সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১১:৪১ এএম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১১:৪১ এএম
২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবছর ১ জানুয়ারি বই উৎসবের মাধ্যমে প্রাথমিক
ও মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হয়। সরকারের এই কর্মসূচি
যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হলেও এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের স্বেচ্ছাচারিতা-দায়িত্বহীনতা
নানা প্রশ্ন দাঁড় করানোর পাশাপাশি প্রায় ধারাবাহিকভাবে অদূরদর্শিতা-অনিয়মের যে নজির
স্থাপন করে চলেছে তা শুধু দুঃখজনকই নয়, নিন্দনীয়ও বটে। জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের নিয়ে
এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড আত্মঘাতের শামিল। ‘আমলারা লিখছেন প্রাথমিকের পাঠ্যবই’
শিরোনামে ২৯ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনের গর্ভে যে তথ্য উঠে এসেছে
তা যেমন আমাদের বিস্মিত করে তেমনি ক্ষুব্ধও। প্রাথমিকের পাঠ্যবই নিয়ে ইতঃপূর্বে শুধু
ভুলভ্রান্তির বার্তাই উঠে আসেনি বিভ্রান্তিকর তথ্য সংযুক্তকরণের নজিরও অনেক রয়েছে।
জনগুরুত্বপূর্ণ এত বড় একটি বিষয় নিয়ে এমন খামখেয়ালিপনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিকের পাঠ্যবই রচনায়
মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা যুক্ত রয়েছেন, অর্থাৎ
পাঠ্যবই রচনা করছেন তারাই। অথচ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)
আইন মতে আমলাদের পাঠ্যপুস্তক লেখার কোনো অবকাশই নেই। জানা গেছে, শুধু লেখকই নন; কোন
প্রকাশনীকে বই প্রকাশের কাজ দিতে হবেÑ তাও নির্ধারিত হচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের
নির্দেশে। এর ফলে এনসিটিবির স্বাধীনভাবে কাজ করার সত্তায় যেমন অভিঘাত লেগেছে, তেমনি
মানসম্পন্ন বইপ্রাপ্তির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। আমরা জানি, আমলাদের কাজ সরকারের
নীতি বাস্তবায়ন করা; পাঠ্যবই রচনা নয়। আমাদের বোধগম্য নয়, শিক্ষা কার্যক্রমে অহেতুক
তাদের সম্পৃক্ত করে এবং হস্তক্ষেপের সুযোগ দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন উপসর্গ সৃষ্টি
করা হচ্ছে কেন? আমরা জানি, দেশের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক
প্রণয়ন, উন্নয়ন, নবায়ন, নিরীক্ষণ ও সংস্কারসহ পাঠ্যপুস্তকের মুদ্রণ-প্রকাশনা-বিতরণ
ও বিপণনসহ আনুষঙ্গিক সব কাজের দায়িত্বই এনসিটিবির। পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করার জন্য শিক্ষাবিদ,
বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক, শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কমিটি গঠনের
নিয়মনীতি রয়েছে। তাদের মধ্য থেকে প্রতিটি শ্রেণি একেকটি বিষয়ে বই লেখার জন্য একাধিক
বিশেষজ্ঞ লেখককে নিয়ে একটি প্যানেল তৈরি করার দায়িত্বও এনসিটিবিরই। কিন্তু আগামী শিক্ষাবর্ষের
জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত আমলা কিংবা কর্মকর্তারা
তাতে কী করে যুক্ত হয়েছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, লেখকদের
মধ্যে অনেকেই রয়েছেন, যিনি একাধিক বইয়ের রচয়িতাও বটে। শিক্ষাবিদ ও এনসিটিবির কর্মকর্তারা
তাতে ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে। যারা শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন কিংবা এ ব্যাপারে
দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাহীন তাদের সম্পৃক্তকরণের বিষয়টির দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এড়াতে
পারে না। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, এনসিটিবির প্রতিষ্ঠা এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে, সংশ্লিষ্ট
মন্ত্রণালয়ই নির্দেশক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা সংগত কারণেই এর প্রতিবাদ জানাই। একই সঙ্গে জনগুরুত্বপূর্ণ এত
বড় একটি বিষয় নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার যথাযথ প্রতিবিধান প্রত্যাশা করি। নতুন শিক্ষাক্রম
ভালো কি মন্দÑ এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ইতোমধ্যে কম হয়নি। কিন্তু এই আলোচনা-সমালোচনায়
গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু বাদও রয়ে গেছে। নতুন শিক্ষাক্রমকে বলা হচ্ছে, ‘অভিজ্ঞতামূলক
শিখন পদ্ধতি’। নতুন শিক্ষাক্রমের নির্ধারিত এই পদ্ধতি প্রথম শ্রেণি থেকে কার্যকর হওয়ার
কথা বলা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী দশম শ্রেণি পর্যন্ত তা বিস্তৃত। কিন্তু প্রাথমিকের যে
পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে বা হচ্ছে তা পুরোনো শিক্ষাক্রম অনুযায়ীÑ এই বার্তাও সংবাদমাধ্যমেরই।
প্রাথমিকের পুরোনো শিক্ষাক্রম বজায় রেখে নতুন শিক্ষাক্রম অনুসারে ‘অভিজ্ঞতামূলক শিখন
পদ্ধতি’র ইতিবাচক ফল মেলা তো দূরের কথা; উপরন্তু এ বিষয়টি তালগোল পাকিয়ে একটি লক্ষ্যহীন
ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নির্ভুল ও সুপ্রণীত পাঠ্যবই প্রণয়নের দাবি অতীতের বিভিন্ন
প্রেক্ষাপটে বারবার জোরালোভাবে উঠে এলেও এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর পরও খামখেয়ালিপনা
ও স্বেচ্ছাচারিতার বৃত্তবন্দি হয়ে আছে!
বছরের শুরুতেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের হাতে
বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দ ও একটি সাফল্যজনক বিষয়। কিন্তু
মানহীন কিংবা ভুলে ভরা বইয়ের কারণে যদি আনন্দ মাটি হয়, তাহলে নিশ্চয়ই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা
জেঁকে না বসে পারে না। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অতীতে পাঠ্যবইয়ে ভুলভ্রান্তি ও তথ্য বিকৃতির
ব্যাপারে নাগরিক সমাজে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা-বিতর্ক শুরুর পরই কেবল সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর হুঁশ ফেরে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এইÑ হুঁশের পরও সংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীলরা আবার বেহুঁশ হয়ে পড়েছেন।
ভুলের পর ভুল, বিকৃতির পর বিকৃতি এবং ভুল সংশোধনীর উচ্চারণসর্বস্ব
অঙ্গীকার এসবই প্রজন্মের সামনে তামাশা বৈ কিছু নয়। প্রায় প্রতিবছরই পাঠ্যবইয়ে ভুল থাকবে,
সেগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে যাওয়ার পর অসংগতি ধরা পড়বে আর সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল
মহল ‘সংশোধনী দিয়ে’ সমস্যার শেষ হয়ে গেছে মনে করবে, বছর বছর এমনটি চলতে পারে না। এনসিটিবির
ক্ষমতা খর্ব করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ই যদি নিয়মনীতি ভেঙে অযাচিত কাজ করতে থাকে, তাহলে
এনসিটিবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও সংগত কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পাঠ্যবই কেন নির্ভুল
ও সুপ্রণীত হচ্ছে না এর সহজ উত্তর মেলে প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনেই।
আমরা মনে করি, এর আশু নিরসন হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির
মুখোমুখি করা জরুরি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় যদি লেখক প্যানেল তৈরি হয় আর সেই প্যানেলে
আমলা এবং কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত হন, তাহলে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা গবেষকদের সংযুক্তকরণের
বিষয়টি জিইয়ে রেখেইবা কী লাভ?
দুঃখজনক বিষয় হলো, পাঠ্যবই নিয়ে নাগরিক সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
এত আলোচনা-সমালোচনার পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সব পক্ষই এখনও চলছে নিয়মনীতিহীনতার
পথে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। যার কাজ যা, তারই সেই কাজ করা উচিত। প্রশ্নবিদ্ধ
শিক্ষাব্যবস্থা তো বটেই, নতুন শিক্ষা কার্যক্রমও প্রশ্নমুক্ত না করে উপরন্তু আরও নতুন
প্রশ্নের জন্ম দিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে কুনজির স্থাপন করেছে এর প্রতিবিধান
অবশ্যই হওয়া জরুরি। যেখানে প্রতিটি শ্রেণির বিষয়ভিত্তিক পাঠ্যবই রচনায় যোগ্যতা নির্ধারণ
করে দেওয়া হয়েছে এবং সেই যোগ্যতার সঙ্গে একই শ্রেণির অন্য বিষয়ের যোগ্যতাগুলোর মিল
বা সাদৃশ্য লক্ষ্য করে তা সমন্বিত করা হয়েছে, সেখানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের
এই তুঘলকির হেতু কী?