জঙ্গি আস্তানা
মোহাম্মদ আলী শিকদার
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৪ ০৯:২০ এএম
মোহাম্মদ আলী শিকদার
২ জুলাই সকালে
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বরপা এলাকার চার তলা একটি বাড়ি পুলিশের বিশেষায়িত দল
অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) ও সোয়াট সদস্যরা ঘিরে রাখে। জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে
ঘিরে রাখা ওই বাড়িতে এটিইউ ও সোয়াট সদস্যরা অভিযান শুরু করে দুপুরের দিকে। তখনই জানা
যায়, আস্তানাটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আল আনসার আল ইসলামের সদস্যদের। তারা ওখান থেকে
গোপনে নানা জঙ্গি কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ চালাত বলে অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে
বড় কথা হলো, জঙ্গিদের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয় বটে, কিন্তু ওরা এখনও সক্রিয় এবং সর্বশেষ
নারায়ণগঞ্জের ঘটনার মধ্য দিয়ে তা-ই প্রতীয়মান হয়েছে।

১ জুলাই হলি আর্টিজানে
হামলার আট বছর অতিক্রান্ত হলো। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে
প্রকাশÑ দৃশ্যমান জঙ্গি তৎপরতা কমলেও কার্যক্রম বেড়েছে অনলাইনে এবং সদস্য সংগ্রহ ও
প্রশিক্ষণ চলছে পুরোদমে। জঙ্গি কার্যক্রমের বিষয়ে অতীত ভুলে গেলে তার চরম মূল্য দিতে
হবে। আমরা জানি, বর্তমান সরকার জঙ্গি নির্মূলে ‘শূন্য সহিষ্ণু’ অবস্থানে রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে
প্রকাশÑ দেশে এ পর্যন্ত যত জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে এর মধ্যে মূলত চারটি সংগঠনের সম্পৃক্ততার
তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে। এর মধ্যে তিনটি সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়লেও আনসার আল ইসলাম
বাংলাদেশ নামের সংগঠনটি সক্রিয় বলে একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে জানা গেছে। তাদের গোপন
কার্যক্রম চলছে বেশ জোরেশোরে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় এ সাক্ষ্য মেলে। বিগত প্রায় দেড় দশকে
র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্য বাহিনীগুলো এবং সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে প্রকাশ্যে
জঙ্গিদের কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু তারা গোপনে গোপনে শক্তি সঞ্চয় করছে।
অনেকের অভিযোগ, এই জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা
রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে এ ধরনের জঙ্গি সংগঠনের
কার্যক্রমের কোনো মিল পাওয়া যায় না। বরং এই জঙ্গি সংগঠনগুলো দেশের মধ্যেই বিশৃঙ্খল
পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আংশিক ক্ষমতালাভের চেষ্টায় থাকে।
আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাস নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার-বিশ্লেষণ করলে বোঝা
যায়, অতীতে সামরিক শাসনামলে রাজনীতিতে
ধর্মান্ধতার প্রবেশ ঘটে। এরই সূত্রে
জন্ম নেয় তথাকথিত জঙ্গিবাদ ও সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন। ধর্মান্ধ এই জঙ্গি সংগঠনের চরম পরিণতি দেখা যায় ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানের ঘটনায়। হলি আর্টিজান ঘটনার আট বছর পরও ধর্মান্ধতার ডালপালা ও শিকড়
বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সমাজের বিভিন্ন অংশে নীরব ও
সরবে বিস্তৃত হচ্ছে বিধায় এই বিভীষিকাময় দিনটি এলে আমরা সচকিত হয়ে উঠি। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর হবে না। কিন্তু ধর্মান্ধ
রাজনীতি ও উগ্রবাদের রাশ কতটুকু টেনে ধরা গেছে অথবা সেই পথকে কি
আমরা চূড়ান্তভাবে বন্ধ করতে পেরেছিÑ এসবের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। বিভীষিকা আর বীভৎসতায় পূর্ণ অন্ধকার সেই রাতে ধর্মান্ধ জঙ্গিরা পৈশাচিক
কায়দায় ২২ জন নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে, যার
মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্যসহ তিনজন বাংলাদেশি ছিল। বাকিরা সবাই ছিল বিদেশি। যাদের
প্রায় সবাই ছিল আমাদের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের সঙ্গে জড়িত।
ওই ঘটনাকে কখনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বাংলাদেশ গড়ার
স্বপ্ন দেখে স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা
অব্যাহত থাকলে জঙ্গি-সন্ত্রাস উত্থানের কোনো সুযোগই থাকত না। জার্মানির খ্যাতিমান
নিরাপত্তা বিশ্লেষক সিগফ্রিড উলফ ২০১৫ সালের এক গবেষণাপত্রে জানান, এ দেশে জঙ্গিবাদের পেছনে সামরিক শাসনামলের দায় সর্বাধিক। সামরিক শাসকরা ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির প্রবর্তন করে ধর্মকে রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের বৈধতার ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা চালান। একাত্তরের গণহত্যাকারী, যুদ্ধাপরাধী ও ইসলামি নামধারী
দলগুলো ১৯৭৫ সালের পরে যখন পুনরুত্থানের সুযোগ পেল, তখনোই তারা বুঝেছিল
একদিন তাদের অস্তিত্ব বড় রকম সংকটে পড়বে। সুতরাং সুদূরপ্রসারী কৌশল হিসেবে তারা
গোপনে সশস্ত্র সংগঠন তৈরি করে এবং প্রকাশ্যে পঁচাত্তরের রক্তের সিঁড়ি ধরে তৈরি
হওয়া মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী রাজনীতির বড় পক্ষের সঙ্গে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ
হয়।
হলি আর্টিজানে নিহতদের মধ্যে ১৭ জনই ছিল পশ্চিমা বিশ্বের
নাগরিক। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের লক্ষ্যের সঙ্গে তাদের
লক্ষ্যের কোনো মিল ও সামঞ্জস্য ছিল না। বরং ওই হামলার পেছনে যুদ্ধাপরাধীদের
বিচার বন্ধ করার জন্য বৈদেশিক চাপ প্রয়োগের অপলক্ষ্য ছিল। ধর্মীয় উগ্রবাদী রাজনৈতিক
এ কৌশল বাস্তবায়নে জঙ্গি গোষ্ঠীদের ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির
দণ্ড কার্যকর হয়। কিন্তু অশুভ মহল তাদের ব্যর্থতার পরও থেমে থাকেনি। তারা প্রচার করতে শুরু করে,
মধ্যপ্রাচ্য থেকে আইএস ও আল-কায়েদা বাংলাদেশে এসে গেছে। অর্থাৎ
বিদেশি কোনো শক্তির সহায়তা নিয়ে যেন এই জঙ্গিদের নির্মূল করা হয়, এমন তাগাদা দেওয়া
শুরু হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ নির্মূলে কঠোর অবস্থান নেয়। কোনো বিদেশি শক্তি
যখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটে যুক্ত হয়, তখন ওই দেশের অবস্থা কেমন হতে পারে তা আমরা
সিরিয়ার দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।
২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের পরও বহুবার বড় আক্রমণ চালানোর চেষ্টা
জঙ্গিরা করেছে। কিন্তু তারা সফল হয়নি। গত আড়াই-তিন বছর সশস্ত্র জঙ্গি তৎপরতা
নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। তাই বলে দেশ জঙ্গিমুক্ত হয়েছে, এ কথা বলা যাবে না। দেশের জঙ্গিবাদের সঙ্গে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।
নিকট অতীতে এই
স্তম্ভেই লিখেছি, দেশের অধিকাংশ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমানে জঙ্গীদের কার্যক্রম
কমে এলেও সবাই নিজ নিজ অবস্থানে আগের লক্ষ্যে অটুট রয়েছে এবং সুযোগের
অপেক্ষায় আছে। দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা নতুন কিছু নয়। ধর্মান্ধ ও
উগ্রবাদী চিন্তাচেতনার রাজনৈতিক ভাবনা যারা বহাল রেখেছে, তাদের অনেক তথ্যই আমাদের জানা। এই মুহূর্তে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো রয়েছে কোণঠাসা
অবস্থায়। কিন্তু মূলধারার রাজনীতিকে তারা নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিছু দিন আগে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল
শারকিয়ার নাম নতুনভাবে আলোচনায় আসে। জঙ্গি সংগঠনের নাম যা-ই
হোক না কেন,
তাদের রাজনৈতিক ভাবনা উগ্রবাদী। বাংলায় একটি প্রবাদ আছেÑ নতুন
বোতলে পুরোনো মদ। এই জঙ্গি সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা চলে। ধর্মীয়
উগ্রবাদী রাজনৈতিক চেতনা অতীতে আমাদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে চেপে বসেছিল। ওই সংকট
থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও দেশ থেকে সব উগ্রবাদী সংগঠন একেবারে নিশ্চিহ্ন
হয়ে গেছেÑ এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। এখন তারা যেহেতু
কোণঠাসা অবস্থানে রয়েছে, তাই সুযোগের সন্ধান করছে যাতে অভ্যন্তরীণ
পরিস্থিতি নাজুক করে তুলতে পারে। সেজন্য ঘন ঘন নাম বদলাচ্ছে জঙ্গি সংগঠনগুলো।
উগ্রবাদীদের শিকড় মূলত এক জায়গায়।
সশস্ত্র জঙ্গি তৎপরতা দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
অনেকটা সফলতা পেলেও সামগ্রিকভাবে জঙ্গিবাদের কবল থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করার
জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত
মাত্রায় কার্যকর পদক্ষেপ, আন্দোলন, ক্যাম্পেইন
ও কর্মসূচি নেই। বিপরীতে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক ও জঙ্গিবাদী অর্থনীতি ক্রমেই ব্যাপক
ও বিশালতর হচ্ছে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সব শ্রেণি, স্তর ও পর্যায়ের মানুষ
ধর্মের সংবেদনশীল বিষয়াদির অপব্যাখ্যায় ভীষণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে এবং অযৌক্তিক, অসমর্থিত
ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তাচেতনা মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। আমরা দেখছি,
জঙ্গি সংগঠনগুলো নিয়োগের জন্য তরুণ প্রজন্মের দিকেই শ্যেণদৃষ্টি রাখছে।
আবার পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে তারা অনলাইনে যোগাযোগ স্থাপন করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেকে আশ্রয় নিচ্ছেÑ এমন অভিযোগও আছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়ার ফলে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পাচারের মাধ্যমে তারা অর্থ সংগ্রহ করছে। এমনকি অবৈধ পাসপোর্টের সন্ধান পেয়ে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে মানব পাচারের মতো অপরাধেও যুক্ত হচ্ছে। আড়ালে থেকে তারা নিজেদের সাংগঠনিকভাবে জিইয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এর উপস্থিতি চলমান সময়ে টের পাওয়া যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যখন সেটি বোঝা যায় তখন আর প্রতিকারের সময় থাকে না। রাজনৈতিক প্রতিরোধ আবশ্যক, কিন্তু শুধু রাজনীতি ও প্রশাসনিক পন্থায় ধর্মীয় অপব্যাখ্যাজনিত মতাদর্শকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা যায় না। এর জন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে যূথবদ্ধ প্রয়াস অত্যন্ত দরকার।