প্রেক্ষাপট
বিপ্লব বহ্নি রায়চৌধুরী
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৪ ১৮:০৯ পিএম
‘মন বাবু যে মারা গেছে অনেকদিন আগে/যা দেখি তাই এঁকে রাখি জীবন চিত্রপটে’-আমারই লেখা পঙ্ক্তি। কারও কারও সততা-নৈতিকতা মরে গেছে ঠিকই কিন্তু অনেকের মাঝে তা-ই অনুসরণযোগ্য হয়ে আছে এও সত্য এবং তাদের সংখ্যাই বেশি। সততা¬-নৈতিকতার সঙ্গে মনের একটা গভীর সম্পর্ক, যোগাযোগ আছে; যা পরিবারের সংস্কার থেকে বংশানুক্রমে আসে। তাই যে-কারওর বিবেকের মৃত্যু দেখে খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, বিবেককে কে মেরেছে? মেরেছে পরাধীনতা। কোন পরাধীনতা? আমরা তো স্বাধীন। আসলেই কি তাই? চোখ বুজে শান্ত মনে একটু ভেবে দেখুন। কী চেয়েছিলাম, কী পেলাম? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পেলাম প্রথম লাইনটা ‘মন বাবু যে মারা গেছে অনেকদিন আগে’, আর সমাধান কী? নিজেকে জিজ্ঞেস করে উত্তর পেলাম দ্বিতীয় লাইনটা ‘যা দেখি তাই এঁকে রাখি জীবন চিত্রপটে’।
আমাদের দেশের কথা বলছি, যার জন্ম হয়েছিল আজ থেকে ৫৩ বছর আগে। স্বাধীন হয়েছিল দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচতে, শ্বাস নিতে, নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে, নৈতিকতার ভিত শক্ত করতে। তা কতটা সম্ভব হয়েছে? উত্তরটা সর্বাংশে প্রীতিকর নয়। এখনও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কদাচারের ছায়া দৃশ্যমান। আর এতে সুবিধা হয়েছে ’৭১ ও ’৭৫-এর দুর্বৃত্তদের এবং মনে হয় যেন শ্বাস নিতে পারে না দেশ-সমাজ। এজন্য দায়িত্বশীল অনেকেই কমবেশি দায়ী। এ থেকে মুক্তির পথ খোঁজার কেউ কি আছেন? নিশ্চয়ই আছেন। কিন্তু দুর্নীতির বেড়াজাল এমনভাবে আটকে ফেলেছে, শুধু তারা চাইলেই হবে না, যদি না আমরা সবাই মিলে তাদের পাশে থাকি। আমাদের যার যতটুকু হক আছে, তাতে সুখী না হই। আমরা জানি এবং ছোটবেলা থেকেই কিছু প্রবাদ মায়ের মুখে শুনে বড় হয়েছি। ওই প্রবাদগুলো মানসিকতা, চিন্তা-চেতনায় সর্বক্ষণ বিরাজ করে।
‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’Ñখুব সত্য কথা। যেসব ভালোমানুষ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ে আছেন বা সমাজে বিভিন্ন স্তরে ভালো অবস্থানে আছেন; তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে দাঁড়ান দৃঢ়ভাবে, নৈতিক অবস্থান অনমনীয় করে তাহলে অন্ধকার ঘুচবে। যারা লোভের কারণে, হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার কারণে বিপথে পা ফেলেছেন; তাদের চৈতন্যের স্তম্ভে স্পর্শ লাগুক শুভবোধের। আবার শুধু ব্যক্তিগতভাবে সৎ থাকলেই চলবে না, দায়িত্ব পালনও করতে হবে। দায়িত্ব পালন না করলে সততার মূল্য থাকবে না। এর ফলে সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ লড়াই করতে করতে একসময় হতাশ হয়ে পড়বে। তাদের মনে হতে পারে, ‘জীবন, তুমি তো অন্ধ/মানুষের জন্য বন্ধ/কারাগারে তুমি যে বন্দি,/আঁটো মানুষেরই জন্য ফন্দি।’
আমরা নিরাশ হতে চাই না। ’৭১ অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ পর্ব আমাদের চেতনায় বড় শক্তি। যে স্বপ্ন-প্রত্যয় নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ও নেতৃত্বে এ জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমুক্তি ঘটিয়েছে, সে জাতি নিরাশার ছায়া অবশ্যই সরাতে সক্ষম যদি প্রগতিবাদী-দেশপ্রেমিক সবাই দাঁড়ান এক কাতারে। এজন্য নৈতিকতার লড়াই জোরদার করা চাই। নৈতিকতার লড়াই বেগবান করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। মুখোশধারীদের মূলোৎপাটন করে দেশপ্রেমিকদের জায়গা দিতে হবে অগ্রভাগে। তবেই মন আবার প্রাণ পাবে। বিজয়ী এ জাতির অনেক সূর্যসন্তান এখনও রাজনৈতিক মঞ্চে আছেন। তারা আমাদের ভরসা। রাজনীতিতে যে কদাচারের ছায়া পড়েছে তা সরাতে হবে শুদ্ধ রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়েই। প্রজন্ম এ লড়াইয়ে সঙ্গে থাকবে নিশ্চয়।