এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৪ ১৬:৩২ পিএম
হার দিয়ে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের এশিয়া কাপ। ক্রিকেটে ইতিবাচক চিন্তা, সাহস, বিশ্বাস, নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা, মনঃসংযোগ এবং মানসিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খেলা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকার পাশাপাশি বুঝতে হবে কীভাবে পরিস্থিতি মানিয়ে খেলতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। মাস দুয়েক আগে অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দল বাংলাদেশে এসে সিরিজ খেলেছে প্রথমবারের মতো- আর সেই সিরিজে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে পুরোপুরি ‘আউট প্লেইড’ হয়েছে বাংলাদেশ নারী দল। এটি অবশ্য অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। যেটি চিন্তার বিষয় হিসেবে নির্ণয় হয়েছে সেটি হলো, বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট কি ‘রাইট ডিরেকশনে’ চলছে? টিম ম্যানেজমেন্ট এবং ক্রিকেট পরিচালনা কমিটি সবকিছু বুঝেও অনেক সীমাবদ্ধতার জাল থেকে বের হতে পারছেন না। পুরুষ ক্রিকেটের মতো নারী ক্রিকেটও তো সারা বছরের খেলা হওয়া উচিত। যে কোনো ক্ষেত্রে অনুশীলনের মাধ্যমেই পরিশীলিত হতে হয়। খেলাধুলার ক্ষেত্রে তা আরও বেশি প্রযোজ্য। বর্তমান জামানায় ক্রিকেট খেলার রূপরেখাই পাল্টে গেছে। সেই আঙ্গিকে প্রশিক্ষণেরও বিকল্প নেই।
অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে আসার অন্যতম কারণ হলো আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে নারী বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের লড়াইয়ের মঞ্চে নামার আগে কন্ডিশন এবং উইকেটের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। আর এর জন্যই তারা সিলেটে ম্যাচগুলো খেলেছে। অস্ট্রেলিয়া নারী দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার অ্যালিসা হিলি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। অস্ট্রেলিয়া দূতাবাস কর্তৃক প্রদত্ত রাতের ভোজের পর অ্যালিসা হিলির সঙ্গে কফি খেতে খেতে আমার কথা হয়েছে। প্রথমে তিনি কিছুটা ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট নিয়ে তার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। তার কথা হলো- ‘বাংলাদেশ নারী দলের মেয়েদের বয়স কম। অভিজ্ঞতা কম। খেলতে হবে সংঘবদ্ধ ক্রিকেট। টি-টোয়েন্টির কথাই যদি বলি তা হলে ‘পাওয়ার প্লে’ থেকে শুরু করে একটা রীতি বজায় রেখে খেলতে হবে। টপ-অর্ডারদের অনেক দায়িত্ব আছে। একদিন টপ-অর্ডার ভালো করল তো, আরেকদিন লোয়ার অর্ডাররা কোনোমতে টেনে নিয়ে গেল, এটি ক্রিকেট দলের স্বাভাবিকতা কিংবা সুস্থতা নয়। বাংলাদেশের বোলাররা হঠাৎ হঠাৎ আমাদেরকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলেছে, আমরা অভিজ্ঞতার আলোকে সেটি উতরে গেছি। তবে বাংলাদেশের ব্যাটারদের নিয়ে আমাদের তেমন ভাবতে হয়নি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলোÑভালো সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো- আর তা একটি বাস্তবধর্মী সুস্থ প্রসেসের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ নারী দলকে অনেক বেশি ক্রিকেট খেলতে হবে। শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে দেশে-বিদেশে দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলো ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করবে। ক্রিকেটের মানোন্নয়নের তো শেষ কথা নেই। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
লম্বা সময় পাড়ি দিতে হবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে ক্রিকেট কাঠামো, পেশাদার মানসিকতা, ইচ্ছার শক্তি, ক্ষুধা মেটানো এবং নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ওপর। বাংলাদেশ তো মাত্র কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। আর অন্যরা অনেক বছর ধরে। এটি অবশ্যই সব সময় বিবেচনায় রাখতে হবে। হেসে হেসে বলছেন কখনও আশা করা উচিত নয় বাংলাদেশ নারী দল এখনই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের সামর্থ্য রাখে। তাতে হতাশার জন্ম হয়। বাংলাদেশ অবশ্যই অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজে হারাতে পারবে। যখন তারা সেই সামর্থ্যের অধিকারী হবে।
নারী এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট উৎসব এবার শ্রীলঙ্কায়। পর্দা উঠেছে ১৯ জুলাই। আর সাঙ্গ হবে ২৮ জুলাই। অংশগ্রহণকারী দেশ ৮টি। আটটি দল দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মহাদেশীয় সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টে খেলবে। ‘এ’ গ্রুপে আছে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। আর ‘বি’ গ্রুপে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া। দুইটি গ্রুপের শীর্ষ দুইটি দল সেমিফাইনালে খেলবে। গ্রুপের প্রথম খেলা বাংলাদেশ খেলবে ২০ জুলাই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। এরপর যথাক্রমে ২২ ও ২৩ জুলাই থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার বিপক্ষে। আইসিসির ক্রিকেট বিশ্বায়নে এশিয়া মহাদেশ থেকে কেমন সাড়া মিলছে এটি নিয়ে একটি চৌকস নিবন্ধ রচনা করেছেন মাইক বারবার ইংল্যান্ডের সাবিং হিলে সাপ্তাহিক কলামে। তার বক্তব্যÑ এশিয়ার অনেক দেশের ক্রীড়াঙ্গনের নারী-পুরুষ সমতার জন্য প্রয়োজন পুরুষদের সহায়তা ও সমর্থন। এই ক্ষেত্রে অনেক বেশি ঘাটতি আছে এখনও। নারীর ক্ষমতায়ন সমাজে বড় জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন নারী সহায়ক পরিবেশ। পাশাপাশি দরকার পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন ও সর্বাত্মক সমর্থন। অধিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। বৈষম্যের ছায়া অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমাদের নারী ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধা এমনিতেই অনেক কম। অনস্বীকার্য সুযোগ-সুবিধা যে কোনো ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার বড় সহায়ক শক্তি। এই শক্তি বর্ধনে আনুষাঙ্গিক যা কিছু প্রয়োজন তার সব কিছু কর্তৃপক্ষকে করতে হবে।
নারী ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট সব সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার খুব সুযোগ নেই। এরপর তারা যতটুকু করেছে খুব একটা কার্যকরী হয়েছে বলে মনে হয়নি। এরও বিভিন্ন কারণ আছে। তখনি দল পুনর্গঠন করা সহজ হবে যখন অনেক খেলোয়াড় হাতে থাকবে। ক্রিকেট তো খেলা হয় সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে। এই ক্রিকেট থেকে অনেক বেশি সম্ভাবনার খোঁজ মিলবে কীভাবে? নারী ক্রিকেটারদের মাসিক বেতন বোর্ড নাড়াচাড়া করে কিছুটা সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে এসেছে। যদিও তা পুরুষদের থেকে অনেক অনেক পেছনে। পুরুষদের মতো নারী ক্রিকেটাররা ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি খেলেন। বেতন এবং সুযোগ বৃদ্ধি অবশ্যই নতুন একটি প্রেরণা নারী ক্রিকেটারদের খেলাকে আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে। উইকেট কিপার ও ব্যাটসম্যান নিগার সুলতানার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের স্কোয়াড অভিজ্ঞ এবং তরুণ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গঠিত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের প্রয়োজন আছে যদি ‘ফিটনেস’ এবং ফর্ম থাকে। এক বছরের বেশি সময় পরে জাহানারা আলম ও রুমানা আহমদ আবার জাতীয় দলের স্কোয়ার্ডে এসেছেন। তারা দুজন ছন্দে আছেন। এই দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের প্রয়োজন আছে দলে। এশিয়া কাপ ক্রিকেট অনেক বেশি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট। এখানে চাপ সামাল দিয়েই খেলতে হবে।
এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দারুণ কিছু করে দেখিয়ে দেবে এ ধরনের চিন্তা সঙ্গত কারণেই অনেকের নেই। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট মহল চাইছে নারী দল তাদের সামর্থ্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্রিকেট খেলুক। চেষ্টা করুক টুর্নামেন্টে দাগ কেটে আলোচিত হতে। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট উইংসের চেয়ারম্যান সফিউল আলম চৌধুরী এমপি সম্প্রতি একটি দৈনিকে সাক্ষাৎকারে বলেছেন ‘আমরা যদি আমাদের নারী ক্রিকেটের পারফরম্যান্সের গ্রাফ লক্ষ করি তা হলে কিন্তু এটি খারাপ নয়। এটি ঠিক সম্প্রতি দেশে অনুষ্ঠিত দুটি সিরিজে নারী দল ভালো করতে পারেনি। কিন্তু এই দুটি সিরিজের আগে নারী দলের পারফরম্যান্স ছিল আশাব্যঞ্জক। আশা করি, শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দল ভালো করবে, এশিয়া কাপ উপভোগ করবে। আমরা কিন্তু ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আগেও জিতেছি। দলের যে সামর্থ্য আছে তা সময়মতো প্রতিফলিত করতে পারলে আশা করা যায়, এশিয়া কাপে নারী দল ভালো করবে। আমরা তো অবশ্যই চ্যাম্পিয়ন হতে চাই, তবে রূঢ় বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নয়।
ক্রিকেটাঙ্গন ঘিরে আমাদের প্রত্যাশার খতিয়ান অনেক বিস্তৃত। এই প্রত্যাশা পূরণে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি খেলোয়াড়দেরও সেইভাবেই সব কিছু আত্মস্থ করতে হবে। অনুশীলনের ব্যাপারটি তাদের যেহেতু নিজস্ব বিষয় সেহেতু অনুশীলনে তাদের মনোযোগ এমনভাবে বাড়তে হবে যাতে তা হয় তাদের পরিশীলিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। সেইসঙ্গে খেলোয়াড়দের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তাদের অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রও বাড়াতে হবে।
লেখক : ক্রীড়া বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া