× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মিয়ানমারে গৃহদাহ

রোহিঙ্গা সংকটের শেষ কোথায়

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৪ ০৯:১৯ এএম

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)-এর নবনির্বাচিত সরকারকে বিনা রক্তপাতে হটিয়ে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখল করার পরই দেশটিতে এক ধরনের ‘সিভিল ওয়ার’ শুরু হয়েছে। ১৯৬২ সালের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল আর ২০২১ সালের দখলের পরিপ্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট এক নয়। এখানে যে বিষয়টা জরুরি তা হচ্ছে, এর আগে যতবারই সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেদের জোর করে বসিয়ে শাসন করেছে, ততবারই কোনো না কোনো মাত্রায় জনগণের একটা সমর্থন তাদের প্রতি ছিল কিংবা জনগণ সামরিক সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন শুরু করবে, তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। কিন্তু ২০২১ সালের পর এনএলডির নেতৃত্বে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ জান্তাবিরোধী এক ধরনের বড় মাপের আন্দোলনে শামিল হয়; যাকে বলা হচ্ছে ‘ম্যাসিভ সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে সামরিক বাহিনী বা সামরিক বাহিনী শাসিত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সার্বভৌমত্ব, এথনিক রাইটস এবং আঞ্চলিক স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত বিভিন্ন রেজিস্ট্যান্স গ্রুপ যারা এনএলডির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘সাধারণ প্রতিপক্ষ’ (কমন অপোনেন্ট) হিসেবে লড়াই করছে।

এনএলডির নেতৃবৃন্দও ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরে ঘরে বসে থাকেননি কিংবা পালিয়ে বেড়াননি। বরং তারাও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সামরিক জান্তাবিরোধী একটি জোট তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভ‍‍র্নমেন্ট (এনইউজি)। এর নেতৃত্বে জান্তাবিরোধী আন্দোলনে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষও ব্যাপকহারে সংযুক্ত হতে থাকে। ফলে জান্তাবিরোধী আন্দোলনে একটি গণভিত্তি দাঁড়ায়। কিন্তু এনইউজির আন্দোলনকে মিয়ানমার জান্তা সরকার যখন অস্ত্রের ভাষায় মোকাবিলা করছে, তখন এনইউজিও তাদের একটি সশস্ত্র শাখা তৈরি করে; যার নাম দেওয়া হয় ‘পিপলস ডিফেন্স ফো‍র্স (পিডিএফ)’; যারা নিজেরা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের যে সশস্ত্র গ্রুপ আছে তাদের মধ্যেও একটা চমৎকার সমন্বয় তৈরি করতে সক্ষম হয়। জান্তাবিরোধী এ সশস্ত্র লড়াই একটা চূড়ান্ত রূপ নেয় যখন গত নভেম্বরে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স তৈরি হয়; যার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অন্যতম গ্রুপ হচ্ছে আরাকান আর্মি। যেহেতু আরাকান আ‍‍র্মি রাখাইনের গ্রুপ, সেহেতু সীমান্তব‍‍র্তী রাষ্ট্র হিসেবে রাখাইনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আরাকান আর্মির খবরাখবর, আরাকান আর্মির লড়াইয়ের গরম গরম খবর, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রভৃতি, বাংলাদেশের মিডিয়া এবং বাংলাদেশের মানুষ নিয়মিতভাবে অনুসরণ করে। এ ছাড়া যেহেতু মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটা বড় জায়গাজুড়ে আছে রোহিঙ্গা ইস্যু, সেহেতু রাখাইন রাজ্যে কী হচ্ছে, এর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে সেদিকেও বাংলাদেশের মানুষ এবং মিডিয়া সব সময় একটা সচেতন নজর রাখে। এর সূত্র ধরেই আমরা জানি, আরাকান আর্মি রাখাইনে মিয়ানমার জান্তাবাহিনীর সঙ্গে তুমুল লড়াই করছে, সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে নিয়মিতভাবে পরাজিত করছে, সামরিক বেইজ ও ঘাঁটি দখল করছে এবং রাখাইনের একটা বৃহত্তর অংশ ইতোমধ্যে আরাকান আ‍‍র্মি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তা ছাড়া আমরা দেখেছি মিয়ানমারের শত শত বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)-এর সেনা এবং সীমান্ত প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী দলে দলে বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশও একটা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে।

এ থেকেও আমরা অনুমান করতে পারি, আরাকান আ‍‍র্মির সঙ্গে লড়াইয়ে টিকতে না পেরে বিজিপির সেনারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। তবে এও অনস্বীকার্য, এখন পর্যন্ত আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোকে যতটা করায়ত্ত করতে পেরেছে, রাখাইনের বড় বড় শহরগুলো এখন পর্যন্ত সে তুলনায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। কিন্তু তারা বড় শহরগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কেননা বড় শহরগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারলে জান্তার কর্তৃত্ব পরাজিত করা সম্ভব নয়। এ প্রক্রিয়ারই সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে রাখাইনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর মংডু আরাকান আর্মি প্রায় দখল করে ফেলেছে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী. ‘ইতোমধ্যে মংডু শহরের ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা থেকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীকে হটিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আরাকান আর্মি। শহরটিতে মিয়ানমারের বিজিপিসহ অন্যান্য বাহিনীর ৪ হাজার সেনা রয়েছে। আর এ শহরটি চারপাশে ঘিরে রেখেছে আরাকান আর্মি।

এর জেরে তিন দিন ধরে টানা চলছে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলা, মর্টার শেল বর্ষণের ঘটনা। এর আগে মংডু শহরের দক্ষিণের কিছু অংশে কয়েকটি বিজিপির চৌকি ছিল। ওইসব চৌকি হয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজ নাফ নদের ওপারে অবস্থান করে খাদ্য ও গোলাবরুদ সরবরাহ করত। কিন্তু গত সপ্তাহে দক্ষিণের ওইসব চৌকিও আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এতে মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজও পিছু চলে গেছে। ফলে এ পরিস্থিতিতে মংডু শহরে আটকে পড়া মিয়ানমার বাহিনীকে সহায়তা করতে পারছে না নৌবাহিনী। ফলে গোলবরুদ ও খাদ্য সংকটে দুর্বল হয়ে পড়েছে ৪ হাজার সেনা সদস্য। এতে আর বেশিক্ষণ আরাকান আর্মির সঙ্গে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। ফলে যেকোনো সময় মংডু শহর আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।’ (প্রতিদিনের বাংলাদেশ ২৮.০৬.২০২৪)। এ হচ্ছে রাখাইন রাজ্যের স‍‍র্বশেষ পরিস্থিতি যাতে সহজেই অনুমান করা যায় যে, আরাকান আ‍‍র্মি খুব দ্রুত মংডু শহর দখল করে নেবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, আরাকান আ‍‍র্মি মংডু দখল করে নিলে সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কী হবে? উল্লেখ্য, মংডু শহরে বসবাসরত লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার জান্তা সরকার মনে করে তারা আরাকান আ‍‍র্মির লোক এবং আরাকান আ‍‍র্মির হয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আবার আরাকান আ‍‍র্মি মনে করে, এরা সামরিক বাহিনীর হয়ে আরাকান আ‍‍র্মির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গারা আছে উভয়সংকটে। সংবাদপত্রের ভাষ্যানুযায়ী, ‘মংডু শহর দখলের সর্বশেষ পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি এলাকার লাখের অধিক রোহিঙ্গার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এসব রোহিঙ্গা নাফ নদের ওপারে প্যারাবন, চাষের জমি, বনজঙ্গলে অবস্থান করছে। যারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য নানাভাবে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে অনেক রোহিঙ্গা এখন সংঘাতের মাঝামাঝি এলাকায়। যাদের একপাশে আরাকান আর্মি এবং অন্য পাশে বিজিপি। যাদের সরতে দিচ্ছে না মিয়ানমার জান্তারা। অভিযোগ উঠেছে, এসব রোহিঙ্গাকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এসব রোহিঙ্গার মধ্যে।’ (প্রতিদিনের বাংলাদেশ : ২৮.০৬.২০২৪)। এখন উভয় পক্ষের কাছে অনাস্থার কারণে কোনো পক্ষই রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস করে না। ফলে তাদের এখন আস্থার প্রমাণ দেওয়ার জন্য জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আ‍‍র্মি উভয়ের পক্ষে সম্মুখসারিতে অবস্থান নিয়ে নিজেদের আত্মোৎস‍‍র্গ করতে হবে। এভাবে রোহিঙ্গারা উভয় পক্ষেরই মানবঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑআরাকান আ‍‍র্মি যদি মংডু দখল করে, এর পরে রাথেডং, বুথিডং এবং রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে দখল করে এবং আরাকান আর্মি যদি সত্যিকার অর্থেই রাখাইন রাজ্যের দখলদারি নেয়, তাহলে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী? রোহিঙ্গা সংকট কোন দিকে মোড় নেবে?

সত্যিকার অর্থে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে যাবে। কেননা আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের কখনোই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেনি। তা ছাড়া সম্প্রতি আরাকান আর্মি বিভিন্ন রোহিঙ্গা গ্রামে এবং বিভিন্ন রোহিঙ্গার জনবসতিতে আক্রমণ চালিয়ে অনেক রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে, অনেকের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং অনেক রোহিঙ্গাকে সেখান থেকে বিতাড়িত করেছে। ফলে এ রকম একটি সম্পর্কের কাঠামোয় আরাকান আর্মি যদি রাখাইনের কর্তৃত্ব নেয়, বাংলাদেশে বাস করা ১৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে এটা ভাববার কোনো কারণ নেই। বরং রোহিঙ্গারা কত দ্রুত সেখান থেকে বিতাড়িত হবে সেটাই দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং আরাকান আর্মি শুধু মংডু নয়, গোটা রাখাইন রাজ্য দখল করে ফেললেও আখেরে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে বড় কোনো ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি না। বরং রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির এ উত্থান, কর্তৃত্ব এবং দখলদারি রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।

এ রকম একটা সংকটাপন্ন এবং সমূহ বিপন্ন পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির সঙ্গে একটা সম্পর্কোন্নয়নের জন্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে তেমন কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আরাকান আর্মির সঙ্গে একটা ডায়ালগ শুরু করতে পারে। আবার বাংলাদেশের পক্ষেও আরাকান আর্মির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগ করে কোনো ডায়ালগ ডেভেলপ করা বিদ্যমান ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাকরণের মধ্যে সম্ভব নয়। কেননা মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যে কূটনৈতিক সম্পর্ক, সে কাঠামোয় মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখে আরাকান আ‍‍র্মির সঙ্গে কোনো ডায়ালগ ডেভেলপ করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। মিয়ানমার রাষ্ট্র শক্তির ভাষায় আরাকান আর্মি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমান্বয়ে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে নতুন কৌশলে বিষয়টি জোড়ালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

  • নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক। অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা