সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১৫:০১ পিএম
‘ধারদেনার জটিল চক্রে প্রবাসীদের নিঃস্ব জীবন’ শিরোনামে ১৪ জুলাই
প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেদনের সংবাদটি আমাদের বিষণ্ন করে। খবরটি পাঠে আমরা
উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। আমাদের বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতার পেছনে রয়েছে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের
দুঃখগাথা। আমরা সবাই জানি, একশ্রেণির দুর্বৃত্ত প্রবাসী শ্রমিকের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে
তাদের শোষণ-নিপীড়ন করে। এ নিয়ে কথাবার্তাও কম হয়নি। কিন্তু তাতে করে প্রবাসী শ্রমিকের
হয়রানি, তাদের দুঃখের পাল্লাও হালকা হয়নি। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রবাসে শ্রমিক
পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত যেসব এজেন্সি, তাদের অধিকাংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের। অন্য
দেশের তুলনায় আমাদের শ্রমিকদের বিদেশযাত্রার খরচও বেশি। কারণ, কয়েক দফা দালালচক্রের
খপ্পরে পড়ে তাদের খরচ বাড়ছে। আবার সরকারি নিয়মেও একজন শ্রমিকের বিপুল অর্থ খরচের বিষয়টিও
আমাদের নজর এড়ায় না। সেই সঙ্গে প্রবাসে যাত্রাপথে, কর্মস্থলে বিপদের শঙ্কাও রয়েছে।
যেকোনো ধরনের সামান্য বিপদেই একজন শ্রমিকের পুরো পরিবারের নিঃস্ব হয়ে পড়ার ঘটনাও অনেক।
অথচ যারা শ্রম বিক্রির জন্য প্রবাসে যান, তাদের আইনগত সহায়তা দেওয়ার
জন্য আমাদের প্রচলিত আইনেও সুরক্ষাকবচ কম নেই। কিন্তু সেই সুরক্ষাকবচের ব্যবহার কি
যথাযথভাবে হয়? হয়েছে? হয়নি বলেই এখনও দেখতে হয় প্রবাসী শ্রমিকদের কান্না, তাদের দুর্দশার
খবরে ভারী হয় সংবাদমাধ্যম। বিদেশে যারা কাজের জন্য যান, আইন অনুসারে তাদের নিয়োগের
জন্যও রয়েছে শর্তাবলি। কিন্তু দেশ থেকে যারা শ্রমিক পাঠান তারা অথবা নিয়োগকারী সংস্থাগুলো
দায়বদ্ধ হলেও যথাযথ শর্ত মেনে শ্রমিক নেওয়া হয় কি-না তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়গুলো
দেখভাল করার দায়িত্ব যাদের, তারাও সে দায়িত্ব পালনে কতটুকু আন্তরিকÑ সে প্রশ্নও রয়েছে।
অসৎ ঠিকাদার ও দালালচক্রের খপ্পর থেকে তাই আমাদের শ্রমিকদের মুক্তি মেলে না। তাদের
সুরক্ষার বিষয়গুলোও উপেক্ষিতই থাকে।
দালালচক্রের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসার পথও যে রুদ্ধ, সেই ভয়ংকর বিষয়টিও
উঠে এসেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনে। সাধারণত শ্রমিকদের ভিসা সংগ্রহের পর বাংলাদেশ
এম্বাসি থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। সেখানে প্রক্রিয়াটি এতই জটিল যে, দালাল ছাড়া কাজ হয়
না। আর প্রতি পদেই দালালচক্র নানা অসিলায় টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে প্রবাসে যেতে আমাদের
শ্রমিকদের নির্ধারিত অঙ্কের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা খরচ হয়। দালালদের এই অচ্ছেদ্য
চক্র ভাঙাও যে কঠিন, তা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং
এজেন্সির (বায়রা) সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার চৌধুরীও। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন,
‘বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানি খাতে যে দালালপ্রথা দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে তা থেকে বের
হয়ে আসা কঠিন।’ বায়রা সম্পাদকের এই উপলব্ধি যেমন পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি
এ থেকে কোনো শুভ ইঙ্গিতও মেলে না।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শ্রমিকরা কেউই দেশ দেখার শখে ঘর ছাড়েন
না। দেশে যথেষ্ট কাজের ক্ষেত্র না থাকা এবং পরিশ্রমে যে মজুরি জোটেÑতা যথেষ্ট নয় বলেই
শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন ও দেশ ছেড়ে ভিনদেশের উদ্দেশে পা বাড়ান। তাদের আমরা বলছি ‘রেমিট্যান্স
যোদ্ধা’। এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের শ্রমে-ঘামেই সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ। অথচ তারাই নানাভাবে অবহেলিত। বিদেশে যাওয়া-আসার পথে তারা দেশের ইমিগ্রেশনেই
নানান হয়রানি-ভোগান্তি ও দুর্ভোগের শিকার হন। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সেসব কথাও কারও
অজানা নয়। বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোর বিরুদ্ধেও তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা না করার অভিযোগও
নতুন নয়।
প্রবাসী শ্রমিককে নিরাপত্তা ও স্বার্থরক্ষার যেসব ব্যবস্থা আইন রয়েছে,
আমাদের প্রশ্নÑ সেগুলো কি মানা হয়? শ্রমিকদের দেখভালের জন্য দায়িত্ব রয়েছে দূতাবাসগুলোরও।
সেই দায়িত্বও কি পালন হয় যথাযথভাবে? শ্রমিকরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা কি দূতাবাসগুলো থেকে
পান? এসব নিয়েও তো বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমেই নানা সময়ে পাহাড়সম প্রতিবেদন
প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু আমরা অভিযোগ উত্থাপনের কথাই জেনেছি, তার সুষ্ঠু সমাধানের কথা
জানি না। জানি না, কারণ, সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি বা হলেও এমন দায়সারাভাবে হয়েছে, যা
প্রবাসী শ্রমিকদের আদতে কোনো উপকারেই আসেনি। আমাদের স্মরণে আছে ১ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশের
শিরোনাম ছিল, ‘মালয়েশিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন চুরমার হাজারো কর্মীর।’ আমাদের শ্রমবাজারের
অমিত সম্ভাবনা ভেঙে দেওয়ার ওই খবর শুধু উদ্বেগজনকই ছিল না, একই সঙ্গে আমাদের ক্ষুব্ধও
করেছিল। ৩১ মে রাত থেকে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ায় আমাদের শ্রমবাজারের দরজা। রিক্রুটিং
এজেন্সিগুলোর দুর্নীতি এবং তাদের সিন্ডিকেট চক্রের জন্য মার্চ মাসেই মালয়েশিয়া সরকার
জানিয়েছিল, তারা আপাতত বাংলাদেশ থেকে আর শ্রমিক নেবে না। তবে যারা ইতোমধ্যে অনুমোদন
পেয়েছেন, ভিসা পেয়েছেন, তাদের ৩১ মের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ঢুকতে হবে। বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ
ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েও ছিল। কিন্তু এজেন্সিগুলো
সেদিকে নজর দেয়নি, তারা কোনো উদ্যোগও নেয়নি। তারা নিজেদের স্বার্থের বাইরে দেশ ও শ্রমিকদের
স্বার্থ দেখেনি। ফলে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে মালয়েশিয়াগামী প্রায় ৩২ হাজার শ্রমিকের
জীবনে তৈরি হয় বিপর্যস্ততার নজির। সহায়-সম্বল বিক্রি করে মালয়েশিয়া যেতে চাওয়া এই শ্রমিকদের
যে কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়, তার কি কোনো প্রতিবিধান হয়েছে? আমাদের সামনে কিন্তু
সে উদাহরণ নেই। এই ঘটনায় কারও শাস্তি হয়েছে, তাও জানা নেই।
আমরা মনে করি, তাই প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে
উত্থাপিত সকল বিষয়েই সরকারকে ভাবতে হবে। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট
দূতাবাসগুলোকেও আন্তরিক হতে হবে। শুধু মুখের কথায় নয়, প্রকৃতপ্রস্তাবেই রেমিট্যান্স
যোদ্ধাদের সম্মান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসে শ্রমিকরা যেন অসহায় হয়ে না পড়েন, সেজন্য
সংশ্লিষ্টদের ওপর সরকারকে চাপ বজায় রাখতে হবে। শ্রমিকরা যেন দালালের খপ্পরে না পড়েন,
তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করা; শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট দেশে
আমাদের দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যোগসূত্র বজায় রাখার কাজটিও
করতে হবে। প্রবাসী শ্রমিক, আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা নিজের শ্রম বিক্রি করতে গিয়েও
দালালদের খপ্পরে পড়ে আর্থিক ক্ষতি ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন তা মেনে
নেওয়া যায় না। সেই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে প্রবাসীরা নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতিতে কাজ করবেন,
প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকিতে থাকবেনÑএই সমীকরণও ভাঙতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তার প্রশ্নে
কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের অধিকারের প্রশ্নটি সামনে রেখেই জনশক্তি রপ্তানিতে
সিন্ডিকেট ও দালালমুক্ত করতে সরকারকে কঠোর হতে হবে।