× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

নৈতিকতা-মানবিকতার সংকট

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১৩:৪৮ পিএম

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১৪:৩৭ পিএম

নৈতিকতা-মানবিকতার সংকট

ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ দিয়ে সংগত কারণেই লেখাটি শুরু করতে হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই ডাক্তার। অনেক অগ্রজ-অনুজ বন্ধু-শুভার্থীও আছেন ডাক্তার। তারপরও অত্যন্ত খেদের সঙ্গে দায়িত্ব নিয়েই বলছি, দেশের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে পরিচিত-খ্যাত (বরং বলি তথাকথিত বিশেষজ্ঞ) তাদের একটা অংশ দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী, রোগীর অসহায়ত্বকে মুঠোবন্দি করে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী, ভুল রোগ নির্ণয়কারী, অনাচারী-দুরাচারী-কদাচারী এবং আচারব্যবহারে মূর্তিমান আতঙ্ক। দূর দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম, প্রতিবেশী ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সেখানকার ডাক্তারদের কাছে আমার মতো অনেকেরই শুনতে হয়েছে এবং হচ্ছে, ‘ওরা কি ডাক্তার’ ? সবচেয়ে বড় কথা আমাদের এই তথাকথিত ডাক্তার মহোদয়রা নির্দয় ও আচার-ব্যবহারে অসংযমী। আমার স্ত্রীর বন্ধু পেশায় সাংবাদিক একজনকে সম্প্রতি ঢাকার একটি বেসরকারি হসপিটালে কথিত এক বড় ডাক্তারের নির্দয় ব্যবহারের পাশাপাশি তার ভুলের বৃত্তে পড়তে হলো। ওই সাংবাদিক পরে ভারতীয় একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে বুঝতে পারলেন তাকে চিকিৎসার নামে কীভাবে অতঙ্কগ্রস্ত করে অর্ধেক মেরে ফেলা হয়েছে। স্ত্রীর ওই বন্ধু উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন । তার জন্য শুভকামনা।  

আমার স্ত্রীকে কথিত বিশেষজ্ঞরা মৃত্যুর দরজায় ঠেলে দিয়েছিলেন ভুল রোগনির্ণয় ও চিকিৎসায়। বিপন্ন-বিপর্যস্ত অবস্থায় তাকে ভারতে (কলকাতা) নিয়ে গিয়ে প্রথমেই শুনলাম আমাদের বিশেষজ্ঞ ওই ডাক্তারদের ভুলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার কথা। কলকাতা হার্ট ক্লিনিক এন্ড হসপিটালের আমার স্ত্রীর প্রধান ডাক্তার বললেন, ‘যে ভয় নিয়ে এসেছেন এর কিছুই দেখছি না। রোগীর মূল সমস্যার দিকে নজর না দিয়েই একের পর এক পরীক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। আশা করছি উনার সমস্যার সমাধান হবে সহজেই।’ হলোও তা-ই । আমার স্ত্রী এখন সুস্থ। সে আমাকে বলে , ‘ঢাকায় ডাক্তার দেখানোর আগেই তো ভালো ছিলাম।’ 

আমাদের দেশে অনেক মহতী ডাক্তার আছেন, যাদের সামনে দাঁড়ালে কিংবা নাম উচ্চারণে শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে। সত্যিকার অর্থেই তারা অনেক বড় মাপের ডাক্তার ও মানুষ। কিন্তু তাদের সংখ্যা অসংখ্য নয়। তারা নিশ্চয় আমাদের নমস্য-প্রণম্য। তাদেরই একজন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাক্তার সামন্ত লাল সেন। এমন সামন্ত লাল সেন আরও আছেন। যেমন- ডা. ইব্রাহীম, ডা. নূরুল ইসলাম, ডা. কামরুল হাসান খান, ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, ডা. মুনতাসীর কবির, ডা. এবিএম আবদুল্লাহ, ডা. কাদেরী, ডা. দ্বীন মোহাম্মদ, ডা. এম আর খান, ডা. বিগ্রেডিয়ার (অব.) মালেক, ডা. বরেন চক্রবর্তী, ডা. এখলাসুর রহমান, ডা. হরিপদ রায়, ডা. কর্নেল (অব.) মোশাহিদ ঠাকুর প্রমুখ। কিন্তু দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অনুপাতে তাদের সংখ্যা সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো। আর এজন্যই বিপত্তি কাটছে না। ওই কথিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ঢাকা তো বটেই, দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে রমরমা কমিশন বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। তাদের মতোদের হাতেই খৎনার মতো খুব সাধারণ ব্যাপারেও অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। অন্য বিষয়গুলো নাইবা বললাম। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাক্তার সেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক সার্জন সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন, যেটি এশিয়ার দগ্ধ রোগীদের অন্যতম চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ইতোমধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছে। ডা. সেন প্রতিষ্ঠানটিকে শ্রমে-ঘামে-চিন্তায় এবং কর্মদক্ষতায় একটি দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতে যে ভূমিকা পালন করেছেন, এর জন্য তিনি নিশ্চয়ই জনমনে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার মতো একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে গত ১৪ জানুয়ারি  ২০২৪ তারিখ প্রথম কার্যদিবসে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা যদি সবাই সিরিয়াসলি কাজ করি, অসম্ভব কিছু না। পাঁচ থেকে পাঁচশ বেডে (বার্ন ইউনিট) আসতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। আমি অনেকের কাছে গেছি প্রথম প্রথম। আমাকে অনেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং ফাইল ছুড়ে মেরেছেন, এ-রকম ঘটনাও আমার আছে। কিন্তু আমি ধৈর্য ধরে আসছি এবং সবার সহযোগিতা পেয়েই এ জায়গায় আসছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি চেষ্টা করব। ওটা করতে পারলে ঢাকা শহরের ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হবে না। আমি প্রত্যেকটা হাসপাতালে যাব, কী কী সমস্যা আছে জানব। তারপর আমি একটা কর্মপরিকল্পনা করব। একটি মেডিকেল কলেজ খুললেই হবে না, সেখানে চিকিৎসা লাগবে। আমি সব বিষয় দেখব। গ্রামে ডাক্তার কেন থাকে না, তার কারণ বের করতে হবে। আমি চেষ্টা করব দুর্নীতি নিয়ে জিরো টলারেন্সে থাকতে। আমি আগের মতোই থাকব, আমাকে একটু উপদেশ দেবেন। আপনাদের উপদেশ পেলে নির্ধারিতভাবে কাজ করতে পারব।’ ডা. সামন্ত লাল সেনের দীর্ঘ বক্তব্য এই লেখায় উদ্ধৃত করার কারণ, একজন প্রবীণের নবপ্রত্যয়ে আশান্বিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে।

ঢাকার দৃষ্টিনন্দন বেসকারি অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রেই চিকিৎসার নামে যে কদর্য বাণিজ্য চলছে তা কতটা উৎকটÑ এ একমাত্র ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। ঢাকার বাইরের চিত্র আরও বেশি মর্মস্পর্শী। সংবাদমাধ্যমের সূত্রের বরাত দিয়ে বলছি, গত অর্থবছরে প্রতিবেশী ভারতে বাংলাদেশ থেকে মেডিকেল ভিসা নিয়েছেন ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭০ জন। আর দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশ থেকে ভারতে সমসময়ে চিকিৎসা নিতে গেছেন যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা থেকে ১,৪৩২ জন, মিয়ানমারের ৩,০১৯ জন, মালদ্বীপের ১,৬৪৫ জন এবং পাকিস্তানের ৭৬ জন। বাংলাদেশ থেকে রোগীরা মূলত চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা এবং দিল্লিতে চিকিৎসা করান। অনেকেই নিজ দেশে ব্যর্থ হয়ে বিদেশে যান।

এই অঞ্চলের অন্য যেসব দেশ থেকে রোগীরা ভারতে গেছেন বা যাচ্ছেন সেই দেশগুলো কি বাংলাদেশ থেকে খুব উন্নত। নিশ্চয় নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেন এত বিবর্ণ? প্রশ্নটির উত্তর সচেতন কারও কাছেই কঠিন কিছু নয়। প্রতি বছর কত টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে শুধু চিকিৎসার কারণে এর সমীকরণও জটিল নয়। দেশের বড় কয়েকটি হাসপাতালে ইতঃপূর্বে লাশ আটকে রেখে টাকা আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। দেশের ওষুধের বাজারেও চলছে নৈরাজ্য। নকল-ভেজাল ওষুধের ছড়াছড়ি। গত করোনা-দুর্যোগে দেশের স্বাস্থ্য খাতের কদর্যতা দেশের মানুষ আরও ভয়াবহভাবে জেনেছে সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে। দেশের স্বাস্থ্য খাতে ক্ষতের ওপর ক্ষত, যার উপশম এত সহজ নয়। রোগ ও রোগী নিয়ে এমন নৈরাজ্য বিশ্বের অনেক দেশেই অচিন্তনীয়। জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা-সুশাসনের ঘাটতি এজন্য সর্বাংশে দায়ী। 

যাদের একটু সামর্থ্য আছে তারাই চিকিৎসা করতে বাইরে চলে যান। অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তাই দেশে চিকিৎসা করান না। কেন এবং কীভাবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি এত অনাস্থা জন্মাল? এর দায় কার? চিকিৎসাব্যবস্থা কেন্দ্রিক রক্তস্নাত বাংলাদেশে কেন অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে? এতকিছুর পরও কেন যথাযথ প্রতিবিধান হয় না, দেশের গুরুত্বপূর্ণরাই যদি দেশের চিকিৎসা বা চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা না রাখেন তাহলে সাধারণ মানুষ ভরসা রাখবে কি করে? সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন সারিবদ্ধ তেমনি সমান্তরালে রয়েছে জনপ্রত্যাশাও। ধারাবাহিক তিন মেয়াদের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সন্দেহাতীতভাবে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য দৃশ্যমান করতে সক্ষম হয়। চতুর্থ মেয়াদেও তাদের অনেক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি এই সত্যও কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না, দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র অঙ্গীকার সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুফল দৃশ্যমান করা যায়নি। সমাজে বৈষম্য ও অনিয়ম যে হারে বাড়ছে এমন প্রেক্ষাপটে সরকারকে চ্যালেঞ্জজয়ী হতে হলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানেই সরকার নয়, পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী কমিটি নিয়েই তার সরকার। যদি সুশাসন নিশ্চিত হয় তাহলে জনপ্রত্যাশা অনেকাংশেই পূরণ হবে। সুশাসন ব্যতিরেকে সুফলের আশা দুরাশারই নামান্তর। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বরাবর আবেদন, খাদের কিনারে দাঁড়ানো দেশের স্বাস্থ্য খাত উদ্ধার করুন। মানুষ বড় অসহায়। মানুষ কাঁদছে, আপনারা মানুষের পাশে দাঁড়ান। নিশ্চয় স্বাস্থ্য খাতের এই ব্যাধিগুলো আপনার / আপনাদের অজানা নয়। জীবন নিয়ে যারা জুয়া খেলছেন তাদের প্রতি কোনো অনুকম্পা দেখাবেন না। তারা নিশ্চয় দেশ-জাতির মিত্র নয়। জবাবদিহি নিশ্চিত করুন। মানবিক ডাক্তারদের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাপনার অগ্রভাগে বসান। অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক তো বটেই, যে বা যারা মানুষের অসহায়ত্বকে মুঠোবন্দি করে তুঘলকি কাণ্ড চালাচ্ছেন, যাদের অজ্ঞতা-অদক্ষতায় জীবনপ্রদীপ নিভে যাচ্ছে, তাদের শনাক্ত করে মূলোৎপাটন করুন। চিকিৎসা অবহেলাজনিত কারন ও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু মানে অস্বাভাবিক মৃত্যু। এমন গর্হিত কর্মকাণ্ড ফৌজদারী অপরাধের সামিল। যাদের অদক্ষতা, অবহেলায় প্রাণহানি ঘটছে কিংবা যাদের বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তায় রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যহানী ঘটছে এর প্রতিকার-প্রতিবিধান জরুরি। অস্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা কারো অনৈতিক আচরণে  মানসিক পঙ্গুত্ব মেনে নেওয়া যায় না। প্রয়াত সাংবাদিক-রাজনীতিক নির্মল সেন সেই কবে উচ্চারণ করেছিলেন ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। আজও সেই দাবির যথার্থতা বিদ্যমান। জয় হোক মানুষের। 

  • সাংবাদিক ও কবি 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা