× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দেশপ্রেম

অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিকাঠামো গড়তে হবে

ড. মোহীত উল আলম

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৪ ১৩:০২ পিএম

অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিকাঠামো গড়তে হবে

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,/সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ গীতিকার-নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এ চরণযুগল দেশপ্রেমকে সর্বতোভাবে সংজ্ঞায়িত করে। জন্মভূমিটির নাম আমাদের জন্য বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর বড় আদরের বাংলাদেশ। আমাদের বড় ভালোবাসার বাংলাদেশ। এ দেশের প্রতি অকুণ্ঠ এবং নির্বাধ প্রেম থাকাই আমাদের সবার জন্য পরম আরাধ্য। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রম ও মেধা দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা বাংলাদেশ যখন উন্নত দেশে পরিগণিত হতে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই কয়েক দিনের ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখে পুরো জাতি স্তম্ভিত। মহাখালীস্থ সেতু ভবন আর রামপুরাস্থ বিটিভি ভবনের ছবি পত্রিকায় দেখে গা শিউরে ওঠে। একটি জনপ্রিয় জাতীয় পত্রিকায় একজন নারী সাংবাদিকের সরেজমিন প্রতিবেদন পড়ে হলো যেন ট্রয় নগরীর ধ্বংসযজ্ঞ মনের চোখে দেখলাম।

এ লেখাটি লেখার সময় (২৪ জুলাই সকাল) মনে পড়ল গত পরশুই সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকারউজ্জামান সাংবাদিকদের কাছে অতিশয় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে! সেগুলো তো দেশের তথা জনগণের সম্পদ! অর্থাৎ দেশপ্রেমের অভাবের কথা সখেদে বলেছেন তিনি। সরকারের দিক থেকে পরিস্থিতি বশে আনার জন্য লাগাতার কারফিউ ঘোষণা ও সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে নিয়োজিত করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র সুপ্রিম কোর্টের একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় বিচারপতি ছিলেন অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস জুনিয়র। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের প্রথম সংশোধন ফ্রিডম অব স্পিচ বা বাকস্বাধীনতার ওপর একটি মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি ১৯১৯ সালে বলেন, সরকার যদি অনুধাবন করে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, অর্থাৎ ‘ক্লিয়ার অ্যান্ড প্রেজেন্ট ডেঞ্জার’ (পরিষ্কারভাবে তাৎক্ষণিক বিপদের সৃষ্টি) তৈরি হয়েছে, তখন জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকার যে কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। সে অর্থে বলা যায়, বর্তমান সরকারের সব কার্যক্রম ক্লিয়ার অ্যান্ড প্রেজেন্ট ডেঞ্জার তৈরি হয়েছিল বলেই গৃহীত হয়েছে।

বর্তমান সরকার দ্বিতীয় দফায় প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পরপরই ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মুখোমুখি হয় বিডিআর বিদ্রোহের; যেটি দমনে সরকার সফল হয়। এরপর দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার সময় ২০১৪ সালে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির লাগাতার সশস্ত্র হরতাল ও অগ্নিসন্ত্রাসের তিন মাসব্যাপী চলমান আন্দোলনও সরকার কঠোর হাতে দমন করতে সফল হয় এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালি জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি যুদ্ধাপরাধী প্রথম সারির নেতাদের মৃত্যুদণ্ডসহ নানান শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সরকার নিজেকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়, সঙ্গে থাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অকুণ্ঠ সমর্থন। তৃতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর, অর্থাৎ ২০১৮ সালের পর থেকে সরকার পদ্মা সেতু ও পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু টানেল ও ঢাকায় মেট্রোরেল চালুর মতো অসামান্য উন্নয়ন সাফল্য অর্জন করতে থাকলেও করোনা ও বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার কারণে অর্থনীতির ক্ষেত্রে বেসামাল অবস্থার সৃষ্টি হতে থাকে। জনজীবনে কিছুটা হলেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ নানান কারণে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়। আর ২০২৪-এ নির্বাচিত হওয়ার পর, অর্থাৎ টানা চতুর্থবার নির্বাচিত হওয়ার পর পত্রপত্রিকায় নানান শীর্ষ পদধারী কর্মকর্তার হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের কাহিনী জনমনে নানানরকম শঙ্কা তৈরি করতে থাকে; যা দমনে দুঃখজনকভাবে, সরকারের কার্যক্রমে দ্রততার চেয়েও শ্লথগতি পরিলক্ষিত হয়।

আর ঠিক এ সময়ে ঘটল কোটা আন্দোলন নিয়ে ঘটনাবলি। বৈষম্যবিরাধী আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়ার পক্ষে উচ্চ আদালত যে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন এবং তার আলোকে সরকার যে সহসা প্রজ্ঞাপন জারি করেছে তার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে আদর্শগত অবস্থান থেকে নামিয়ে উপযোগিতার স্তরে ব্যবহার করার পথ রুদ্ধ করা হলো। ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘চাকরিতে বৈষম্যপ্রথা বংশানুক্রমে চলতে পারে না। আমার মতে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানাদির পর এ সুবিধা কখনও তৃতীয় প্রজন্মের কাছে যাওয়া উচিত নয়। তার ফলে মুক্তিযোদ্ধাদেরই অপমান করা হবে।’ অর্থাৎ যেটা মুক্তিযোদ্ধার জীবনে ছিল একটি আদর্শ সেটা মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতির কাছে হবে আদর্শ তো বটেই, কিন্তু তার চেয়েও প্রত্যক্ষ কারণ হবে যে এটি (কোটার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়া) একটি বিষয়গত সুবিধায় পরিণত হবে বা হয়েছে। আদর্শ যখন বিষয়স্বার্থস্পৃষ্ট হয়, আদর্শের সামাজিক উপযোগিতা তখন পণ্যের উপযোগিতায় পরিণত হয়। অর্থাৎ এর একটা বিনিময়মূল্য তৈরি হয়, তৈরি হয় বৈষয়িক লাভক্ষতির প্রশ্ন বা এর হাতবদল হয়, উচ্চমূল্য-নিম্নমূল্য হয়, তখন আদর্শের মূল অভিঘাত পড়ে এর পণ্যগত বা বিষয়গত পরিপ্রেক্ষিতের ওপর, আদর্শের ওপরে নয়। আদর্শ তখন নৈতিকতার নিরপেক্ষ অবস্থানে না থেকে অর্থনীতির এজেন্ডা হয়ে যায়। সোজা কথায়, নানার বা দাদার মুক্তিযোদ্ধা থাকার কারণে নাতি বা পুতি পাচ্ছে একটি সরকারি চাকরি। অর্থাৎ এটা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বৈষয়িক সম্প্রসারণ। তাই যদি হয়, এটি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চরম অবনমন।

এটা খুবই আমলযোগ্য যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের আড়ালে সরকারবিরোধী, দেশবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মহল এ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা কোটা সংস্কারবাদীদের ওপর ভর করে তাদের এজেন্ডা, যেটা নাকি সরকার পতনের এজেন্ডা, এগিয়ে নিতে চেয়েছিল। মানলাম। কিন্তু এ মহলকে তো বাংলাদেশের জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাচ্ছে না বা যাবে না বা আইন করেও নিষিদ্ধ করার মতো বাস্তবতা সমাজে নেই। এবং বিভিন্ন সরকারি সংবেদনশীল পদে এদের অনেকে অধিষ্ঠিত বলে খবরের কাগজে প্রায়ই পড়ি।

ব্যাপারটা আসলে হচ্ছে যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী নয়Ñএ বিভাজনটা যুগেরই কারণে এবং একটি রাষ্ট্রীয় সমাজকে তার অগ্রগমনের পথে নানান বাধ্যবাধকতাপূর্ণ ইকুয়েশন এবং কাউন্টার ইকুয়েশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় বিধায় বিভাজনরেখাটি ক্রমেই অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হবে, কিংবা নতুন রূপ পাবে। তখন আদর্শের জায়গায় বিষয়চেতনাধারীরা এসে নানান সুবিধামতো জায়গা দখল করবে। কিছু সবজি যেমন আলু, ওলকচু ইত্যাদির গায়ে গজানো শেকড়গুলো লক্ষ করে দেখবেন, কোন শিকড়টা যে কোথায় গজিয়েছে আর কোথায় শেষ হয়েছে বোঝার উপায় নেই। ঠিক তাই অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঐতিহ্যের অধিকারীদের নিয়ে দল ও ব্যক্তিতে সে ধরনের অস্পষ্টতা যে সমাজে তৈরি হয়নি তাই নয়। কিছুমাত্র লাগে না, বৈবাহিক সম্পর্কগুলো দেখেন।

এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সর্বোচ্চ বিচক্ষণতা প্রদর্শনের প্রয়োজন ও সুযোগ আছে। সেটি হলো, সহনশীল অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিকাঠামো তৈরি করা। এ দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার না চাইলেও সরকারি দলের পক্ষ থেকে আসতে হবে। জেনারেল ওয়াকারউজ্জামান যেমন সময়োচিত যে কথাটি বলেছেন, সবাই মিলে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। জনমতের একটি দিক হচ্ছে, যে এবারের সংকট দমনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কয়েকটি দুর্বলতা ধরা পড়েছে। প্রথম দুর্বলতা হলো, এটি সংকটের শুরুতেই আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করা যেত। সেখানে আদালতের অসিলা দিয়ে অযথা কালক্ষেপণ হয়েছে এবং এর ফলে প্রায় দেড়শ লোকের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যও রয়েছেন। দ্বিতীয় দুর্বলতা হয়েছে, একটি দায়িত্বশীল মহল থেকে সরকার-সমর্থিত ছাত্র সংগঠনকে সংকটের প্রাথমিক দিনগুলোয় আন্দোলনকারীদের দমন করতে যেতে বলা। এটা খুবই রাজনৈতিক অবিবেচনাপ্রসূত বুমেরাং সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে বলি, ২২ জুলাই সিএনএনে সরাসরি দেখলাম ১৩ জুলাই সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গুলিতে আহত হওয়ার পর সেটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মেম্বার্স অব হাউস ওভারসাইট কমিটি, অর্থাৎ যে কমিটির দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে কোনো শীর্ষ পদধারী ব্যক্তির কোনো গাফিলতি হয়েছে কি না তা জেরার মাধ্যমে যাচাই করা, তারা বসেছেন। দেখলাম, যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের চিফ কিম্বারলি চিটলকে ১৫ জনের সদস্য কমিটিটি সর্বমহলের উপস্থিতিতে ছয় ঘণ্টা ধরে জেরা (তাদের ভাষায় গ্রিল) করেছেন। বলছেন যে, আপনি বেতন নেন জনজীবনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা বিধান করার জন্য, আপনার এ ব্যর্থতার পর যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কেন আপনার ওপর আস্থা রাখবে। এ জেরার পরপরই কিম্বারলি চিটল তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন।

এ ধরনের জেরার সংস্কৃতি তো আমাদের তৈরি হয়নি। হাতে বন্দুক, সামনে বুক পাতা একটি ছেলে, আমি গুলি করলাম, একজন মায়ের কোল খালি হয়ে গেলÑএটা কোনো বিবেচনাকর কাজ হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ‘আর যদি একটা গুলি চলে’র সতর্কবাণী যেন আমরা ভুলে না যাই। অথচ এত এত সম্পত্তি নষ্ট হলো, যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূলে ধ্বংস করা হয়েছে সে সময়ে এগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে কারা কোথায় ছিল আমি জানি না। আরেকটি ছোট্ট কথা আছে, ব্রিটিশরা ভারত শাসন করেছিল হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি বা ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি দিয়ে। ঠিক সে রকম বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আর বিপক্ষের শক্তিতে আলাদা করে অবিরত যুধ্যমান অবস্থায় রেখে দেশটাকে ক্রমে দুর্বল করে ফেললে, দুই পক্ষেরই ক্ষতি, কিন্তু লাভটা কাদের তা-ও মাথায় রাখতে হবে। হু বেনিফিটস ফ্রম আ উইকার বাংলাদেশ? কাজেই সাধু সাবধান!

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা