ঐতিহ্য
তানভির হাসান তপু
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩১ এএম
বাংলার ঐতিহ্যের অনেকটুকুই আজ হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে না বলে বলতে হয় তা যেন
অনেকটা অনাদরে হারিয়ে যেতে বসেছে। ঐতিহ্যের বাঙালি চর্চা অনেকটাই
সরে গেছে। বিভিন্ন উৎসবে এখন আর বাঙালি গানের আসর বা আয়োজন পাওয়া যায় না। বরং দেখা
যায় পশ্চিমা ধাঁচের গান মাইকিং বা সাউন্ডবক্সে গান বাজানো হয়। বাঙালি
ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এত বৈচিত্র্যের সাংস্কৃতিক উৎসব আছে
বলে মনে হয় না। কথায় বলে, ‘বারো মাসে
তের পার্বণ’। সারা বছর নানা রকমের আয়োজনে মাতোয়ারা থাকে বাঙালি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ে, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, শ্রাদ্ধ এবং সবার জন্য উন্মুক্ত বিভিন্ন মেলা উদযাপন ইত্যাদি লেগেই থাকে। বাঙালির ঠুনকো
ভাবনায় ক্রমে গম্ভীর জীবনযাত্রা ঢুকে পড়েছে। চায়ের দোকানে আর সেই আলোচনা নেই। সবাই
সতর্ক। এ-পাড়ার বৌদি ও-পাড়ায় পিসির সঙ্গে কুচকাচালি পরচর্চা অথবা পরনিন্দা সেভাবে
আর প্রাণ খুলে হয় না। কেননা প্রত্যেকের মধ্যে বিদেশি চর্চায় নিজের সংসার এবং শুধু
নিজের গুছিয়ে নেওয়ার ভাবনা ঢুকে পড়েছে। বিয়ের আসরে যে আত্মীয়তার বাঁধনে খুনসুটিগুলো
ছিল তাতেও এসে পড়েছে সতর্কতা। স্বার্থের এত সতর্কতা বাঙালি মানসিকতায় আদৌ ছিল না।
পুরান পাঁচালি লোক আখ্যানের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামে
ও সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, শিক্ষায়, মননশীলতায় যে বাঙালির পরিচয় পাই বর্তমানের বাঙালি
ঐতিহ্যের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফাস্টফুডের সারি সারি দোকান
দেখে মনে পড়ে যায় এখন আর কোনো অনুষ্ঠানে বাঙালির অন্নব্যঞ্জন আর চোখে পড়বে না।
বিভিন্ন বিদেশিয়ানী পদে বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্য আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। বাঙালি
গৃহস্থ আজ নিজেই বাঙালি সংস্কৃতি থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আর কোটটাই-এর দৌলতে বাংলা ভাষা
এমনিতেই অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে।
গ্রামীণ জীবনের উৎসবের স্রতোধারা এভাবেই বিস্মৃতি পাচ্ছে
শহর, নগরসহ চারদিকে। আনন্দ বিলিয়ে দেওয়ার অন্যতম একটি আকর্ষণ মোরগ লড়াই। মোরগের
লড়াই প্রদর্শনের লক্ষ্যে আয়োজকরা গ্রামে গিয়ে খুঁজে বেড়ায় কোন্ গৃহস্থ বা কৃষকের
তেজি মোরগ আছে। মোরগের লড়াই প্রতিযোগিতায় কোন্ মালিকের মোরগ কত তেজি তারও পরখ করা
হয়। সবচেয়ে মজার বিষয়, প্রতিযোগিতা শুরু হলে দর্শকরা দুই মোরগের পক্ষ নিয়ে করতালি
ও মুখে নানা ধরনের শব্দ করে উৎসাহ দেয়। কেউ আবার বাজি ধরে। কুককুরুক
কুউউ ডাক দিয়ে প্রকৃতিতে প্রত্যুষের ঘোষণা দেয় মোরগ। গ্রামীণ জীবনে আজও মোরগের এই
ডাক শুনে ঘুম ভাঙে। সুরের এই ডাক ভোরের নীরবতা ভেঙে দেয়। মোরগ-মুরগি নিয়ে পুরাণে
কতই না কথা আছে। গ্রিক মাইথোলজিসহ অনেক মিথে মোরগকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে।
লাল মোরগ অরুণ রাগ ও সাদা মোরগ উদিত সূর্যের প্রতীক হিসেবে
বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলার ঘরে ঘরে আগে এমন কিছু জিনিস পাওয়া যেত, যেগুলো
এখন নাম শোনা গেলেও দেখা পাওয়া দুষ্কর। অথচ, এই ঐতিহ্যবাহী জিনিসগুলো, হাজার
বছরের বাংলার সংস্কৃতির এক একটি উপাদান। বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। যেগুলো
গ্রামবাংলার গৃহস্থের সচ্ছলতা ও সুখসমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে প্রচলিত ছিল। নকশিকাঁথা
: নকশিকাঁথা বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের অন্যতম ঐতিহ্যমণ্ডিত ও নান্দনিক
নিদর্শন। পুরোনো কাপড়ের কাঁথা সেলাই করে তার ওপর গ্রামবাংলার মহিলারা বিভিন্ন নকশা
তোলেন। একেই বলে নকশিকাঁথা।