পবিত্র আশুরা
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৪ ১৩:৫৭ পিএম
মহররম মাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন হচ্ছে ‘ইয়াওমে আশুরা’ তথা ১০ তারিখ। হাদিসে আশুরার দিনের অনেক ফজিলত বিবৃত হয়েছে। এমনকি ইসলামপূর্ব আরব জাহেলি সমাজে এবং আহলে কিতাব তথা ইহুদি-নাসারাদের মাঝেও ছিল এ দিনের বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘(জাহেলি সমাজে) লোকেরা রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার দিন রোজা রাখত। এ দিন কাবায় গিলাফ জড়ানো হতো। এরপর যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যে এ দিন রোজা রাখতে চায় সে রাখুক। যে না চায় না রাখুক।’ Ñসহিহ বোখারি : ১৫৯২
বর্ণিত হাদিস থেকে বুঝে আসে, জাহেলি সমাজে এ দিনের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এ দিনে
তারা কাবা শরিফে গিলাফ জড়াত, রোজা রাখত। নবীজিও এ দিন রোজা রাখতেন। হিজরতের পরও এ দিন
রোজা রাখতেন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এ দিনের রোজা ফরজ ছিল। রাসুলে কারিম (সা.)
হিজরত করে মদিনায় এসে দেখেন, মদিনার আহলে কিতাব ইহুদিরা এ দিনে রোজা রাখছে। এ দিনকে
তারা বিশেষভাবে উদ্যাপন করছে। নবীজি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিনে তোমরা কী জন্য রোজা
রাখছো? তারা বলল, এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ দিবস। আল্লাহতায়ালা এ দিনে হজরত মুসা (আ.)
ও তার সম্প্রদায়কে (ফেরাউনের কবল থেকে) মুক্তি দিয়েছেন। ফেরাউনকে তার দলবলসহ (সমুদ্রে)
নিমজ্জিত করেছেন। এরপর হজরত মুসা (আ.) এ দিনে শুকরিয়া আদায়স্বরূপ রোজা রাখতেন। তাই
আমরাও রোজা রাখি। নবীজি এ কথা শুনে বললেন, হজরত মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে তো
আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার। এরপর নবীজি (সা.) নিজেও রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রোজা
রাখতে বললেন। Ñসহিহ মুসলিম : ১১৩০
আশুরার দিনের মূল ইবাদত হচ্ছে রোজা রাখা। এ দিনের রোজার ফজিলতের ব্যাপারে হজরত
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট প্রত্যাশা
রাখি, তিনি আগের এক বছরের (সগিরা) গুনাহ মাফ করে দেবেন। Ñসহিহ মুসলিম : ১১৬২। সাহাবায়ে
কেরাম এ দিনে বাচ্চাদেরও রোজা রাখতে অভ্যস্ত করাতেন। বিখ্যাত নারী সাহাবি হজরত রুবায়্যি
বিনতে মুয়াববিজ (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিন সকালে আনসারদের এলাকায়
লোকমারফত এ খবর পাঠালেন, যে আজ সকালে খেয়েছে সে যেন সারা দিন আর না খায়। আর যে সকালে
খায়নি সে যেন রোজা পূর্ণ করে। ওই নারী সাহাবি বলেন, এর পর থেকে আমরা নিজেরাও এ দিনে
রোজা রাখতাম এবং বাচ্চাদেরও রোজা রাখাতাম। তাদের জন্য খেলনা বানিয়ে রাখতাম। তারা খাবারের
জন্য কান্নাকাটি করলে তাদের খেলনা দিয়ে শান্ত করতাম। ইফতার পর্যন্ত এ নিয়ে তার সময়
কেটে যেত। Ñসহিহ বোখারি: ১৯৬০
আশুরার দিনের রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। এ দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব।
এ রোজা পালনের উত্তম পদ্ধতি হলো ১০ মহররমের আগে বা পরে ৯ বা ১১ তারিখে এক দিন অতিরিক্ত
রোজা রাখা। ৯ তারিখে রাখতে পারলে ভালো। কারণ হাদিসে ৯ তারিখের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আশুরার রোজা রাখছিলেন
এবং অন্যদের রোজা রাখতে বলেছিলেন তখন সাহাবিরা বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এ দিনকে তো
ইহুদি-নাসারারা (খ্রিস্টানরা) সম্মান করে? তখন নবীজি (সা.) বললেন, তাহলে আগামী বছর
আমরা ৯ তারিখেও রোজা রাখব ইনশা আল্লাহ। কিন্তু সেই আগামী বছর আসার আগেই নবীজির ইন্তেকাল
হয়ে যায়। Ñসহিহ মুসলিম : ১১৩৪
সবচেয়ে উত্তম হয় ১০ তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে আগে-পরে আরও দুটি রোজা রাখা। ৯, ১০,
১১Ñমোট তিনটি রোজা রাখা। কারণ মহররম মাসব্যাপী রোজার কথা তো সহিহ হাদিসেই আছে। এতো
গেল আশুরার দিনের গুরুত্ব, প্রেক্ষাপট ও আমলের কথা। তবে এটা ঠিক, আশুরার দিনে পৃথিবীর
ইতিহাসে নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ঐতিহাসিক এসব ঘটনার মধ্যে কিছু কল্যাণকর
আবার কিছু ঘটনা অকল্যাণকর বটে। কিছু ঘটনা আনন্দের, কিছু ঘটনা বেদনাবিধুর। সবকিছু মিলিয়ে
মুসলিম জীবনে আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
তবে আশুরার রোজার সঙ্গে, আশুরার তাৎপর্যের সঙ্গে হজরত হোসাইন (রা.)-এর জন্ম বা মৃত্যুর
কোনো সম্পর্ক নেই। হজরত হোসাইন (রা.)-এর জন্ম মদিনায় চতুর্থ হিজরিতে এবং শাহাদাতবরণ
করেন ইরাকের কুফার নিকটবর্তী কারবালায় ৬১ হিজরিতে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের
৫০ বছর পরে।
ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু কারবালার এ দুঃখজনক ঘটনাকে
আশুরার মূল ঘটনা বানিয়ে ফেলা নিতান্তই বোকামি। আমরা বর্তমানে আধুনিক সমাজে বসবাস করছি।
বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক সমাজের সবকিছু হাতের মুঠোয়। ইচ্ছা করলেই সবকিছু
সহজে করা যায়। এ বিষয়ে একটু খোঁজখবর বা অনুসন্ধান জরুরি। সমাজজীবনে অনেকে আশুরা সামনে
রেখে নানা রকম কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সেসব কর্মসূচি ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। এসবে
অর্থ ও সময় অপচয় করা হয়। অনেক সময় তা জীবননাশের উপলক্ষও তৈরি করে। বিশেষ করে শোকগাথা
এবং নিজের শরীর রক্তাক্ত করা ইত্যাদি। এসব কর্মসূচি বড় ধরনের কুপ্রথা। এ সম্পর্কে নবী
কারিম (সা.) বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, যারা বুক চাপড়ায়, কাপড় ছেঁড়ে
এবং জাহেলি যুগের কথাবার্তা বলে।’ Ñসহিহ বোখারি : ১৭২ নবী কারিম (সা.) আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই
চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না, যা আমাদের
রবের কাছে অপছন্দনীয়।’ Ñসহিহ বোখারি : ১৩০৩
অনেকে আবার মহররম মাসে ও আশুরার দিনে বিয়েশাদি করা থেকে বিরত থাকেন। এটাও অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার। এগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। মুসলমানের কর্তব্য হলো আশুরার দিনে মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা। সব ধরনের কুসংস্কার ও কুপ্রথা থেকে সজাগ থাকা। কখনোই ইসলামবিরোধী নীতিমালা অনুসরণ না করা। সর্বদা কুরআন-হাদিস ও নবী কারিম (সা.)-এর কর্ম ও নীতিমালা অনুসরণ করা। নবীর শিক্ষায় অটল থাকা। সে শিক্ষার আলোকে জীবন যাপন করা। এটাই আশুরা দিবসের একান্ত কামনা।