সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৪ ০৯:৩৫ এএম
চাকরির যেকোনো
ক্ষেত্রে নীতি বা বিধিমালা মেনে চলা অবশ্যই অপরিহার্য। যে বা যারা এর ব্যত্যয় ঘটাবেন
তারা বিধি মোতাবেক কোনো অনুকম্পা পেতে পারেন না। সরকারি চাকরিবিধিতে পাঁচ বছর পর পর
সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব দেওয়া এবং সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার বিধান থাকলেও তা কেউ মানছেন না। ৫ জুলাই প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ ও জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের
সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সচিবদের মধ্যে মতানৈক্য
দেখা দিয়েছে। হিসাব জমা দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে তাদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্কের বার্তাও
মিলেছে ওই প্রতিবেদনেই। আরও বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ কয়েকজন সচিব বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সম্পদের
হিসাব জমা দেওয়ার পক্ষপাতী হলেও অনেকেরই রয়েছে অনীহা। এই প্রেক্ষাপটে সংগতই প্রশ্ন
দাঁড়ায়, অনীহার কারণ কী?
আমরা দেখছি সরকারি
বিভিন্ন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতির বহুমাত্রিক চিত্র সংবাদমাধ্যমে
উঠে আসছে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই চিত্র এতটাই উৎকটরূপে দৃশ্যমান হয়েছে, যার বর্ণনা
দেওয়াও ভার। আমরা মনে করি, জবাবদিহির ক্ষেত্রে ঘাটতির কারণেই অনাচার-অনিয়মের পরিধি-পরিসর
ক্রমবিস্তৃত হয়ে চলেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র অঙ্গীকার রয়েছে।
অনিয়ম-দুর্নীতিতে যাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িয়ে না পড়েন এজন্য বেতন কাঠামোয়
পরিবর্তনও আনা হয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল, বেতন-ভাতা বাড়লে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
দুর্নীতির প্রবণতা হ্রাস পাবে। কিন্তু অসাধুদের দুর্নীতি-ব্যাধির উপশম ঘটেনি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল কিংবা সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিধান রেখে যে আচরণবিধি তৈরি হয়েছিল তা কেন মানা হচ্ছে নাÑ এটি
অবশ্যই গুরুতর প্রশ্ন। সম্প্রতি সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে শুদ্ধাচার ও সুশাসন নিশ্চিত
করাসহ চারটি বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে তাতে আরও অনেক প্রশ্নেরই
জন্ম দেয়। আমরা মনে করি, নৈতিকভাবে বলীয়ান কিংবা শুদ্ধাচারী কারোরই জবাবদিহির ক্ষেত্রে
অনীহা থাকার কথা নয়। অন্যদিকে এ ব্যাপারে যারাই অনীহা দেখাবেন তাদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ
না হয়ে পারে না। সরকারি কর্মকর্তারা যদি চাকরির আচরণবিধির ব্যত্যয় ঘটান তাহলে সাধারণ
কর্মচারীরা উৎসাহিত হবেনÑ এটাই স্বাভাবিক। আমরা বিশ্বাস করি, জনপ্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই
নিষ্ঠাবান, সৎ, দায়িত্ববান অনেকেই আছেন, যারা মনেপ্রাণেই ধারণ করেন ন্যায়ানুগ স্বচ্ছতা।
কিন্তু যারা অস্বচ্ছ কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তাদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত
হওয়া কিংবা করা সহজ বিষয় নয়, এরও অনেক নজির রয়েছে। আমরা মনে করি, সরকারি চাকরিবিধি
লঙ্ঘনে কিংবা নিয়মনীতি উপেক্ষা করা দায়িত্বশীল কারোরই কোনো অবকাশ নেই।
ইতঃপূর্বে জনপ্রশাসন
মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠিয়ে চাকরিবিধিমালা কার্যকর করার জন্য সরকারের সব মন্ত্রণালয়
ও বিভাগে যে তাগিদ দেওয়া হয় তা স্বচ্ছতার নিরিখে সরকারের অঙ্গীকারেরই প্রতিপালন বলে
আমরা মনে করি। নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল করা যেমন নিঃসন্দেহে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তেমনি সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি
নেওয়া অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
আইন-জবাবদিহির
ঊর্ধ্বে কেউই থাকতে পারেন না। যারা সম্পদের হিসাব নেবেন এবং হিসাব দেবেন উভয় পক্ষেরই
সব ক্ষেত্রে নিষ্ঠার বিষয়টিও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের স্মরণে আছে, ২০১৯ সালে
ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী তার মন্ত্রণালয়ের
চাকরিজীবীদের জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অনেকদূর এগিয়েছিলেনও
বটে। তবে আমরা এও মনে করি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ যতই প্রশংসিত হোক
না কেন তা খণ্ডিত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল ও সম্পত্তি
কেনাবেচার ক্ষেত্রে কেন আচরণ বিধিমালার প্রতিপালন হচ্ছে না এর উৎসে নজর দেওয়া জরুরি।
আমাদের আরও স্মরণে
আছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিলÑ মন্ত্রী-সংসদ সদস্যসহ
সব জনপ্রতিনিধি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
তখন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সর্বাগ্রে এর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
বাকি যারা করেননি আমরা মনে করি, তারা নির্বাচনী অঙ্গীকারের বরখেলাপ করেছেন। গণতান্ত্রিক
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন নিশ্চয়ই
গর্হিত বিষয়। আমরা আরও মনে করি, স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে
সবকিছু জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে দেওয়া বার্ষিক আয়কর রিটার্ন থেকে নেওয়ার বিষয়ের কথার পরিপ্রেক্ষিতে
অতীতে নানা মহলে এও আলোচনায় এসেছিল, এ উদ্যোগ অর্থহীন। জবাবদিহি যদি না থাকে তাহলে
দুর্নীতিগ্রস্তরা পার পেয়ে যাবেন এবং তাদের অনুসরণে আরও কেউ কেউ উৎসাহিত হতে পারেনÑ
এই যুক্তি মোটেও অমূলক নয়। বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে
প্রশ্নের মুখে পড়বে যদি দায়িত্বশীল যেকোনো কারও কর্মকাণ্ড নিয়ে লুকোচুরি হয়।
উচ্চমাত্রার দুর্নীতি
কমাতে সরকারি চাকরিজীবীদের কাছ থেকে প্রতি বছর সম্পদের হিসাব নেওয়া এবং তা নিয়মিত হালনাগাদ
করতে সরকারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নিকট অতীতেও পরামর্শ দিয়েছে। দেশের
দুর্নীতি কমাতে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক কিংবা অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শ
মোটেও প্রীতিকর বিষয় নয়। তাতে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সরকার যদি নিজে থেকে তাদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি পূরণে দৃঢ় থাকে তাহলে বাইরের কেউ এ
ধরনের পরামর্শ দেওয়ার অবকাশ পাবে না। আমাদের নিজেদের স্বার্থ ও প্রয়োজনেই জনগুরুত্বপূর্ণ
এই কাজগুলো সম্পাদন করা উচিত। ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ এমনটি আমাদের অনেকক্ষেত্রেই
দৃশ্যমান। আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারিসহ জনপ্রশাসনে মতিউরদের আর্বিভাব নিঃসন্দেহে অত্যন্ত
ঘৃণ্য। জনগণের সম্পদ যারা লুটপাট করে নিজেদের পকেট স্ফীত করেছেন কিংবা করছেন তারা কোনোভাবেই
দেশ-জাতির মিত্র হতে পারেন না।
সর্বাগ্রে জরুরি
আইনের শাসন নিশ্চিত করা। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ ব্যাপারে কোনো রকম উদাসীনতা কিংবা কালক্ষেপণের
সময় নেই। সংবাদমাধ্যমসহ নানা মহল থেকে দুর্নীতির বিষয়ে সরকারকে বারবার সতর্ক করা হলেও
নীতিনির্ধারকরা বিষয়গুলো যথাযথভাবে আমলে নিচ্ছেন না। দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও সমাজ প্রতিষ্ঠায়
সরকারের আন্তরিকতায় ঘাটতি আছে তা আমরা বলি না বটে, কিন্তু কৌশলের ক্ষেত্রে আরও নির্মোহ
ও কঠোর অবস্থান নেওয়ার তাগিদ আমরা দেই।