তৃতীয় লিঙ্গ
নাছিমা বেগম
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৪ ১৫:২০ পিএম
নাছিমা বেগম
সর্বজনীন মানবাধিকারের
দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ হিসেবে সব নাগরিকের সুযোগসুবিধা ভোগের অধিকার সমভাবে প্রাপ্য
হওয়ার কথা থাকলেও হিজড়া তথা তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জীবনে আনন্দের চেয়ে বেদনার ভাগই
বেশি। মানুষ হওয়া সত্ত্বেও জন্মের দায় নিয়ে আবহমানকাল থেকেই হিজড়া জনগোষ্ঠী অবহেলিত
ও অনগ্রসর হিসেবে পরিচিত। তাদের ‘হিজড়া’ বলে তাচ্ছিল্য করা হয়। জনসমক্ষে তাদের নিয়ে
মশকরা করা হয়। তারাও যে মানুষ, অনেকেই মনে হয় তা ভুলে যান। পরিণতিতে তারা পারিবারিক,
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। একটু বড় হলেই তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে পড়েন। তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে পরিবার থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। পিতা-মাতা,
ভাই-বোন, পরিবার-পরিজনের ভালোবাসা, আদরযত্ন তাদের ভাগ্যে জোটে না। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের
দিকে তাদের ঠেলে দেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর প্রতি সদয়
আচরণ ও তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হওয়া পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব।
এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই রাস্তাঘাটে, বাসাবাড়িতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করে থাকে। কিন্তু
কেন করে? এটি আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে তারাও মানুষ। তাদের পেটে ক্ষুধা
আছে। খাবার সংগ্রহের জন্য তাদের উপযুক্ত পেশা থাকা প্রয়োজন। উপযুক্ত পরিচর্যা ও পরিবেশ
পেলে তারাও সাধারণ নারী-পুরুষের মতো জীবনের সফলতা অর্জনের সামর্থ্য রাখে। তার বহু দৃষ্টান্তও
রয়েছে। সবার জ্ঞাতার্থে তৃতীয় লিঙ্গের একজন সফল মানুষের সংক্ষিপ্ত জীবনকথা তুলে ধরা
হলো।

কল্কি সুব্রমানিয়াম
: কল্কি সুব্রমানিয়াম হিজড়া জনগোষ্ঠীর একজন সফল প্রতিনিধি। তিনি একাধারে মানবাধিকারকর্মী,
শিল্পী, লেখক, অভিনেত্রী, সফল উদ্যোক্তা। তার বহুমুখী প্রতিভা আজ সমাজের সব মহলে আলোচিত।
আজ তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে পৌঁছাতে তার সময় যেমন লেগেছে, তেমন অনেক সাহসিকতার
পরিচয় দিতে হয়েছে। কল্কি নিজের চারপাশে তার মতো মানুষের প্রতি অন্যায়-অবিচার হতে দেখেছেন
বহুবার। তার নিজের সঙ্গেও অনেক অবিচার হয়েছে। তবে তিনি সামাজিক প্রতিকূলতার কাছে হার
মানেননি। নিপীড়নের শিকার হলেও নিজেকে কোনো দিন লুকিয়ে রাখেননি। নিজের অন্তর্নিহিত
প্রতিভা বিকশিত করেছেন, বিফলে যেতে দেননি। নিজের পাশাপাশি লড়েছেন নিজের মতো মানুষদের
জন্য।
বর্তমান বিশ্বে
লিঙ্গসমতা নিয়ে যখন সবাই সোচ্চার, তখনও এ মানুষগুলোর ভাগ্যে জোটে অনাদর-অবহেলা। ঘরে
পরিবারের কাছে, বাইরে সমাজের কাছে সর্বত্রই এক অবস্থা। তাদের একমাত্র ভরসা সামাজিক
আন্দোলন আর সে আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ তারাই যারা তাদের মতো যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতার
মুখোমুখি হয়েছেন। কল্কি সে রকমই একজন মানুষ যিনি এ জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ
করে নিজেকে সমাজকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সমগোত্রীয় অসংখ্য মানুষের জীবনে
ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়েছেন। কল্কির সৌভাগ্য যে একটি শিক্ষিত পরিবারে তার
জন্ম। বাবা-মা তাকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। লেখাপড়া শিখিয়েছেন। কল্কি প্রতিটি ক্লাসের
পরীক্ষায়ই সহপাঠীদের টপকে গেছেন। তা সত্ত্বেও তার আচরণগত মেয়েলি বৈশিষ্ট্যের কারণে
পরিবারে যেমন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন, তেমন স্কুল-কলেজে সহপাঠীদের টিপ্পনী শুনতে হয়েছে,
এমনকি শিক্ষকদের কাছ থেকেও হয়রানিমূলক নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি হাল
ছেড়ে দেননি। তিনি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এ দুটি বিষয়ে মাস্টার
ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি সমাজের চিন্তাধারা পাল্টে দেওয়ার লক্ষ্যে মাস্টার ডিগ্রি
পড়াকালেই তামিল ভাষায় হিজড়াবিষয়ক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। হিজড়াদের বিষয়ে
ভারতে এটিই প্রথম মাসিক পত্রিকা।
পরিবারের বাইরেও
কল্কির জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে। না পুরুষ-না মহিলাÑসমাজের এ দুটি স্বীকৃত লিঙ্গের কোনোটিতেই
তিনি নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে পারছিলেন না। বন্ধুমহলে তিনি ছিলেন একা। কটূক্তি শোনার পাশাপাশি
সহ্য করতে হয়েছে অসভ্য ব্যবহার। কিন্তু কল্কি নিয়তির হাতে নিজের ভাগ্য সঁপে দেওয়ার
মতো দুর্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন না। পরিবার-পরিজন, সমাজের কাছে নিজের প্রকৃত
মানবসত্তার গ্রহণযোগ্যতা নেই দেখেও কল্কি মানসিক পরাজয় স্বীকার করেননি। বরং যত অন্যায়
তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, ততই নিজেকে আরও মানসিকভাবে শক্ত করেছেন। অঙ্গীকার করেছেন লড়াই
করে এগিয়ে যাওয়ার।
বড় হয়ে কল্কি
বলেছেন, তার একাকিত্বই তাকে সাহায্য করেছিল সফল হতে। যত তিনি একা হয়ে পড়তেন, তত মন
বসাতেন নিজের পড়াশোনায়। আর যেহেতু তার পরিবারে পড়াশোনার ভালো সুযোগ ছিল, মেধাবী ছাত্রী
হিসেবে তার নামও ছিল। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য কল্কি সেসবের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন।
সাংবাদিকতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে কল্কি পরে একটি
বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি নেন।নিজে পূর্ণতা পেলেও কল্কি ভোলেননি তার মতো অসংখ্য মানুষের
কষ্টের, গ্লানিময় জীবনের কথা। আজ ভারতের অন্যতম বিখ্যাত মানবাধিকারকর্মী কল্কি। তিনি
ব্রত নিয়েছেন সেসব সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের সাহায্য করতে, তাদের মনোবল
বাড়াতে। এ মহৎ লক্ষ্যে কল্কি প্রতিষ্ঠা করেন তার নিজের সংস্থা ‘সহোদরী ফাউন্ডেশন’।
এক দশক ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের অসহায় এ মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক
ক্ষমতায়নের ওপর নিরন্তর কাজ করে চলেছে কল্কির এ প্রতিষ্ঠান।
কল্কির যশ আজ
দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে তিনি আজ নিমন্ত্রণ পান। নিজের জীবনের অনুপ্রেরণামূলক প্রেক্ষাপট বিশ্বের দরবারে
তিনি তুলে ধরছেন। ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ সালে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের ট্রান্সজেন্ডার
কমিউনিটির প্রতিনিধি হিসেবে বক্তৃতা করার আমন্ত্রণ পান। এশিয়ার মধ্যে তিনিই প্রথম
ট্রান্সজেন্ডার নারী, যিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করার গৌরব অর্জন করেন।
বক্তৃতার শুরুতে ভারতের গৌরবময় ইতিহাসের বর্ণনা করার পরে তিনি তার নিজের জীবনের ইতিহাস,
বেড়ে ওঠার গল্প বিশ্ববাসীকে জানান। ২০১৮ সালে জার্মানিতে তার চিত্রকলা প্রদর্শনীর
জন্য আমন্ত্রণ পান।কল্কি একজন প্রেরণামূলক নারী, যিনি নিরলস প্রয়াস চালাচ্ছেন অসংখ্য
অবহেলিত মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে। কিন্তু কাজটা অত সহজ না হলেও এ কঠিন
কাজ সহজ করে তোলাই হলো কল্কির মতো লৌহমানবীদের জীবনের ব্রত। আর সে কাজে তিনি যে সফল
হবেন, সেই প্রত্যাশা আমার রয়েছে।
কল্কির জীবনকথা তুলে ধরার মূল উদ্দেশ্যÑআমাদের দেশেও বেশ কিছু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এখন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। অনেকেই বিউটি পারলার দিয়ে সফলতা পেয়েছেন। গার্মেন্টসে চাকরি করছেন। কেউ কেউ স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আশার আলো দেখাচ্ছেন। বাবা-মায়ের কাছে আমার অনুরোধÑসন্তানকে সন্তান ভাবুন। আদর-স্নেহ, মায়ামমতায় উপযুক্ত পরিচর্যা করে দেখুন, অন্য সন্তানদের চেয়ে কোনো অংশেই তারা কম যোগ্য নয়। প্রতিটি সন্তানেরই জন্মগতভাবে বাবা-মার কাছে থাকার অধিকার রয়েছে। তারা যাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে জনসমাজের উপদ্রব না করে এ বিষয়ে সরকারের সতর্ক পদক্ষেপ তথা একটি সুগঠিত আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।