জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত
ড. মো. শামসুল আলম
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৪২ এএম
ড. মো. শামসুল আলম
নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও দলটির ছাত্র
সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দলটিকে নিষিদ্ধ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির ঘোষণাও দেওয়া হয়। কোনো
রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের
রাজনৈতিক অনুবিভাগ উপযুক্ত কারণসহ ফাইল মতামতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে
থাকে। আইন মন্ত্রণালয় মতামত দিয়ে ফাইল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে ফাইল
প্রধানমন্ত্রীর কাছেও পাঠিয়ে থাকে। কোনো দল নিষিদ্ধের প্রস্তাবে সব জায়গা থেকে
ইতিবাচক মতামত এলে শেষে জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২৯
জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সভায় জামায়াত-শিবিরকে
নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়।
জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ ও তাদের রাজনৈতিক সহযোগীরা একমত হয়। তারা জানায়, জামায়াতে
ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে তাদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে
এবং এ বিষয়ে তারা সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানায়। প্রশ্ন
হচ্ছে, একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসবে
কি-না। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে ইতোমধ্যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর
নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা কম হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থেই এ ব্যাপারে
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি ক্ষমতাসীনরা, এ রকম অভিযোগও কম নয়। যে কারণেই হোক তাদের
রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার ফল শুভ হয়নি।
আরও বলা দরকার যে, বিগত এক যুগ ধরেই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার পন্থা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। তবে কোন পন্থায় তা করা হবে, এ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এ বিষয়ে অনেক ধারণাই দিয়েছেন। প্রথমদিকে অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন আদালতে মামলা করার। পরে অনেকে বলেছেন, নির্বাহী আদেশে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হোক। এবার নির্বাহী আদেশেই তা সম্পন্ন হচ্ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তাতে জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তখন জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল সংবিধানের ৩৮ ধারার ক্ষমতাবলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর শাসক জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তাতে ফের বৈধভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের মাধ্যমে ৩৮ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনা হয়।
১৪ দলের বৈঠকে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের নিন্দা ও
প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠিয়েছে দলটি। জামায়াতে
ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সেখানে দাবি করেছেন, একটি রাজনৈতিক দল বা
জোট অন্য একটি রাজনৈতিক দলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বাংলাদেশের আইন ও
সংবিধান কাউকে এ এখতিয়ার দেয়নি। তার অভিমত, ‘কোনো দল বা জোট অন্য
কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার ধারা চালু হলে এক দল অন্য দলকে নিষিদ্ধ করতে থাকবে। তখন
রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না।’ বিষয়টি ভাবনার। তবে আমাদের এ-ও
বিবেচনা করে দেখতে হবে, কী কারণে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া
হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সর্বোপরি দেশের মানুষের জন্য চরম ক্ষতিকর হয়ে উঠলে ওই রাজনৈতিক
দলকে নিয়ে ভাবতে হবেই। জামায়াতের ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। আমাদের সামাজিক বলয়ে জামায়াতে
ইসলামীর রাজনীতির প্রতি সমর্থন সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই। স্মরণে আছে, নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পরও ঝটিকা মিছিল বা
জমায়েত হয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ পাচ্ছিল জামায়াত। সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের প্রচার চালানোর সুযোগ ছিল। নিষিদ্ধ ঘোষণা হলে সেসব
কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এমনকি জামায়াতকে কোনোভাবে
সহযোগিতা বা অর্থায়ন করার পথও আইনিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। জামায়াতের কর্মীরা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর মতো গোপন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করতে পারে বলে মনে
করেন কেউ কেউ।
এই প্রেক্ষাপটে এখন জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বিরূপ অভিঘাত কেমন হতে পারে,
তা নিয়েও ভাবা জরুরি। আমাদের রাজনীতিতে আস্থার সংকটের সঙ্গে চলমান একাধিক আন্দোলনে
পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত ও একে অপরের প্রতি আস্থাহীনতায়
ভুগছে। জামায়াতে ইসলামীর সকল কার্যক্রম অনেক আগেই নিষিদ্ধ করা গেলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে
অনেক সহিংসতা এড়ানো সম্ভব ছিল। অথচ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে।
বিলম্বের ফলে জামায়াতের শেকড় এখন অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছে। জামায়াত সব
সময় ধর্মাশ্রয়ী ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতি অনুসরণ
করে থাকে। তাদের এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া
বিএনপিসহ অন্যান্য অনেক দলের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা দেখছি, ক্ষমতাসীন দলের মাঝেও জামায়াতের
অনুপ্রবেশ ঘটছে।
এমনকি প্রশাসনের মাঝেও জামায়াতের অনুপ্রবেশের অভিযোগ
রয়েছে। শুধু তাই নয়, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে
হলে আন্তর্জাতিক অভিঘাতের কথাও মাথায় রাখতে হবে।
এটা অসত্য নয় যে, বিলম্বে হলেও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের ব্যাপারটি দমননীতি নয়,
বরং এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের মৌলনীতিরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড
এবং আদালতের রায় বিবেচনায় তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তা বিলম্বে
হলেও শুভ। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘যখন কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, তখন সেটি সরকারের
নির্বাহী আদেশেই হয়।’ আমি মনে করি, জামায়াতের শক্তির উৎস চিহ্নিত করে প্রতিবিধান নিশ্চিত
করার পাশাপাশি অভিঘাত সামলাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে এগোতে হবে। জামায়াতের রাজনীতির কোনো
বৈধতা ছিল নাÑ এমন বিশ্লেষণ আইনজ্ঞদের তরফে ইতোমধ্যেই মিলেছে।
সম্প্রতি দেশে যে ধরনের নাশকতা হয়েছে, তা আমাদের বেদনাকাতর করেছে। জন্ম দিয়েছে
অনেক প্রশ্নের, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজে দেওয়া সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো পক্ষের
তরফেই সহজ নয়। শিক্ষার্থীরা তাদের মতো আন্দোলন পরিচালনা করেছে। তারা অহিংস আন্দোলনই
শুরু করেছিল। কী করে তা সহিংসতায় বাঁক নিল, তা-ও সচেতন মানুষদের অজানা নয়। এই আন্দোলনকে
তৃতীয় একটি পক্ষ তাদের স্বার্থে পরিচালনার চেষ্টা করেছে। এমনকি অনেকাংশে শিক্ষার্থীদের
জন্য আরও জটিলতা তৈরি করেছে। দেখা দিয়েছে একাধিক অপপ্রচার ও ভয়াবহ কিছু বক্তব্য। রাষ্ট্রের
দায়িত্বশীলদের এমন একাধিক বক্তব্য অধিকাংশ সময়েই সাধারণ মানুষকে দ্বিধায় ফেলে দেয়।
আস্থার সংকট বাড়তে শুরু করে। কোনটি যৌক্তিক এবং কোনটি অযৌক্তিক, তা আর বোঝা যায় না।
জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক তৎপরতা দেশের সম্পদের যেমন ক্ষতি করেছে, তেমনি অনেক মানুষকেও
বিপথে পরিচালিত করতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় তাদের বড় আঘাতের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান
গড়ে তোলাই পর্যাপ্ত নয়, এজন্য প্রয়োজন আইনের প্রতিবিধান। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের
চেতনাকে সর্বাগ্রে ঠাঁই দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখেই এখন পর্যন্ত সব
আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু নাশকতা, সহিংসতার মাধ্যমে যৌক্তিক
অবস্থানকে নড়বড়ে করে দেওয়ার অপপ্রচেষ্টার জন্য দায়ী সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া
জরুরি।
শুধু জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান নয়। কারণ দল নিষিদ্ধ হওয়ার পরও অনেকে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। এর অনেক নজির আমাদের সামনে রয়েছে। যারা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য আইনি প্রতিবিধানও নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সর্বাগ্রে বৈষম্য দূর করতে হবে। সাম্য প্রতিষ্ঠাই হলো মূলকথা। আইনি প্রতিবিধান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। বর্তমানে যেভাবে দোষীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে, সেখানে সামঞ্জস্য আর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এমনটি সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে। আতঙ্ক থেকে বের হতে না পারলে সংকট সমাধান হবে না। চলমান রাজনৈতিক সংকট সামগ্রিকভাবে শুধু দেশ নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আমাদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। এ থেকে বের হওয়ার জন্য এখন রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা জরুরি। একই সময়ে জরুরি রাজনৈতিক সংঘাতে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা। প্রতিটি সমস্যার গুরুত্বসহকারে সমাধান জরুরি। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যেÑ সহিংসতা কারোর জন্যই মঙ্গলজনক নয়।