অর্থনীতি
আবু আহমেদ
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১১:৩৯ এএম
আবু আহমেদ
আমাদের অর্থনীতির
অবস্থা ভালো নয়। অনেক দিন ধরেই অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকের পারদ নিম্নগামী। অর্থনীতির
সামনে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তা আরও প্রকট হয়ে
ওঠার আশঙ্কাই বেশি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি,
শেয়ারবাজার সংকট, আর্থিক হিসাব ও চলতি হিসাব প্রভৃতি গত কয়েক বছর ধরেই নিম্নমুখী হওয়ায়
দেশের অর্থনীতির গতি বেশ শ্লথ। গত জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর নতুন
সরকার গঠিত হওয়ার পর তারা অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বেশ কিছু নতুন উদ্যোগের
কথা শোনালেও এর কোনোটিই আশান্বিত হওয়ার মতো কারণ ছিল বলে অনেক বিশ্লেষকই মনে করেননি।
সম্প্রতি কোটা
সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাতে অর্থনীতির ওপর আরও বেশি
চাপ পড়ে। ওই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী ঘটনাবলি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু
নেই বটে কিন্তু এর ফলে অর্থনীতি যে আরও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এ নিয়ে কোনো
সন্দেহ নেই। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এখন পর্যন্ত যেসব অস্থিতিশীল ঘটনা ঘটেছে সেগুলো
এ অবস্থাকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করেছে। কোটা আন্দোলনের কারণে অস্থির অবস্থার প্রেক্ষাপটে
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলো। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদেশি
বিনিয়োগকারীরা তো বটেই, দেশের বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে বিনিয়োগ করায় কতটা এগিয়ে আসবেন
এ নিয়েও সন্দেহ আছে। উপরন্তু যেসব বিনিয়োগ এরই মধ্যে আছে এরও কিছু কিছু চলে যেতে পারে
কিংবা বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ সরিয়ে নিতে পারেন।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন
ধরে মানুষকে পিষ্ট করছে। সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ এর ফলে কঠিন পরিস্থিতিতে
পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মূল্যনীতি ঘোষণা করছে দীর্ঘদিন ধরেই। আগে আমাদের
সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি ছিল। কিন্তু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যেই
ঘোষণা করা শুরু হয়। কিন্তু এর কোনো সুফল মেলেনি। মূল্যস্ফীতি হ্রাস তো পায়ইনি, উপরন্তু
বেড়ে চলেছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দাঁড়ায়Ñবাংলাদেশের অর্থনীতিতে শুধু মুদ্রানীতি
দিয়ে কি মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি থামানো সম্ভব? আমাদের স্মরণে আছে, অতীতে দেশের অর্থনীতিতে
মুদ্রাবিস্তার হার কিংবা মনিটারি এক্সপানশন নির্ধারণের মধ্য দিয়ে মূল্যস্ফীতি থামানোর
চেষ্টা হয়েছিল। তা-ও সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ডলারের বিপরীতে অনেক দিন ধরেই ভাসমান মুদ্রা
বিনিময় হার অনুসরণ করে আসছে। মুদ্রানীতিতে এমন কথাও বলা হয়েছে, যেসব মুদ্রা ব্যবহার
করে আমাদের দেনাপাওনা মেটানো হয় সেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা ওঠানামা করছে তা দেখা
হবে। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন হার পর্যবেক্ষণের কথাই বলা হয়েছিল।
আমাদের বৈদেশিক
মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে ইতোমধ্যে দফায় দফায় জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেখা গেছে। বিদ্যমান
পরিস্থিতিতে বলা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে
না। আপাতদৃষ্টে রিজার্ভ বাড়ার উপায় হলো যদি বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যায় এবং কোনো রাষ্ট্র
অনুদান দিয়ে সহায়তা করে। পাশাপাশি বড় আকারের বৈদেশিক বিনিয়োগ হলেও এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা
দেখা দেবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার আরেকটি উপায় হলো রপ্তানি বৃদ্ধি। আমাদের
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আরেকটি বড় উৎস হলো প্রবাসী আয়। এ খাতটি মোটামুটি স্থিতিশীল
রয়েছে বটে তবে প্রবৃদ্ধি ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে
দেনার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এ বিষয়টি নিশ্চয়ই স্বস্তির নয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত
প্রতিবেদনে জানা যায়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি ঠিকাদারদের পাওনা এখনও পরিশোধ
করা সম্ভব হয়নি। বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর কাছেও আমাদের ঋণ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ১০০
বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ রয়েছে, যেগুলোর কিস্তি অচিরেই দেওয়া শুরু হবে। যদি সময়মতো
কিস্তি পরিশোধ করা না যায় তাহলে পরে তা সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। উল্লেখ্য, এ পরিস্থিতি
আমাদের যে বৈদশিক মুদ্রার জোগান তা দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী
এ অবস্থায় আমাদের টাকার মান বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে আরও কমতে পারে।
ডলার সংকট নতুন
কিছু নয়, তা-ও দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা যদি অতিদ্রুত নিরসন না হয়
তাহলে অর্থনীতির চিত্র আরও বেশি বিবর্ণ হবে। প্রতিদিন আমরা কত ডলার হারাচ্ছি এর ভালো
হিসাব দিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে নিঃসন্দেহে এটুকু বলা যায়, এরই মধ্যে আমরা অনেক
ডলার হারিয়েছি এবং হারাচ্ছি। কোটা আন্দোলনের কারণে দেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যে
যে ক্ষতি হয়েছে এর চাপও অর্থনীতিতে পড়েছে। সীমিত আকারে ইন্টারনেট চালু হয়েছে বটে কিন্তু
এর গতি অত্যন্ত মন্থর। বর্তমান জমানায় ইন্টারনেটের গুরুত্ব এড়িয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র
অবকাশ নেই। ব্যবসায় কার্যক্রম থেকে শুরু করে সব কিছুই ইন্টারনেট-নির্ভর। গত কয়েক দিন
দেশে ইন্টারনেট না থাকায় বিশ্ব যোগাযোগব্যবস্থায় আমরা অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি এবং
রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর অভিঘাত লেগেছে ব্যাপক। সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি, আমাদের
তৈরি পোশাক ক্রেতাদের অনেকেই অর্ডার বাতিল করেছেন এবং বিকল্প উৎস থেকে তারা পণ্য আমদানির
চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ইন্টারনেট না থাকায় দেশে যারা ফ্রিল্যান্সিং কাজের সঙ্গে জড়িত
তাদের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। ২৫ এপ্রিল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
হাজার হাজার তরুণ-তরুণী যারা আউটসোর্সিংয়ে যুক্ত তারা ইতোমধ্যে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার এ মাধ্যমে আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে
দেশ গত এক সপ্তাহে। এর আরও বিরূপ অভিঘাত অর্থনীতিতে যে আরও পড়বে এও বলার অপেক্ষ রাখে
না।
যেকোনো দেশের
অর্থনীতির ক্রিয়াশীলতার দুটি দিক থাকে। একটি হচ্ছে ইনভেস্টমেন্ট অর্থাৎ বিনিয়োগ, অন্যটি
হচ্ছে কনজাম্পশন অর্থাৎ ভোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে এটা
আমরা জানি, এ অবস্থায় আমাদের বিনিয়োগই শুধু কমছে না, ভোগও ক্রমাগত নিম্নগামী হচ্ছে।
এর ফলে যে আমাদের রাজস্ব আহরণও কম হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকার চলতি অর্থবছরে রাজস্ব
আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে সে লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরের পক্ষে ছোঁয়া কঠিন। এর
ফলে রাজস্ব বাস্তবায়ন অসম্ভব। ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে আরও বড় ঋণ
নিতে হবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। বিনিয়োগের যে খরা চলছে তা নিরসনের কোনো সম্ভাবনা
দেখছি না। দেশে বলতে গেলে বিনিয়োগে ভাটার টান ব্যাপক।
গত দেড় দশকে বেসরকারি
খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এত দেখা যায়নি। এ রকম ঋণ প্রবৃদ্ধি দিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
কীভাবে সম্ভব তা বোধগম্য নয়। রাজস্ব আদায় অনেকটাই বিনিয়োগ ও ভোগের সঙ্গে জড়িত। সরকারের
ঘাটতি বাজেটের আকার বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আরও বাড়বে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির যে চিত্র
দাঁড়াবে তাতে বৈদেশিক বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ পাওয়া সহজ হবে না। বিশ্বব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন
ব্যাংকের মতো যারা আমাদের ঋণসহায়তা দিয়ে থাকে সে ক্ষেত্রেও খরা দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি
চীন থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ পাওয়ার যে সম্ভাবনা জেগেছে দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তা-ও
শেষ পর্যন্ত কতটা মেলে বলা মুশকিল। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা, বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ বাড়ানো অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানি না বাড়ালে তো বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ বাড়বে না। বাজারে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিলে মূল্যস্ফীতি আরও
বাড়বে। এ প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসের হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানুষের
আয় বাড়েনি অথচ একটানা চলছে মূল্যস্ফীতি। আয়বৈষম্য যে প্রকট হয়ে উঠেছে এ নিয়ে গবেষণার
প্রয়োজন নেই। আয়বৈষম্যের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও নিম্নবিত্তের পর্যায়ে চলে যাওয়ার
আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে সৃষ্ট উত্তপ্ত পরিস্থিতি যুক্তিযুক্ত সংলাপের মাধ্যমে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা হবেÑএমন প্রত্যাশা করলেও বাস্তবে তা হয়নি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি উত্তপ্ত থাকে, সমাজে যদি জিইয়ে থাকে অস্থিতিশীলতা তাহলে অর্থনীতির স্বাস্থ্যবান হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। সামাজিক সংহতির দেশ হিসেবে আমাদের পরিচিত হতে হবে। আমাদের যে অর্জনটুকু ঘটেছিল তা নানা কারণে এখন অনেকটাই ম্লান। মনে রাখতে হবে, সহিংসতার দেশ হিসেবে যদি আমাদের চিহ্নিত করা হয়, তাহলে বহির্বিশ্বে আগামীতে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। সামগ্রিকভাবে যে দুর্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা চলেছি এর নিরসন করতে হবে দ্রুত। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে, আমরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছি তাতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠতে পারে।