রাসবিরোধী
আইনে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সরকার এক প্রতিকূল মুহূর্তে এ সিদ্ধান্ত
নিয়েছে। এ মুহূর্তে দেশে এক ধরনের সংকট চলছে। একদিকে ছাত্র আন্দোলন
অন্যদিকে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থাÑএ দুই সংকটের সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে
জামায়াতে ইসলামীর নিষিদ্ধকরণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলমান
জননিরাপত্তাসংক্রান্ত সংকটগুলোর সমাধান না করে নির্বাহী সিদ্ধান্তে
জামায়াতকে নিষিদ্ধের ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি দেশে যে নাশকতা
দেখেছি,
প্রায় সবাই মনে করেন জামায়াত অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজটি করেছে। কারণ তারা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও উন্নয়ন-অগ্রগতি চায় না। তারা ১৯৭১ সালের পরাজয়ের
প্রতিহিংসাবশতই এসব কাজ করছে। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাসহ পরবর্তী সময়ে
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-দর্শন, আদর্শ, মূল্যবোধ কোনো কিছুই যেন না থাকে সে চেষ্টা করে গেছে। এরই অংশ হিসেবে
জামায়াত-বিএনপি একসঙ্গে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ধ্বংস
করতে গ্রেনেড হামলা করেছিল। কয়েক দিন আগে তারা যা করেছে
তা সরাসরি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলা চলে।
প্রশ্ন হচ্ছেÑএখন জামায়াতকে নিষিদ্ধ
করে কী হবে? মনে রাখতে হবে, জামায়াতের কর্মী সংখ্যার হিসাবে অনেক। তারা
নিষিদ্ধ হওয়ার পর নাশকতা চালাতে পারে, তা অনেকের আশংকা। ধারণা করি, তারা যে বিএনপির সঙ্গে যোগ দেবে এও হয়তো না। এ সংগঠনের অনেকে ইতোমধ্যে
ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও ঢুকে গেছে, এমন অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে জামায়াতের বহু (শুনেছি প্রায় ১৭টি) সংগঠন রয়েছে বিভিন্ন নামে। অর্থাৎ নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তারা
ভিন্ন নামে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তাদের যে আদর্শের জায়গাÑধর্মান্ধ, উগ্রবাদী আদর্শ এই কাজ তারা চালিয়ে যাবে। তাদের যথেষ্ট অর্থনৈতিক
সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর থেকে বহু ব্যবসায়ী ও ব্যাংক তাদের আর্থিক সহায়তা করছেন।
আমরা জানি,
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বহু ব্যাংকের মালিক হয়েছে তারা। সুতরাং এসব জায়গা তো রয়েছেই।
এভাবে হয়তো জামায়াত নামটা শুধু আড়ালে চলে গেল। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির যে চিত্র, তার
কোনো পরিবর্তন হবে না। অথবা এরই মধ্যে যেটা শুনেছি, এ বি
পার্টি নামে একটি দল করেছে জামায়াতেরই কিছু অংশ। সুতরাং অন্য কোনো নামে তারা
রাজনীতি করতে থাকবে।
যেহেতু সম্প্রতি জামায়াত এত বড় আঘাত করেছে, এর ওপর ভিত্তি করেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা অনেকেই
ইতঃপূর্বে বলেছেন। রাষ্ট্রে এখন যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি
ক্ষমতায়,
তাদের সংসদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, এর বলেই তাদের নিষিদ্ধ করা যাবে, এ কথাও আগেই বলা হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বিগত ৫৩ বছরে জামায়াত দল
হিসেবে আরও শক্তিশালী হয়েছে। তাদের দেশবিদেশে শক্তিশালী লবিং রয়েছে। অন্যদিকে এ
মুহূর্তে অর্থনীতিসহ সরকারের অভ্যন্তরীণ যে সংকট রয়েছে তা পুনর্গঠন প্রয়োজন সবার
আগে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করায় প্রকৃতপক্ষে দেশের রাজনীতিতে বড় কোনো রাজনৈতিক
পটপরিবর্তন হবে না। এমনকি ভবিষ্যতেও হবে না, সেটি
প্রায় শতভাগ হলফ করেই বলা যায়। শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী নামে
কোনো রাজনৈতিক দল থাকবে না। দলটি ভিন্ন নামে সংগঠিত হবে।
জামায়াত এখন আরও শক্তিশালী ও জোটবদ্ধ হয়ে সংগঠিত হবে তাতে অনেকেরই
আশংকা রয়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে যেকোনো ইস্যুতে তাদের নাশকতার মাত্রা
আরও বাড়বে এ ধারনাও সর্বাংশে অমূলক নয়। বর্তমানে জামায়াতে
ইসলামী একটি সুসংগঠিত দল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের হিসাব অনুযায়ী ওই সময় তার তাদের
সমর্থন ছিল ১৩ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশের
জনসংখ্যা যদি ১৮ কোটি ধরা হয় তবে জামায়াতের আদর্শে বিশ্বাসী জনসংখ্যা ৭ লাখ ২০
হাজার। তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক আছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিকভাবেও তারা অনেক
শক্তিশালী। এজন্য তাদের নেতাকর্মীদের শক্তভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশে
অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি, হামলা, নাশকতাসহ
আরও বহু ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করায় বিভিন্ন
রাজনৈতিক দলসহ রাজনীতি সচেতন মানুষের প্রতিক্রিয়া কী তা
পর্যবেক্ষণ করাটা জরুরি। তাদের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী কর্মী ছাড়াও রয়েছে
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবল। যারা প্রত্যক্ষভাবে জামায়াতে ইসলামীকেই সমর্থন
করে। জননিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে মনোযোগ তাই বাড়াতে
হবে। এ অপশক্তি যেন নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে
সরকারকে।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য যেকোনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও তৃতীয় একটি পক্ষ সুযোগ খোঁজার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও জামায়াত-শিবির এই সুযোগ ব্যবহার করতে চেয়েছে। সরকারের এ বিষয়গুলো বোঝা উচিত ছিল এবং সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়াও উচিত ছিল। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় তা অনেকটা আতঙ্কে রূপ নিয়েছে যা কাম্য নয়। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করায় সমস্যার সমাধান হবে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাদের অপতৎপরতা বন্ধে কৌশলী হতে হবে। জামায়াত সমর্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে গুরুত্বের সঙ্গে দৃষ্টি দিতে হবে। তাদের লোকজন নানা ক্ষেত্রে মিশে আছে। এসব ব্যাপারে সচেতন হওয়া, সজাগ থাকা বাঞ্ছনীয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সবাইকে দক্ষতা-দূরদর্শীতার প্রমাণ দিতে হবে। কঠিন সময় আসছে আমাদের সামনে, তা মনে রাখতে হবে।