সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৪ ১৫:২৪ পিএম
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে সারা দেশের গ্রাহকরা কমবেশি নাকাল। বিশেষ করে
গ্যাস সংকট রাজধানীতে প্রকট হয়ে উঠেছে। বিগত প্রায় চার সপ্তাহের মধ্যে গত দু সপ্তাহে
রাজধানীবাসীকে গ্যাস সংকটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আবাসিক-বাণিজ্যিক দুই
ক্ষেত্রেই সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় একদিকে সিএনজি স্টেশনে গাড়ির সারি
দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প কারখানা। গত সপ্তাহ থেকে রাজধানীতে
লোডশেডিংয়ের মাত্রাও বেড়েছে। আমরা জানি, মফস্বলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তুলনামূলক আরও
বেশি। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের যে চিত্র ১২ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশে উঠে এসেছে, তাতে
জনঅভিযোগ প্রতিফলিত হচ্ছেÑ গ্রাহকের ভোগান্তি নিরসনের জন্য কর্তৃপক্ষের মনোযোগ যথাযথ
নয়।

গ্যাস-বিদ্যুৎ
সরবরাহ ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজন হতেই পারে, কিন্তু সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারমূলক
কাজের ক্ষেত্রে এমন সময় বেছে নিতে হবে যখন গ্রাহকের গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক
কম থাকে। অভিযোগ আছে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব
রয়েছে। বর্তমানে যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে এর মূলে রয়েছে উৎপাদন ঘাটতি। জ্বালানি
বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেনÑ সরকার গ্যাস অনুসন্ধান, আহরণ ও উত্তোলনের বিষয়গুলো
গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশ থেকে তুলনামূলক অনেক কম দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)
আমদানি করে গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি দাম নিয়ে মুনাফা করছে। বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি খাতের
সংকটের জন্য সরকারের জ্বালানিনীতি দায়ী বলেও অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ঢাকার বাইরে জেলা
শহরগুলোতে লোডশেডিং তুলনামূলক কিছু কম হলেও উপজেলা পর্যায়ে তা প্রকট রূপ নিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হামলার
খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বক্তব্যÑ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ
কম পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। গ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রায় একই পরিস্থিতি
বিরাজমান। গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাতের সিংহভাগ সময় গ্যাসের চুলাই
জ্বলছে না। এর ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমরা জানি, সিলেট
১০ (জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট) এলাকায় নতুন করে সম্প্রতি তেল-গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে।
কিন্তু অভিযোগ হচ্ছেÑ আহরণ ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকারের তরফে গুরুত্ব সেভাবে দেওয়া
হচ্ছে না। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে জনজীবনের বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থায়
যে ধাক্কা লেগেছে এরও মাশুল গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদেরই। টানা মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে বিপন্ন-বিপর্যস্থ
জনজীবনে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বাড়তি বিড়ম্বনাও সৃষ্টি করেছে। আরও অভিযোগ আছে, দেশের মানুষ
চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পেলেও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে সুবিধা আদায় করছে
একটি গোষ্ঠী। দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের গড় চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ
উৎপাদনের ক্ষেত্রে খরচ বৃদ্ধির নামে সরকার দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে চলেছে। গ্যাসের
বিষয়টিও এর বাইরে নয়।
আওয়ামী লীগ সরকার টানা চার মেয়াদের প্রথম মেয়াদেই বিদ্যুৎ উৎপাদন
বাড়ানোর ব্যাপারে যে উদ্যোগ নিয়েছিল তাতে প্রায় সব মহলই প্রশংসা করেছিল। কিন্তু কার্যত
যখন দেখা গেল বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নামে একের পর এক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র
স্থাপন করা হচ্ছে, তখনই এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমাদের বোধগম্য নয়, কেন মাসের পর মাস সরকারি
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস অবস্থায় রেখে ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা
হচ্ছে? গ্যাসের মজুদ অনুসারে যথাযথ উত্তোলন প্রক্রিয়ায় উৎপাদন বাড়ালে সংকট এত প্রকট
হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই অভিযোগও পুষ্ট, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট কাটাতে যা করণীয় ছিল সেদিকে
দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। শিল্প-বাসাবাড়িসহ পরিবহনে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে সংকট যেভাবে
দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এর বিরূপ অভিঘাত বহুমুখী হতে বাধ্য। গ্রাহকের স্বার্থরক্ষায় প্রকৃতই
মনোযোগ কতটা রয়েছে বিদ্যমান বাস্তবতা সংগতই এই প্রশ্ন দাঁড় করায়। দেশে গ্যাসের চাহিদা
গড়ে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে প্রায় ৩০০ ঘনফুট গ্যাস
সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও তা অনেকাংশেই সম্ভব হচ্ছে না। প্রাকৃতিক
দুর্যোগে কিংবা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির সময় গ্যাস লাইনে বিঘ্ন ঘটতেই পারে।
কিন্তু এর সমাধানে দ্রুত কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে নাÑ এ প্রশ্নও থেকে যায়।
আমরা মনে করি,
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ আমলে নিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ
দেওয়া জরুরি। সস্তায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি এবং কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ উৎপাদন
করে সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর ফোঁটা দেওয়ার মতো ব্যবস্থায় গ্রাহকের ভোগান্তি নিরসন সম্ভব
নয়। গত বছর গ্রাহকের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলে গ্যাসের দাম বাড়ানো
হয় গড়ে ৮০ শতাংশ। শিল্প কারখানায় বাড়ে তা প্রায় ১৭৯ শতাংশ। দাম বাড়ানোর পরও কেন সংকট
প্রকট হয়ে উঠলÑ এ প্রশ্ন রয়েছে গ্রাহকদের তরফে। আমরা জানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা-অপচয়-চুরি
ইত্যাদির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। সিস্টেম লস আরও পুরোনো ব্যাধি। নতুন গ্যাসক্ষেত্রে অনুসন্ধানে
পরিকল্পিত পরিকল্পনায় ঘাটতির বার্তাও নতুন নয়। বিগত বছরগুলোতে নিজেদের উত্তোলিত গ্যাসের
উৎপাদন না বাড়িয়ে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সংকট আরও বহুমাত্রিক হয়ে
উঠেছেÑ এ অভিযোগও বিশেষজ্ঞদেরই। সচেতন মানুষ মাত্রেই এও অজানা নয়, বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ সংকট রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। জনগুরুত্বপূর্ণ
এ বিষয়ে কোনোরকম উদাসীনতার অবকাশ নেই।
শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমলে মূল্যস্ফীতির চরম উল্লম্ফনকালে গ্যাস-বিদ্যুৎ
সংকট পরিস্থিতি যে আরও জটিল করে তুলবেÑ এ নিয়ে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। অভিঘাত লাগবে
রপ্তানিতেও। নিকট অতীতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছিলাম, জ্বালানির বিষয়ে কোনো
ধোঁয়াশা রাখলে চলবে না। কারণ, বর্তমান জমানায় শুধু উৎপাদন ব্যবস্থাই নয়, প্রাত্যহিক
জীবনযাপনের অনেক কিছুই গ্যাস-বিদ্যুৎনির্ভর হয়ে পড়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে
জরুরি হলো সংকট মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিশ্চিত করা। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট আরও
গুরুতর হয়ে ওঠার আগেই পরিস্থিতি উত্তরণে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর
নেই। জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর দায় সরকার এবং সেবা সংস্থাগুলো কোনোভাবেই এড়াতে পারে
না। সর্বাগ্রে দেখতে হবে গ্রাহকের স্বার্থ।