× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিপন্ন হালদা

মনুষ্যসৃষ্ট অপরিনামদর্শিতার অভিঘাত

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১৪:৫৭ পিএম

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

২০১৭ সালে তৌকীর আহমেদ ‘হালদা’ নামে একটি সিনেমা পরিচালনা করেছিলেন, যেখানে দেখানো হয়েছিল হালদা নদীর দূষণ আর হালদার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শত শত জেলের দুঃখীজীবনের দৃশ্য। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৭ বছর। জেলেদের কান্না এখনও থামেনি। থামেনি নদীর কান্নাও। হালদা বাংলাদেশের পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। এটি খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম জেলায় পড়েছে। এর দৈর্ঘ্য ১০৬ কিলোমিটার, প্রস্থ ১৩৪ মিটার। এ নদীটি দেখতে সর্পিলাকার। হালদা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। এ নদীতে জোয়ারভাটা ঘটে। মিঠা পানির মাছেরা এ নদীতে ডিম ছাড়ে। হালদা পৃথিবীর একমাত্র জোয়ারভাটার নদী যেখানে কার্পজাতীয় মাছ যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ ডিম পাড়ে। সে ডিম সংগ্রহ করা হয়। পৃথিবীর আর কোথাও এমন নদী নেই, যেখান থেকে মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়।

এটি একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র যেখানে রুই বা কার্প জাতীয় মাছ ডিম পাড়ে আর তা সংগ্রহ করে জেলেরা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এপ্রিল, মে, জুনÑএ তিন মাসের যেকোনো সময় এ মা মাছেরা ডিম ছাড়ে। হালদা রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি ভারতীয় অঞ্চলের কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হওয়ায় হাজার হাজার জেলে এখান থেকে ডিম ও পোনা সংগ্রহ করে। সেগুলো পরে তারা বিক্রি করে। এ পোনা থেকেই আমরা বড় বড় রুই, কাতলা, মৃগেল পেয়ে থাকি। অন্যভাবে বলতে গেলে, হালদার কারণেই কোটি কোটি বাঙালির আমিষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ধারণা করা হয়, হালদা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখছে। হালদা রিসার্চ অ্যান্ড ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে হালদা থেকে ১৮ হাজার কেজি কার্পজাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়।

হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ডলফিন পাওয়া গেছে ১৬৭টি, ২০২০ সালে ১২৭টি। গাঙ্গেয় ডলফিন পৃথিবীর বিপন্ন প্রজাতির একটি। পৃথিবীতে এর সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ১০০। এর মধ্যে হালদায় রয়েছে ১৭০টি। আরেকটি বড় বিষয় বলতে গেলে চট্টগ্রামের একমাত্র সুপেয় পানির উৎস হালদা নদী। এখান থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ওয়াসা ১৮ কোটি লিটার পানি সংগ্রহ করে; যা ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচায়। অথচ এ নদীকে সইতে হচ্ছে কত অত্যাচার! এর বুকে এর আগে রাবার ড্যাম বসানো হয়েছে। নদীর পারে গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা। সেখানকার বর্জ্য এসে পড়ছে নদীতে। হাঁস-মুরগির খামার করা হচ্ছে। ডলফিনের অন্যতম আবাসস্থল হালদা হলেও দূষণের কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে এর সংখ্যা। নদীর পানিপ্রবাহ যেমন কমে যাচ্ছে, তেমন পানির স্তরও নেমে যাচ্ছে নিচে। একটি তথ্যমতে, হালদায় নানা রকম বর্জ্য ফেলার কারণে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। হালদার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ থাকে অন্তত ৫ মিলিগ্রাম। এর আগে কখনও কখনও এটি ০.২১ থেকে ১ মিলিগ্রামও দেখা গেছে।

সম্প্রতি আবারও অক্সিজেনের পরিমাণ লিটারে ৩.৬ মিলিগ্রামে নেমে এসেছে। এ ছাড়া কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর আগে পরীক্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে আ্যামোনিয়ার পরিমাণও ১০০ গুণ বেশি দেখা গিয়েছিল। ফলে জলজ বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ছে। মারা যাচ্ছে মা মাছ ও ডলফিন। হালদা নদী থেকে ২০১৬ সালে একেবারেই ডিম সংগ্রহ করা যায়নি। কেন ও কীভাবে দূষিত হচ্ছে এ হালদা? ২০২৪ সালে এসে আবার কেন মৃত্যুর মিছিল? কেন মৃত্যু থামছেই না হালদার মা মাছ ও ডলফিনের? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী ও খালের সংযুক্ত স্থলে পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে, সেগুলো কালো রঙ ধারণ করেছে। কারখানার কালো পানি কাটাখালী, খন্দকিয়া ও কৃষ্ণ খাল হয়ে হালদায় মিশে এ দূষণ ঘটাচ্ছে। পোল্ট্রি, গৃহস্থালি, শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে এসে পড়ছে বলেই পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে ড্রেজারের আঘাতেও অনেক ডলফিন মারা যায় বলে খবরে প্রকাশ।

হালদা বাঁচানোর জন্য চেষ্টাও কম হয়নি। ২০২০ সালে এটিকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেখানকার মাছ ও জলজ প্রাণী শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে হাইকোর্ট হালদা নদী রক্ষায় একটি কমিটিও গঠন করে দেয়। তাতেও ঠেকানো যাচ্ছে না কারেন্ট জালের ব্যবহার। হালদাকে বাঁচানোর জন্য হাটহাজারীতে ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ করা হয়। এশিয়ান পেপার মিল বন্ধ করা হয়। নদীরক্ষায় চারপাশে আটটি সিসি ক্যামেরা বসানো হলে বেশ কাজে দিলেও কিছু ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য আগের মতোই মাছ নিধন চলছে। ক্যামেরাগুলো বসানো হয়েছিল ২০২১ সালে। নৌপুলিশ এ ক্যামেরা বসিয়েছিল। এগুলো দিয়ে নজরদারি করা যেত প্রায় ১০ কিলোমিটার। ক্যামেরায় কোনো কিছু নজরে এলেই স্পিডবোট দিয়ে পুলিশ অভিযান চালাত। এতে মাছ নিধন, বালু উত্তোলন এসব বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালে ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডিম সংগ্রহ করা হয়। সম্ভবত এসব উদ্যোগের কারণেই তা সম্ভব হয়েছিল।

এখন হালদায় আবারও মা মাছের মৃত্যু দেখা যাচ্ছে। জুন শেষ হলেও এখনও মা মাছ ডিম ছাড়েনি। এ ছাড়া ডলফিনও মারা যাচ্ছে। একটি তথ্যমতে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪১টি ডলফিনের মৃত্য হয়েছে। এ ছাড়া ২৫ থেকে ৩০টি বড় মা মাছের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা এর কারণ হিসেবে দূষণকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, কয়েকটি খাল হয়ে নগরের বর্জ্য হালদায় পড়ছে। এ ছাড়া বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বেশি হওয়ায় বিষের প্রয়োগেও মা মাছের মৃত্যু ঘটছে। হালদায় ভালো পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

  • শিক্ষক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা