পর্যবেক্ষণ
আব্দুল বায়েস
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৪ ১০:২৯ এএম
অনেকটা যেন সিনেমার কাহিনী। মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির নিরিখে এমনতর অনুভূতি অনেকের। একটা দেশলাইয়ের কাঠির আগুন থেকে যেমন দাবানল এবং দাবানল থেকে বন উজাড় হওয়ার চিত্র দেখি সিনেমায়, তেমনি ছিল বাংলাদেশ জুলাই মাসের দ্বিতীয় পাক্ষিকে। শুরুটা ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে, যে কোটায় প্রতি পাঁচটি চাকরির মধ্যে চারটির উৎস ছিল বিভিন্ন কোটা। হ্যাঁ, অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হয়তো কিন্তু সত্তরের দশকের বাস্তবতায় ওটাই ছিল সুচিন্তিত এবং সুবিবেচিত নীতি।
কিন্তু এখন ওই পদ্ধতি অনেকটা অকেজোÑ বিশেষত, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সামনে রেখে। ২০১৮ সালে এসে একটা কোটাবিরোধী আন্দোলন তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয় এবং সরকার সুবিবেচনার পরিচয় দিয়ে কোটাব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘোষণা করে একটা পরিপত্রও তখন জারি করেছিল। পরবর্তীতে হাইকোর্ট কোটাব্যবস্থা আগের জায়গায় রেখে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করলে ২০২৪ সালে পুনরায় আন্দোলন মাঠে গড়ায়। তাৎক্ষণিক ইতিবাচক সরকারি পদক্ষেপের অভাবে খুব দ্রুত পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়। একসময় পরিস্থিতি এমনকি আন্দোলনের নেতাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তার প্রমাণ মাত্র ১০-১৫ দিনে সহিংসতায় বহু প্রাণহানি, আসে কারফিউ, বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা, থমকে দাঁড়ায় অর্থনীতি। খোঁড়া পা গর্তে পড়লে যে অবস্থা হয়, অর্থনীতির অবস্থা অমনি দাঁড়ায়। অথচ করোনা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিবেশ বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবার প্রয়াস নিচ্ছিল। অবশেষে সেনাবাহিনী মাঠে নামিয়ে আপাতত স্বস্তি। মোটকথা, আন্দোলন, সহিংসতা এবং কারফিউর কবলে পড়ে বিগত এক সপ্তাহের ‘মেহেমে’ দৈনিক আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় দেড় বিলিয়ন ডলার বা ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এ যেন ‘গোদের উপর বিষফোড়া’। তবে এ হিসাবের মধ্যে নেই ডেটা সেন্টার, বিআরটিএ, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেস ওয়ের টোল প্লাজা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর ধ্বংসযজ্ঞের আর্থিক হিসাব; নেই মানুষের মানসিক শক্তির ওপর নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রভাব, বিপর্যস্ত সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার আর্থিক হিসাব-নিকাশ এবং দেশে-বিদেশে ভাবমূর্তিসহ অন্যান্য বিরূপ প্রভাব।
দুই
বেশ কিছু প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারে মনে। সদ্য ‘গত হওয়া’ আন্দোলনের শুরুতে, কিংবা তারও আগে, সরকার কেন হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করল না, তা অনেকের কাছে এক মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। আরও প্রশ্ন, কেন গেল ১৫ বছর ধরে একাধারে দেশ চালানো একটা দলের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিল না নাশকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠে কিংবা নিহত-আহত মানুষের পরিবারের পাশে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যখন একের পর এক স্থাপনা ধ্বংস করছিল তখন এদের কর্ণধারেরা কি কিছুই আঁচ করে আগাম প্রতিষেধক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেন না? কোথায় ছিল গোয়েন্দাদের নজরদারি এবং সরকারের প্রতি গোপন হুঁশিয়ারি? এবং সবশেষে, মূল্যস্ফীতির চাপে গেল দু বছর ধরে মানুষের অবস্থা জেরবার, কর্মসংস্থানের তেমন প্রসার নেই, শিক্ষিত যুবকদের ৪০ ভাগ বেকার। এমন অবস্থায় শুধু কোটাই কি আগুন জ্বালাল, উত্তপ্ত করল তরুণ সমাজকে ? সৌভাগ্যবশত, এই প্রশ্নগুলো আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শুভানুধ্যায়ী মহলের কাছ থেকে, সমালোচকদের পক্ষ থেকে নয়।
তিন
বেটার লেট দ্যান নেভার। অবশেষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কোটাব্যবস্থা সংস্কার সাধনে কিছু প্রস্তাব রাখেন, যা সরকার আমলে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব গেজেটে প্রজ্ঞাপিত করে প্রশংসিত হওয়ার কাজ করে। কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি চার-মাত্রিক চাপে পিষ্ট হতে থাকে। পূর্বেকার লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, তলানিতে রিজার্ভ এবং রাজস্ব ঘাটতির সঙ্গে সদ্য যুক্ত হলো প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। তার ওপর সম্পদের ধ্বংসস্তূপের ক্ষতির অর্থায়ন সমস্যা আর বিদেশি বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাবসহ সৃষ্ট অন্যান্য সমস্যার কথা বিস্তারিত নাইবা বলা হলো। মূলকথা, বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি এবং অর্থনীতি এখন গভীর খাদে নিমজ্জিত। স্বাধীনতার পর এত স্বল্প সময়ে এত বড় মাপের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল কি না সন্দেহ যখন বাংলাদেশ ২০২৬ সাল নাগাদ এক উন্নয়ন উত্তরণের উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
চার
বিজ্ঞ মহলের ধারণা, সম্প্রতি সৃষ্ট সংকট থেকে সব পক্ষেরই কিছু-না-কিছু শেখার আছে। মনে রাখতে হবে, আপাতত স্বস্তি মিললেও দেশবিরোধী চক্রান্ত চলবে অতি সংগোপনে, সুতরাং, সাধু সাবধান। বিশেষত, সরকারকে বুঝতে হবে- এক, যেকোনো আন্দোলনের শুরুতেই আন্দোলনকারীদের কথা শুনতে হয়; কারণ, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। দুই , সরকারি ছাত্র সংগঠন দিয়ে ছাত্রদের ন্যায্য আন্দোলন কখনও বন্ধ করা যায় না, হয়তো কিছু সময়ের জন্য তা স্থগিত করা যায় মাত্র। সরকারি ছাত্র সংগঠনে কিংবা দলে অনুপ্রবেশকারী যখন সন্দেহের তালিকায় থাকে তখন আরও সতর্কতা অবলম্বনের দরকার। তিন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড যখন ঘটছিল তখন সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা স্ব স্ব এলাকায় থাকলে পরিস্থিতি অত ভয়াবহ নাও হতে পারত। প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় নিযুক্ত কর্ণধারদের গাফিলতিসহ এ দায় তাদের ওপরও বর্তায়। অতএব ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উচিত হবে আত্মসমালোচনার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া। চার, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির পূর্বাভাস সরকারের আগেভাগে পাওয়া উচিত ছিল। পাঁচ, সারাবিশ্বে এখন এক কঠিন সময় পার করছে বিধায় সমস্যা বা সংকট সমাধানে সরকারকে আরও সহনশীল এবং উদার মনোভাব পোষণ করে লাইনচ্যুত ট্রেনটিকে ট্র্যাকে আনতে হবে। সবশেষে বলব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আন্দোলনকারীদের জন্যও সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং ধ্বংসযজ্ঞ পাঠ দান করে। এক, যারা আন্দোলনে সমর্থন জানায় তাদের সবার উদ্দেশ্য এক হয় না এবং প্রত্যেকেই চায় কোমলমতি ছাত্রদের আন্দোলনের ওপর ভর করে নিজের সুবিধা ঘরে তুলতে। তাতে যত প্রাণ যায় যাক দেশবিরোধী স্বার্থান্বেষীদের কিছু যায় আসে না। কথায় বলে, কারও যায় ঘর পোড়া, কেউ দেয় আলু পোড়া অবস্থাটা তেমনি। ছাত্ররা যখন অহিংস আন্দোলনে রত, তখন স্বাধীনতাবিরোধী দুষ্কৃতকারীরা একের পর এক রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে সরকারকে বিব্রত করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত ছিল। অর্থাৎ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। দুই, যেহেতু আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকে এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম হতে পারে তাই যত সম্ভব সতর্ক অবস্থান থেকে আন্দোলন পরিচালনা করা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আপাতত আন্দোলন স্থগিত করে শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থান সাপেক্ষে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা। এরই মধ্যে বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে, নিহত এবং আহতদের পরিবারের প্রতি সরকারের সংবেদনশীল মনোভাবের কথা জানানো হয়েছে। এখন দাবি আদায়ের তালিকা বৃদ্ধি এই আন্দোলনের মহতী প্রয়াসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে কেউ মনে করছেন।
এই আন্দোলন এবং সহিংসতায় ইন্ধনদাতা দলগুলোর জন্যও শিক্ষণীয় বিষয় একটাই থাকছে- আর তা হলো বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়, অহিংস এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারক। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে বা মদদ জুগিয়ে একটা সরকারকে কিছু সময়ের জন্য বেকায়দায় ফেলা সহজ কিন্তু তাতে করে ক্ষমতার সিঁড়ির নাগাল দিল্লি দুরস্ত। একমাত্র অহিংস আন্দোলন ক্ষমতার পরিবর্তন আনতে পারে বিলম্বে হলেও। অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে।
পাঁচ
সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা আশা করব সরকার, বিরোধী দল এবং বিশেষ করে আন্দোলনকারী ছাত্রসমাজ স্ব স্ব অবস্থানে আরও বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন। চলমান ছাত্র আন্দোলন সমর্থনযোগ্য ছিল সন্দেহ নেই কিন্তু তার পাশাপাশি যে ধ্বংসলীলা সংঘটিত হলো তা কাম্য ছিল না। উচিত হবে অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সুরক্ষা দেওয়া এবং শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদের সহাবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল কেবল তারাই যেন দ্রুত আইনের আওতায় আসে, নিরীহ মানুষ যেন হেস্তনেস্ত না হয় সেদিকে নজর রাখাও জরুরি। আশা করব, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রত্যেকেই সামনের দিকে পা বাড়াচ্ছেন। কিছু সৃষ্টি ধ্বংস করেছে দুষ্কৃতকারীরা, তবে এই ধ্বংসস্তূপের ছাই থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
‘আমরা করবো জয়, আমরা করবো জয়!/ আমরা করবো জয় নিশ্চয়ই!/ আহা বুকের গভীরে, আছে প্রত্যয়/ আমরা করবো জয় নিশ্চয়ই!’
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়