ঋতুর যেমন বদল ঘটছে, তেমন হারিয়ে
যাচ্ছে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যের বৈচিত্র্য। অচাষকৃত কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যভান্ডার গ্রামীণ
জনগণের দুর্দিন ও দুর্যোগের সাথি। বলা হয়Ñঅভাব, দুর্দিন, মঙ্গা, নিদান ও দুর্ভিক্ষের
কাল পাড়ি দেয় গরিব মানুষ পথেঘাটের কচুঘেঁচু খেয়ে। সত্যি হলেও এসব অবহেলিত কচুঘেঁচুই
বাংলাদেশের অভাব ও দুর্যোগ পাড়ি দিতে শক্তি, আহার ও পুষ্টি জোগায়, আয়রনের অভাব পূরণ
করে। অসুখে চিকিৎসায় কাজে লাগে। হাওর-জলাভূমি থেকে শালুক, কুঁই কুড়িয়ে পুড়িয়ে খায় অনেকেই।
প্রাকৃতিক খাদ্যসম্পদ আছে বলেই
জীবনসংগ্রামে ঠিকে আছেন গেন্দুর মা ও জরিনারা। এ বুনোশাক কুড়িয়ে বাজারে, বাসাবাড়িতে
বিক্রি করে জীবন চালাচ্ছেন গেন্দুর মা, জরিনা, শুক্কুরী, আয়শা, আমেনা, আলেহা, মরিয়ম,
চায়না, ময়না, নুরজাহান, বিলাসী, কাজলীসহ ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা অঞ্চলের ২১ জন নারী।
এসব নারী বনজঙ্গল, ডোবা-খানাখন্দ পাড়ি দিয়ে খালবিলের জল, নদী পেরিয়ে বিপৎসংকুল জায়গা
বিচরণ করে কুড়িয়ে আনেন এসব বিষমুক্ত পুষ্টিকর খাদ্যসম্পদ। অধিকাংশ নারী ব্রহ্মপুত্র
নদের আশপাশ বিদ্যাগঞ্জ, মুক্তাগাছা, চরকালীবাড়ী, দাপুনিয়া, বাড়েরা, চরনিলক্ষিয়া, নেত্রকোণার
মৌগাতি, সাকুয়ার অধিবাসী। এসব শাকের মধ্যে রয়েছে কলমি, হেলেঞ্চা, গোলহেলেঞ্চা, আগ্রা,
বেত, গিমাই, কচু শাক এবং কচুর লতি, থানকুনি পাতা, কলার মোচা, দলকচু, সাঞ্চি, কলার মোচা,
ডুমুর, বউটুনি, শাপলা, ঘ্যাটকল, পেপুল তেলাকচু, কাটানটি, ব্রাহ্মী, তিতবেগুন, কাটাকচু,
বনকচু, বন আলু। বনকলার থোড় ও মোচা, কলমি, থানকুনি, বাঁশের কোড়ল, তেলাকুচা, ডেফল, ডেউয়া,
গিমা, ঘৃতকাঞ্চন, কালমেঘ, শতমূলীর মতো বনজ খাদ্য-ফল-ঔষধি গাছ বিক্রি হতে দেখা যায় ময়মনসিংহ
শহরে জরিনাদের কাছে। বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পতিত জমি, বাড়ির আশপাশেই রয়েছে
এসব।
নাইল্যা-গিমা-কলমি নানান জাতের
তিতা শাক খাওয়ার ভেতর দিয়ে বৈশাখ মাসে শুরু করেন মৌসুমি শাক বিক্রি। বর্ষার দিনে হাওরে
মেলে শালুক, পানিফল, ঢ্যাপ, কইর্যালি আর মাতুক। চৈত্রসংক্রান্তিতে তিতা স্বাদের শাক
খাওয়ার নিয়ম। প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যজগতের সম্পর্কটি দিনে দিনে আর ঠিক
থাকছে না। খনা হাজার বছর আগে বচনের মাধ্যমে বলে গিয়েছিলেন ঋতু অনুযায়ী ফল, সবজি, খাদ্য
প্রকৃতিতে জন্ম নেয়। আমরা বেশি লাভ ও লোভের কারণে আমাদের প্রাকৃতিক খাদ্যসম্পদ নষ্ট
করছি। খনার বচনে পাওয়া যায়Ñচৈতে গিমা তিতা,/বৈশাখে নালিতা মিঠা,/জ্যৈষ্ঠে অমৃতফল আষাঢ়ে
খৈ,/শাওনে দৈ।/ভাদরে তালের পিঠা,/আশ্বিনে শসা মিঠা,/কার্তিকে খৈলসার ঝোল,/অঘ্রানে ওল।/পৌষে
কাঞ্ছি,/মাঘে তেল,/ফাল্গুনে পাকা বেল।
নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে
এখনও অনেক বৈচিত্র্যময় বুনোশাক, খাদ্য পাওয়া যায়। যেমন মোরগ শাক, ইছা শাক, তেলাকুচা,
খুইরা কাটা, হেঞ্চি শাক, বতুয়া শাক, দুধলী শাক, ন্যাটাপেটা শাক, কানাই শাক, হেলেঞ্চা,
গিমা শাক, দুরমাপাতা, চিনতন পাতা, পুঁই শাক, কলমি শাক, সেঞ্চি, ঢেঁকি শাক, পিপুল শাক,
শান্তি শাক, নটেশাক, চিরকুটি, ক্যাথাপাটা, থানকুনি, কচু শাক, খুড়েকাটা (কাটানটে), নুনিয়া
শাক, গিন নারিস, খারকোন, নুন খুরিয়া (বুলখুরিয়া), গন্ধভাদালি, শুশনী শাক, তেলাকুচা
শাক, নিলিচি, মুনসি শাক, হরি শাক, থ্যানথ্যানে, খ্যাটখ্যাটি, বনঝুড়ি, হাগড়া, চিনিগুড়ি,
মরিচপাতা, বনপাট, হুটকা, মিষ্টি আলু শাক, কলার থোড়, শাপলা, বনতুলসী, কুমাইরা ডোগা,
সাজনাপাতা, শালুক, কেউরালি, বাঁশের ক্যারল, হিজগাডু।
বর্ষার দিনে হাওরে শালুক, পানিফল,
ঢ্যাপ, কইর্যালি আর মাতুক অচাষকৃত খাদ্যসম্পদ আছে বলেই জীবনসংগ্রামে টিকে আছে হাওর-পাহাড়ের
অনেক প্রান্তিক নারী। জলাভূমি বিলে জন্মায় নানান জাতের শ্যাওলা ও লতাগুল্ম। মানুষের
পাশাপাশি শামুক, ব্যাঙ এগুলো খেয়ে বাঁচে। কেঁচো, পিঁপড়া, মাকড়সা যেমন অনেক প্রাণীর
খাবার আবার তা কাজে লাগায় মানুষও। পিঁপড়ার ডিম দিয়ে বিলের ছোট মাছ ধরে গ্রামের মানুষ।
কেঁচো মাটি উর্বর রাখে। হাঁস-মুরগিসহ গ্রামের পাখিরাও পোকামাকড় খায়। সাপ আবার ব্যাঙ
খায়। সাপকেও কখনও কখনও খেয়ে ফেলে বেজি কি চিল। কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষ শামুক, কাঁকড়া,
কুঁচে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। হাঁস-মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় শামুকের মাংস।
শামুক-ঝিনুকের চুন হয়, যা কাজে লাগে মানুষের।
খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা বা গৃহস্থালি
উপকরণ হিসেবে নয়; কুড়িয়ে পাওয়া উদ্ভিদবৈচিত্র্য ঘিরে রচিত হয় প্রতিদিন আমাদের সংস্কৃতি,
পার্বণ ও সামাজিক বন্ধন। ভাদ্র মাসে ওঁরাও, মুন্ডা, সাঁওতাল আদিবাসীরা আয়োজন করে কারাম
বা করম উৎস। কারাম পূজার দিন উপবাসী কিশোরী ও ছোট ছেলেরা মিলে আশপাশের গ্রামীণ বন থেকে
ধানের পাতা, কাদো ফুল, দুপুর ফুল, সন্ধ্যামালতী ফুল, ঠুরো ফুল (সাদা শাপলা), জবা ফুল,
গোলাচি ফুল, তুলসীপাতা, দূর্বাপাতা, বেলপাতা সংগ্রহ করে আনে। এগুলো দিয়ে ‘ফুলঝাড়ি’
তৈরি করা হয়। পূজার সময় অঞ্জলি নিতে এ ফুলপাতা ব্যবহৃত হয়। গ্রামীণ জনগণ দীর্ঘদিনের
অভিজ্ঞতায় প্রজাতিসমূহ আলাদা করেছে, নাম দিয়েছে। অনেকেই শুশনী বা ব্রাহ্মী শাকের সঙ্গে
আমরুল শাককে গুলিয়ে ফেলেন।
হাওর জলাভূমি থেকে শালুক কুড়িয়ে পুড়িয়ে খায় অনেকেই।
হেমন্তকালে খাল-বিল-হাওর-বাঁওড় জলাভূমি শুকিয়ে গেলে গ্রামীণ জনপদে নামে দেশি মাছ ধরার
ঢল। এখনও দেশি ছোট মাছ হেমন্তকালেই গ্রামীণ জীবনে কিছুটা হলেও জোটায় পারিবারিক খাদ্য
ও পুষ্টি চাহিদা। রাষ্ট্রীয় প্রচারে ‘বেশি করে মলা-ঢেলা মাছ খান, রাতকানা রোগ কমান
ও চোখের জ্যোতি বাড়ান’ বিজ্ঞাপন দিলেও দেশজুড়ে গড়ে ওঠা মৎস্য প্রকল্পসমূহ কোনোভাবেই
দেশি মাছবৈচিত্র্য সংরক্ষণে উদ্যোগী নয়। নতুন প্রজন্ম দেশি ছোট মাছ খেতে পারে না বলেই
তারা দিনে দিনে চোখের সমস্যা, হাড়ের সমস্যা, রিকেটসহ নানান ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে
বলে অনেকে মত দেন।
উদ্ভিদ বৈচিত্র্যগুলো যা মানুষের
খাদ্যদ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার যেগুলো মানুষ খায় না সেগুলো পশুখাদ্য হিসেবেও
স্বীকৃত। শুক্কুরী বেগম বলেন, ‘আগে আছিল গরিবের খাওন, এখন হইছে ধনীর খাওন। ধনী লোহেরা
এহন এই হাগ (শাক) কিইন্যা নেয়।’ জানা যায়, প্রতিজন দিনে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার শাক বিক্রি
করে থাকেন। প্রতি মাসে আয় করেন ৯ হাজার টাকার মতো। কিন্তু দিনদিন বনাঞ্চল কমে যাচ্ছে,
ভরাট হয়ে যাচ্ছে পুকুর-ডোবা-নালা, হাওর, নদী। দিন দিন বাড়ছে বসতি, উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল।
এখন আর আগের মতো বুনোশাক পাওয়া যায় না। তার পরও যে জমিতে যতটুকু শাক পাওয়া যায় তার
অনেকটাই ছাগল, ভেড়া, গরু, মহিষে খেয়ে ফেলে। কারণ প্রাকৃতিক এসব খাদ্যে আছে পুষ্টি,
আমাদের রোগবালাইয়ের সমাধান, পুষ্টির সমাধান ও অর্থনৈতিক মুক্তি। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন
প্রয়োজন।