× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অধিকার

হরিজনদের উচ্ছেদ কেন

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৪ ১৫:০১ পিএম

হরিজনদের উচ্ছেদ কেন

আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রধান উপাদান হচ্ছে আমরা মানুষ। মানুষ প্রাণিজগতের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। বাস্তবে এ মানুষ পরিচয়টিই কিন্তু শেষ কথা নয়। এ মানুষের মধ্যে রয়েছে সর্বাধিক বিরোধ-বৈষম্য এবং পারস্পরিক ঘৃণা-বিদ্বেষ। আদিম যুগ থেকেই এর প্রচলন লক্ষ করা যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কলম্বাস স্পেনের রানী ইসাবেলার আর্থিক সাহায্যে ভারতবর্ষ অভিমুখে তরি ভাসান কুখ্যাত খুনি, ধর্ষক, চোর-ডাকাতদের জেলবন্দি থেকে মুক্ত করে, তাদের সঙ্গী করে। ভুল পথে কলম্বাসের তরি ভেড়ে আমেরিকা মহাদেশের ডমিনিয়ন রিপাবলিকে। বিস্তর লুণ্ঠন, গণহত্যা সংঘটিত করে আদি আমেরিকান যাদের রেড ইন্ডিয়ান বলা হয়, তাদের কিছু মানুষকে ধরে নিয়ে আসে স্পেনে। উদ্দেশ্য দাস হিসেবে বিক্রি ও ব্যবহার। কিন্তু ধরে আনা মানুষেরা কেউ বেশিদিন বাঁচতে পারেনি আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে। তারা একে একে মারা যায়। ইউরোপীয়রা আমেরিকা দখল করে আদি আমেরিকানদের নির্মমভাবে হত্যা করে সেখানে নিজেরা দখল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আমেরিকাকে উন্নত করতে জাহাজ বোঝাই করে জোরপূর্বক আফ্রিকানদের ধরে এনে দাস হিসেবে ব্যবহার করে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করে, ভয়ানক অমানবিকতায়। কলম্বাসের অনুসরণে দাস-ব্যবসা ইউরোপীয়দের প্রধান বাণিজ্য হয়ে দাঁড়ায়। আর এ দাস ব্যবসার মূল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে আফ্রিকা মহাদেশ।

দাস যুগের পর বুর্জোয়া যুগের সূচনা হয়। ফরাসি বিপ্লবের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া ব্যবস্থা বিশ্বে আধুনিক ব্যবস্থার স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু এতে মানুষে মানুষে বৈষম্যের অবসান ঘটেনি। বরং বৈষম্যের আধুনিকীকরণ ঘটে। পৃথিবীর অনেক দেশে বুর্জোয়া ব্যবস্থার আগে সামন্ত ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। বুর্জোয়া ব্যবস্থার পরও আজ অবধি রাজা, বাদশাহ, শেখ, আমির, নবাব ইত্যাদি নামে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন ও শোষণমূলক ব্যবস্থা টিকে আছে। কোনো ব্যবস্থাই মানুষকে মুক্ত করতে পারেনি। পেরেছিল ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পর সোভিয়েত রাশিয়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীজুড়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়। পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষে মানুষে বিভেদ বৈষম্য পর্যায়ক্রমে নতুন নতুন পন্থা ও মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। বর্ণ, ধর্ম, জাতপ্রথা, শ্রেণি-বৈষম্য বর্তমান বিশ্বে মানুষের মধ্যকার বিভেদ সৃষ্টিতে সর্বাধিক ক্রিয়াশীল। ধর্মীয়ভাবে বর্ণ-বৈষম্য মোটা দাগে অক্ষুণ্ন রয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে। অর্থাৎ একই ধর্মমতের অনুসারীদের মধ্যে বিভেদ বৈষম্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ধর্মমতে। বাংলাদেশে জাত-বৈষম্য কার্যত ক্রিয়াশীল নয়। কেননা দেশভাগে বিত্তবান ব্রাহ্মণরা দেশত্যাগের ফলে গরিব অর্থাৎ নিম্নবর্গের হিন্দুরা তাদের অর্থনৈতিক কারণে দেশত্যাগ করেনি।

হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সর্বাধিক উপেক্ষিত জাত হিসেবে গণ্য করা হয় দলিতদের অর্থাৎ নমঃশূদ্র বা হরিজনদের। তাদের জন্য নির্ধারিত পেশা হচ্ছে মলমূত্র পরিষ্কার করার মতো অমানবিক পেশা। তারা শত সহস্র বছরব্যাপী ওই পেশায় নিযুক্ত আছে। আমাদের দেশে ওই পেশায় বাঙালি হিন্দু হরিজদের অভাবে কিংবা অসম্মতির কারণে মোগল ও ব্রিটিশরা দক্ষিণ ভারত থেকে হরিজনদের এখানে নিয়ে আসে এবং ওই পেশায় নিযুক্ত করে। তাদের জন্য এ ঢাকা শহরেই ‘হরিজন পল্লী’ নামে তখনকার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন আবাসস্থল বা বস্তি স্থাপন করে দেয়। গণকটুলী, স্বামীবাগ, মিরনজিল্লা, মোহাম্মদপুর, দয়াগঞ্জ প্রভৃত সুইপার কলোনি নামক স্থানে তারা বংশানুক্রমিক বসবাস করে আসছে। ঢাকা শহরের পয়োনিষ্কাশনের পেশায় তারা আজও নিয়োজিত আছে। পাকিস্তান আমলে দেখেছি বাসাবাড়ির অদূরে নিভৃত প্রান্তে থাকত টয়লেট বা টানা পায়খানা। উঁচু টয়লেটে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হতো। পয়ঃপরিষ্কারের জন্য বাসাবাড়ির পেছনে নিকাশের সরু পথ রাখা হতো। গভীর রাতে এক গরু বিশিষ্ট গাড়ির পেছনে লোহা নির্মিত ট্যাংকসমেত তারা আসত।

সুদীর্ঘ ৪০০ বছর ধরে বসবাস করে আসছে হরিজনরা মিরনজিল্লা বস্তিতে। একাত্তরে এদের ১০ জনকে পাকিস্তানি হানাদাররা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল। ওই ১০ জন শহীদের স্মরণে শহীদবেদি বস্তির ঢোকার মুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মহাবীর লাল সামুন্দ, নান্দু লাল, আনওয়ার লাল, ঈশ্বর লাল, ঘসেটি দাসসহ ১০ জন শহীদ। তাদের জীর্ণ ঘরগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ঘোষণা করে নতুন ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৬০-৭০টি পরিবারকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করে সিটি করপোরেশন। মাত্র ১৯টি পরিবারকে নতুন ভবনে বসবাসের জন্য চাবি হস্তান্তর করার পরদিনই কোনোরূপ পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বুলডোজার দিয়ে তাদের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। আরও ৯৫টি আবাস ভেঙে দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করে। হরিজনদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ১২টি আবাস ভাঙার পর অভিযানকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তারা এখন শঙ্কা-আতঙ্কে হুমকির কবলে রয়েছে।

এ হরিজনরা বংশপরম্পরায় ওই পেশায় আজও নিয়োজিত আছে। স্বাধীনতার আগে এবং পরে ওই পেশায় বাঙালি হিন্দু-মুসলমানরাও যোগ হয়েছে এবং বাঙালিরাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তবে এখন টানা পায়খানা আর নেই। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে সুইপার কলোনিতেই তারা বসবাস করে। এরই মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুরের সুইপার কলোনি উন্নয়নের জোয়ারে হারিয়ে গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বাংলাদেশ মাঠ সংলগ্ন মিরনজিল্লা হরিজনদের আবাসটি উচ্ছেদ করে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা শুরু করেছে। হরিজনদের সম্মিলিত প্রতিরোধে সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে হাইকোর্ট তাদের উচ্ছেদ স্থগিতের আদেশ দিয়েছেন। অতিসম্প্রতি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ঠেঙারে বাহিনী নিয়ে সিটি করপোরেশনের জনৈক ম্যাজিস্ট্রেট মিরনজিল্লায় হাজির হন। ঠেঙারে বাহিনী আক্রমণ চালায় হরিজনদের বলপূর্বক উচ্ছেদে। এতে ব্যাপক সংঘাত হয়। আহত হয় হরিজন নারী, শিশুসহ নিরপরাধ মানুষ। এ হামলা নিঃসন্দেহে আদালত অবমাননার শামিল।

হরিজনদের শত শত বছরের আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগকে সব বামপন্থি সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিশিষ্টজনেরা নিন্দার পাশাপাশি অকুস্থানে গিয়ে হরিজনদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় কাউন্সিলরের ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। হরিজনরা অবহেলিত এবং সমাজের মূলধারা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। তাদের ওপর ভারতবর্ষে অনেক অনাচারের ইতিহাস রয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে হরিজনদের ভূমিকা রয়েছে। তাদের অন্যায় উচ্ছেদ বন্ধ হোক। তারা এ দেশের নাগরিক অধিকারের অনিবার্য অংশীদার। বৈষম্যের ছায়ার বিস্তৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাম্যের আলো ছড়াক।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা