× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

ইউরোপের দৃষ্টি চীনের দিকে

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৪ ০৯:৩৯ এএম

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

বর্তমানের চীন বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর অন্যতম একটি শক্তি নানা দিক থেকেই। এ অবশ্য নতুন নয়, তবে বর্তমান চীন যে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক বেশি পরিপুষ্ট, তা বিদ্যমান বাস্তবতায় সাক্ষ্য মেলে। সম্প্রতি একটি বাংলা দৈনিকে ‘চীনকে ঠেকাতে ইউরোপের নতুন নেতাদের এক হতেই হবে’ শিরোনামে অনূদিত একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ওই নিবন্ধের লেখক একজন উঁচুমাপের ব্যক্তিত্ব। তিনি ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব এবং ডেনমার্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এড্রুস ফগরাসমুসেন। তার ভাষায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি দ্রুত একটি নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে যাচ্ছে। কারণ বর্তমান ব্যবস্থাপনা ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থা ও স্বার্থের সুবিধা তেমনভাবে করতে পারছে না। এই ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীনকে ঠেকানো। ইউরোপ একসময় আশা করত চীন ধীরে ধীরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বস্ত সদস্য হিসেবে ইউরোপীয় মূল্যবোধকে আয়ত্ত করে নেবে। কিন্তু ইউরোপের সেই প্রত্যাশা হোঁচট খেয়েছে।


আমরা দেখছি, ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের সমীকরণে দেশে দেশে কূটনীতির কৌশল পাল্টে যাচ্ছে। এর বাইরে আমরাও নই। যার যার পররাষ্ট্রনীতি ঠিক রেখে কিংবা কেউ কেউ কেউ কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে এই কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। চীনের বর্তমান অবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলো নতুনভাবে শুধু উদ্বিগ্নই নয়, এই প্রেক্ষাপটে তারা বিভিন্ন আঙ্গিক-কৌশলও অবলম্বন করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপর একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তি, অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে আরেক পক্ষের স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, যা ভূরাজনীতির গণ্ডির বাইরে নয়। বলা বাহুল্য, ব্যাপ্তি ও প্রসারতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অধিক শক্তিশালী। শুধু ইউরোপই নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল মার্কিন বহর যথা বাগদাদ চুক্তি (পরবর্তী স্যান্টো) এবং সিয়াটো চুক্তি। অতএব নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গটি অনেক ক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে গণচীন ১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে গণচীন জাতীয়তাবাদী চিয়াং কাইশেক চীনকে পরাজিত করে কম্যুনিস্ট চীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। চিয়াং কাইশেক কয়েক লাখ মানুষকে নিয়ে তাইওয়ান দ্বীপে আশ্রয় নেন। গণচীনকে পশ্চিমা শক্তি মেনে নেয়নি। মার্কিন অষ্টম নৌবহরের ছত্রছায়া থেকে চিয়াং কাইশেক জাতিসংঘে চল্লিশ কোটি চীনাবাসীর প্রতিনিধিত্ব করেন। অবশেষে ১৯৭১ সালে তাইওয়ান অধিষ্ঠিত হয় এবং চীন প্রকৃত চীন হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে। ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রতিনিধি ড. হেনরি কিসিঞ্জার যখন গোপনে চীন সফরে যান, তখন পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিলেন তারা দুই চীন মেনে নেবেন না। উল্লেখ্য, কিসিঞ্জারের চীনে গোপনে

যাওয়ার ব্যবস্থা পাকিস্তান করে দিয়েছিল। বিনিময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ইয়াহিয়ার বাংলাদেশে গণহত্যাকে সমর্থন জানান।

সময়ের ব্যবধানে বিগত পাঁচ দশকে বিশ্বে অনেক কিছু ঘটে গেছে, মেরুকরণের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সমীকরণও ঘটেছে। ইতোমধ্যে চীনের অভ্যন্তরেও নানা ঘাত-প্রতিঘাত ঘটেছে। অবশেষে গণচীন অভূতপূর্বভাবে সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা শুরু করে। শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে, যা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোটা বিশ্বের খনিজ সম্পদসহ কাঁচামালের প্রধান ভোক্তা গণচীন। অস্ট্রেলিয়ার কয়লারও একসময় প্রধান ক্রেতা ছিল চীন। পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই মর্মে মন্তব্যও করেছিলÑ চীন বিশ্ব অর্থনীতির চাকা। আমরা দেখেছি, খুব অল্প সময়েই চীন বিশ্বে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলো এবং আরও বলা প্রয়োজন, শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, সামরিক শক্তি হিসেবে তাদের নতুন পরিচয় মিলল। সেই চীন এখন নানা ক্ষেত্রে আরও অধিক গতিবেগে এগিয়ে চলেছে। চীনের এই অগ্রযাত্রার পেছনে তাদের নেতৃত্বের দূরদর্শিতার প্রশংসাও অনেকেই করে। অবশ্য এটা সত্য যে, নেতৃত্ব যদি বিকশিত না হয়, তাহলে যেকোনো দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার ঊর্ধ্বগতি দৃশ্যমানভাবে সাফল্যজনক হিসেবে পরিগণিত হতো না।

বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবাহে জোয়ার-ভাটা রয়েছে। বর্তমান সময়টা বৈশ্বিক অর্থনীতির সংকটকাল বলা চলে। এই সংকটের আঁচ কমবেশি আমাদের ওপরও লেগেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যকে গ্যারিকে ইস্পাত সিটি বলা হতো। ১৯৭৭ সালে দেখলাম, সেখানে ইস্পাত কারখানাগুলো খাঁ খাঁ করছে। একই অবস্থা দেখেছি বিশ্বব্যাপী কাঁটাচামচ হিসেবে পরিচিত নেফিন শহরকেও। বৈশ্বিক পরিবেশের কারণে উৎপাদনের চাকাও পরিবর্তন হয়। একে অপরের জায়গা দখল করে নেয়। চীনের সস্তা উৎপাদনকে ঠেকাতে যেকোনো রাষ্ট্রের তার সুবিধামতো ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার তো আছেই। এমন কর্মকাণ্ড যার যার কূটনৈতিক কৌশলের আওতাধীন। এ নিয়ে বলার কিছু নেই।

এক মাসব্যাপী তদন্তের পর ইউরোপিয়ান কমিশন সম্প্রতি চীন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এটাও তাদের চীনের অগ্রগতি রোধের ক্ষেত্রে একধরনের কৌশল। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা রুডিয়াম গ্লোব হিসাব-নিকাশ করে দেখিয়েছে, তাইওয়ান প্রণালিতে সংঘাত বাঁধলে তা ২০ হাজার কোটি ডলারের আর্থিক কার্যক্রমকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। এ প্রসঙ্গে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাঁখো উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘যে সংকট আমাদের নয়, সে সংকটকে আমাদের নিজেদের ঘাড়ে টেনে আনা ঠিক হবে না।’ নিঃসন্দেহে তার এই বক্তব্য জ্ঞানগর্ভ চিন্তার প্রতিফলন। চীন রাশিয়াকে এখন নানা দিকে সাহায্য করছে। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রেরই অধিকার রয়েছে তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর ভালোমন্দ বিবেচনায় নিয়ে সম্পর্কের মাত্রা নিরিখে কাজ করার। আজ বিশ্ব পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের কৌশলেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমান জমানা ১৯৫৪ সাল নয় যে ওয়াকওভার পাওয়া যাবে এবং পরমাণুশক্তি প্রয়োগ করে নিজের ধ্বংস কেউ ডেকে আনবে।

বর্তমান চীন বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই ভিন্নমাত্রার শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং এই পরিচয়ের নিরিখেই যে যার যার মতো করে চীনকে নিয়ে সমীকরণ করছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ মেরুকরণের সমীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশ যতই শক্তিশালী হোক তার মিত্রশক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা দেশটি করে থাকে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ যূথবদ্ধভাবে যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যতটা সহজ, এককভাবে শক্তিশালী হয়েও তা করা ততটা সহজ নয়। চীন বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সেই পরিস্থিতি আমলে রেখেই এগিয়ে চলেছে। চীনের এই অগ্রযাত্রা রুখতে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নতুন নতুন ছক কষছে। ভবিষ্যৎই বলে দেবে এর চূড়ান্ত পরিণতি কী।

  • বাংলাদেশের প্রথম সরকারের কর্মকর্তা ও আর্থিক খাত বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা