× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

আমরা এই বাংলাদেশ চাইনি

ড. ফরিদুল আলম

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৪ ০৯:৫৫ এএম

ড. ফরিদুল আলম

ড. ফরিদুল আলম

প্রতিদিনই একটু একটু করে ধ্বংসের ক্ষতগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে ছাত্র-জনতার মৃত্যু আসলে এ সবকিছুকে হত্যাকাণ্ড বলাই অধিক সমীচীন মনে করি, অন্যদিকে ধ্বংসলীলার ছবিগুলো আমাদের মনের চিন্তাগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। গুছিয়ে ভাবতে পারছি না কিছুই। এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা এবং অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দিন কাটছে। যে ছাত্ররা গুলিতে মারা গেলেন, তারা সংখ্যায় যা-ই হোক না কেন, এদের প্রত্যেকের মধ্যেই ছিল স্বতন্ত্র স্বপ্ন। সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা নিজেকে ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে যে স্বপ্নগুলো ডানা মেলে আকাশে উড়তে পারত। হয়তো তাদের এ স্বতন্ত্র স্বপ্নের নির্যাসগুলোই আজকের এ বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে এক অন্যরকম সমীহজাগানিয়া বাংলাদেশে পরিণত করতে পারত। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে শোষণমুক্ত এবং আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার পথে আমরা অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছি, এর কৃতিত্বও তো আমাদের এ স্বপ্নবাজ তারুণ্যের, এটাকে অস্বীকার করি কীভাবে! ছাত্রদের বাইরে যারা জীবন হারিয়েছেন, তারাও কি কেবল জীবন থেকে ঝরে গেলেন? এক একটি পরিবার এবং পরিবারগুলোয় তাদের নিয়ে চাওয়াপাওয়ার যে বিস্তর হিসাবনিকাশ, সেগুলো মেটাবে কে বা কারা? স্বাধীনতার ৫৩তম বছরে দাঁড়িয়েও আজ আন্দোলন, বিক্ষোভ, রক্তপাত এবং এসব অতিক্রম করে সারি সারি লাশের সামনে যখন নিজেকে দাঁড় করাই, অসহায় মন থেকেই প্রশ্ন আসেÑআমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছে। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার দীনতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। দেখিয়েছে ষড়যন্ত্রকারীদের রক্তপিপাসাকে, যা তাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে ঢোকার আরাধ্য সবকিছু সামনে নিয়ে এসেছে। সব সময় সমাজ এবং রাষ্ট্রের পরিবর্তনে যেখানে ছাত্ররাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, সেখানে একটি মীমাংসিত রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর থেকে কারা লাশ নিয়ে এখনও রাজনীতি করছে, এ রাজনীতি আদৌ আমাদের সমাজের জন্য কাঙ্ক্ষিত কি না সে চিন্তা এখন আমাদের বিবেকে কড়া নাড়ছে। একজন আবু সাঈদ, যিনি তার পরিবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া একমাত্র সদস্য, সেই পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে গেল! এ দেশ, এ সমাজ কদিনই বা এ আবু সাঈকে মনে রাখবে! একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না আর নিষ্ফল আর্তনাদ একসময় বাতাসে মিলিয়ে যাবে। তার পরও রক্তের পিপাসা রয়ে যাবে। এভাবে আর কত দিন?

স্বাধীনতার পর থেকে ৫৩ বছর সময় ধরে আজকের বাংলাদেশ নিয়ে কিছুদিন আগেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছিলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকে তাকালে নিজেরা লজ্জা পান। আজ নিশ্চয়ই তার মন খুশিতে ভরে উঠছে। বিশ্বের গণমাধ্যমসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যে বাংলাদেশ কিছু দিন আগেও উন্নয়নের রোল মডেলের স্বীকৃতি পেয়েছিল, আজ তারাই সমালোচনায় সোচ্চার। একের পর এক বিদেশি বিনিয়োগ, সেসব ঘিরে ব্যাপক কর্মসংস্থান, বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ঘিরে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা-পাল্টা প্রতিযোগিতাÑএ সবকিছু ছাপিয়ে আজ এক রক্তাক্ত অধ্যায় আর ধ্বংসলীলা! এত বছর ধরে এ অর্জনের সহসা বিসর্জনÑএ ক্ষতগুলো পাশ কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে কত বছর লাগতে পারে তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি এখনও। তবে আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি হচ্ছে, একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত ১০ বছর লাগবে। তবে এও স্মরণে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে যে মন্দাবস্থা চলছে, এর রেশ থেকে আমরাও মুক্ত নই। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির যে করাল থাবা, এও উন্নয়নের পথে এক বড় অন্তরায়।

ছাত্রদের কোটা আন্দোলন ঘিরে যে সহিংসতার সূত্রপাত, এর দায় কোনোভাবেই আন্দোলনকারীদের নয়। সরকারের পক্ষ থেকে যেমন বলা হয়েছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো এর সুযোগ নিয়েছে, সরকারের দিক থেকেও এর দায় কম নয়। সরকারের কাছে যদি এ ধরনের সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির কোনো পূর্ব তথ্য না থেকে থাকে, তাহলে বলতে হবে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের দায় এড়াতে পারবে না। আর যদি থেকে থাকে তাহলে শুরু থেকেই তাদের সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ আলোচনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সার্বিক বিষয়টি সমাধান করে পরে উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। যে ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়ে গেল, এগুলো কেবল সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশ নয়, জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত আকাঙ্ক্ষা এবং ত্যাগেরও ফসল। বাংলাদেশের মতো দেশে রাজধানীর ব্যস্ত সড়কের ওপর দিয়ে উড়ে যাবে মেট্রোরেল, এটা একসময় কল্পনার অতীত ছিল। মিরপুর ১০ এবং কাজীপাড়া স্টেশনে যে লুটপাট ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা যেমন ব্যয়সাপেক্ষ, তেমন সময়সাপেক্ষও। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ভেতর ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি সাধন, আর্কাইভের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পুড়িয়ে দেওয়া এবং কন্ট্রোলরুম দখলে নেওয়ার মতো অপচেষ্টা ভয়ানক কিছুর ইঙ্গিত করে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় আগুন, সড়ক ভবন, বিআরটিএ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন, পিবিআই ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুন এবং শত শত যানবাহন পোড়ানোর মতো কাজে কখনও বিক্ষুব্ধ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ত থাকার কথা নয়। একটি জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সুতরাং দেশের মানুষের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। দেশে এবং বিদেশে ঘাপটি মেরে থাকা ক্ষমতা ও রক্ত পিপাসু কিছু মানুষের অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থের খানিক বিনিয়োগে একটি গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র দখলে নেওয়ার অপপ্রয়াস ছিল এটি।

কোটা আন্দোলনকারীরা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, তারা কেবল সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ন্যায্য অধিকারের জন্য আন্দোলন করেছেন, দেশব্যাপী চলা নাশকতার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরাও দৃঢ়ভাবে এটাই বিশ্বাস করি। এর পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, যা সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক নিজেই স্বীকার করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায়ও কোথায় যেন হতাশার সুর! এ সবকিছু থেকে আমরা সাধারণ মানুষ এখনও আশান্বিত হতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রী ২৬ জুলাই ক্ষতিগ্রস্ত বিটিভি ভবন পরিদর্শন করেছেন। এদিন তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় দেশের অবস্থা নিয়ে বিদেশিদের বিভ্রান্ত করে বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। বিষয়টির অবতারণা ঘটেছে সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কিছু বাংলাদেশির বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে, যার জেরে তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ৫৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়, সেখানে বাংলাদেশিদের ভিসা নবায়ন করা হচ্ছে না এবং এটাও বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, সে দেশের শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগেও ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত কোনো কারণ ছাড়াই সে দেশ থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ ছিল। উল্লেখ্য, সৌদি আরবের পর আরব আমিরাত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার, যেখানে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ শ্রমিক বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছে এবং নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যাচ্ছিল।

সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনায় রাষ্ট্রীয় যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমরা যদি বহির্বিশ্বের অভিজ্ঞতার আলোকে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে জানব রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠান এবং স্থাপনা কেপিআই নীতিমালা দ্বারা সুরক্ষিত। কারণ যখনই কোনো অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তখনই এগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বাংলাদেশেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে প্রণীত কেপিআই নীতিমালা ২০১৩ সালে হালনাগাদ করে বাংলায় প্রণয়ন করা হয়। এ নীতিমালায় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা থাকলেও কোন কোন স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠান এর অন্তর্ভুক্ত তা পরিষ্কার নয়। যদি তাই হতো তাহলে বিটিভি কিংবা মেট্রোরেলের মতো স্থাপনায় এসব হামলা ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হতো। এগুলো ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হিসেবে নেওয়া দরকার।

একটা ব্যাপক সহিংস পরিস্থিতি-পরবর্তী এক ধরনের মানসিক যাতনা নিয়ে আমরা সময় পার করলেও সার্বিক অর্থে এর থেকে মুক্ত হতে পেরেছি কি না তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিভিন্ন স্তর থেকে সরকারের কাছে হতাহতদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশের দাবির পর সরকারদলীয় সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে ২ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের পক্ষ থেকে কারফিউ প্রত্যাহার, তাদের ওপর থেকে মামলা প্রত্যাহার, হতাহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবিলম্বে খুলে দেওয়া এবং ইন্টারনেট সুবিধা পুনঃচালুসহ আট দফা দাবি পেশ করা হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের অবস্থানের সঙ্গে তাদের পেশকৃত দাবিগুলোর সবকটি সহসাই পূরণ হওয়ার নয়। তবে এর মধ্য দিয়ে নিশ্চয়ই আরেকটি সংঘাত কারও কাম্য হতে পারে না। যেকোনো অবস্থায় আলোচনাই একমাত্র সমাধান হওয়া উচিত এবং সরকারের দিক থেকে সে দরজা কখনও বন্ধ থাকা উচিত নয়।

  • কূটনীতি-রাজনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা