সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৪৪ এএম
বিশ্বজুড়ে অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয় মুদ্রার
পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব হয় অফশোর ব্যাংকিংয়ে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার যে সংকট
চলছে তা নিরসনের লক্ষ্যে গত মার্চে অফশোর ব্যাংকিং আইন পাস হয়। এই ব্যাংকিং হলো ব্যাংকের
ভেতরে পৃথক ব্যাংকিং সেবা। এটি পরিচালিত হয় ডলার বা অন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রায়। প্রচলিত
ব্যাংকিং কার্যক্রমের চেয়ে এর পরিচালনা আইন ও নীতিমালা ভিন্ন। এতদিন দেশের ব্যাংকগুলোর
অফশোর ব্যাংকিং তহবিলের প্রধান উৎস ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া। কিন্তু এখন
এই কার্যক্রম শুধু এর মধ্যে সীমিত নয়। ৩১ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘আইনি সুরক্ষায়
আস্থা বেড়েছে অফশোর ব্যাংকিং-এ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা অত্যন্ত
আশাব্যঞ্জক। আশা করা যাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেকটাই কাটিয়ে
ওঠা সম্ভব হবে।
কয়েকটি ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে
তাদের এ ব্যাপারে যে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে তাতে আমরা মনে করি, এই ব্যবস্থা যদি সুচারুভাবে
পরিচালনা করা যায় তাহলে এর আরও ইতিবাচক দিক দৃশ্যমান হবে। একটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের
বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য রয়েছে ২৫ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের। যদি একটি ব্যাংকের
পক্ষে এই পরিমাণ ডলার সংগ্রহ করা যায় তাহলে দেশের এতগুলো ব্যাংক সমপরিমাণ কিংবা এর
কমও যদি ডলার সংগ্রহ করে তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্ফীত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা
রয়েছে। আমরা মনে করি, এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো আস্থার সংকট কাটিয়ে ব্যাংকিং
ব্যবস্থার প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা আমলে নিয়ে দেশের ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের
জন্য দুই ধরনের ব্যাংক হিসাব চালু করেছে। প্রথমটি হলো, আন্তর্জাতিক ব্যাংক হিসাব বা
আইবি অ্যাকাউন্ট। প্রবাসীদের দেশে অবস্থানরত যেকোনো স্বজন ব্যাংকে গিয়ে এই হিসাব চালু
করতে পারবেন। অন্যটি হলো, অফশোর ব্যাংকিং ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট। যেকোনো প্রবাসী
বাংলাদেশি বা বিদেশি নাগরিক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গিয়ে এ হিসাব খুলতে পারবেন।
হিসাব খোলার পর যেকোনো মেয়াদে প্রবাসীরা ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রায় আমানত রাখতে পারবেন।
পরবর্তী সময়ে জমাকৃত আমানত মুনাফাসহ প্রত্যাবাসন করা যাবে। পুরো ব্যবস্থাটি আস্থার
ওপর নির্ভরশীল, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যেকোনো দেশের অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
স্তম্ভ ব্যাংক খাত। এমনও বলা হয়, ব্যাংক খাত অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ
স্বাভাবিক থাকলে শরীর যেমন সুস্থ থাকে তেমনি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা-স্বচ্ছতা-গতিশীলতা
একই সঙ্গে পুষ্টতা অর্থনৈতিক রক্ত সঞ্চালনও স্বাভাবিক রাখে। আমরা জানি, দেশের আর্থিক
খাত বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে নানা রকম বিশৃঙ্খলার কারণে ফিরে ফিরে এই খাত নেতিবাচক
অর্থে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে এবং হচ্ছে।
এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে অফশোর ব্যাংকিং আইনি সুরক্ষায় গ্রাহকের আস্থা
বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক সংবাদ। আমাদের অর্থনীতির
রক্তক্ষরণ নানাভাবে ঘটেছে এবং ঘটছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত না হলে গ্রাহকের
আস্থা কোনোভাবেই দৃঢ় করা সম্ভব নয়। প্রবাসীদের কল্যাণের দিকটি দেখার পাশাপাশি আমাদের
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কাটানোর লক্ষ্যে অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যেসব পথ অবলম্বনের
কথা বলা হয়েছে তাতে যাতে গ্রাহক খুব সহজে সেবা নিতে পারেন সেই বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত
করতে হবে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থায় প্রবাসীদের
কাছ থেকে তারা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। আমরা মনে করি, সাড়া পাওয়াই যথেষ্ট নয়, এর লক্ষ্য
অর্জনে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে গ্রাহকের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য ব্যবস্থার পথ সুগম করতে
হবে। আমাদের বিভিন্ন খাতে জবাবদিহির সংস্কৃতির অনুশীলন হয় না। আমরা বিশ্বাস করি, সুনীতি-জবাবদিহির
সংস্কৃতি অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যবস্থা পরিশীলিত করা কঠিন কিছু নয়। প্রভাবমুক্তভাবে আইনি
কাঠামোর মধ্যে ব্যাংকগুলো যাতে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের অর্থনীতির
যেমন সংকট আছে তেমনি সম্ভাবনাও কম নয়। কিন্তু এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন সুচারু
ব্যবস্থাপনা। ব্যবস্থাপনায় গলদ রেখে ভালো কিছু আশা করা দুরাশারই নামান্তর।
ইতঃপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছি, আর্থিক খাতে বিশেষ করে
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি কমাতে হবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং নজর রাখতে হবে
দেশি-বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধের দিকে। সব মিলিয়ে বিষয়টি যে কঠিন চ্যালেঞ্জের, তা অস্বীকার
করা যাবে না। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা একই সঙ্গে পুষ্টতার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার
বিকল্প নেই। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অফশোর ব্যাংকিংয়ে
সম্পদের সুব্যবস্থাপনা, অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ ও আর্থিক পরিষেবা চমৎকারভাবে সম্পন্ন
হওয়ার যে চিত্র উঠে এসেছে এর আলোকে আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রয়োজনে সেসব পথ অবলম্বন
করা যেতে পারে।