সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৪ ১৩:০৭ পিএম
আপডেট : ২৮ জুন ২০২৪ ১৩:১০ পিএম
আমরা বলছি, আমরা এগিয়েছি। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি নিয়েও গর্ব রয়েছে। সেটি দৃশ্যমান বাস্তবতাও। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের মন-মানসিকতার যে উন্নয়ন ঘটেনি, তা বলতে দ্বিধা নেই। আমরা যে ভেতরে ভেতরে এখনও প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার বয়ে চলেছি, তা প্রতিনিয়ত স্পষ্ট হচ্ছে। ঝা-চকচকে ইমারত আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গতির লড়াই আমাদের ভেতরটা পাল্টাতে পারেনি। আর তাই পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে অন্ধকার দিকগুলোর। চলন্ত বাসের পর এবারে চলন্ত ট্রেন। সিলেট-চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন। সময় ২৬ জুন বুধবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টা। লাকসাম অতিক্রমের সময়ই চলন্ত এই ট্রেনে ধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী। এ খবরে আমরা শিউরে উঠি, আতঙ্কগ্রস্ত হই। এ কোথায় চলেছি আমরা?
২৭ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৬ জুন ভোরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও বিষয়টি জানাজানি হয় সন্ধ্যার পর। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ট্রেনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসএ করপোরেশনের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে রেলওয়ে পুলিশ। একই ঘটনায় ট্রেনের পরিচালক (গার্ড) আবদুর রহিমকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে। প্রতিবেদনে রেলওয়ে পুলিশের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ওই তরুণী উদয়ন এক্সপ্রেসে করে চট্টগ্রামে আসার পথে সিলেট থেকে উঠে খাবার বগিতে অবস্থান করেন। ওই সময় খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী তরুণীকে প্রথমে উত্ত্যক্ত এবং পরে ধর্ষণ করে।
চলন্ত বাসের পর এবার ট্রেনে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ এক কঠিন এবং কুৎসিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আমাদের। আমাদের স্মরণে আছে, কয়েক বছর আগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বাসচালক-হেলপার ও তাদের দোসরদের লালসার শিকার হয়েছিলেন এমন এক নারী, যিনি মানবসেবাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন; ছিলেন রাজধানীর একটি বড় বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের নার্স। আমাদের আরও স্মরণে আছে, ২০২২ সালে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী একটি নৈশকোচে সংঘটিত হয় ভয়াবহ ডাকাতি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের বাস টাঙ্গাইল অতিক্রম করার সময় ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তার আগের বছর ডিসেম্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোডে একটি বাসের সব যাত্রী নেমে গেলে দরজা বন্ধ করে বাসটির সুপারভাইজার ও হেলপার এক তরুণীকে ধর্ষণ করে। ওই বছরেরই জুন মাসে চট্টগ্রামের মিরসরাই, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট টাঙ্গাইলের মধুপুর, ২০১৩ সালের ২৫ জানুয়ারি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়াসহ চলন্ত বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের কয়েকটি ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ধামরাই, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার ও ময়মনসিংহে বাস-মাইক্রোবাসে পোশাক শ্রমিক ধর্ষণের ঘটনার ক্ষত এখনও দগদগে। তার সঙ্গে যোগ হলো এবারে চলন্ত ট্রেনে ধর্ষণের ঘটনা, যা আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে কোথাও আমাদের নারীরা নিরাপদ নন। আমরা দেখছি, পথেঘাটে, পরিবারে-কর্মক্ষেত্রে-সমাজে নারীরা কতটা নিরাপত্তাহীন। সবখানেই তাদের জন্য যেন বিপদ হাত বাড়িয়ে রয়েছে। চলন্ত বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ শেষে নারীকে ফেলে দেওয়ার মতো নির্মম ঘটনাও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এ রকম কয়েকটি ঘটনাইবা আমাদের সামনে আসে? কয়টির কথা আমরা জানি? কয়টি ঘটনা গণমাধ্যমে যথাযথ প্রচার পায়? কয়টি ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায়? আর কয়টি অপরাধেইবা অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়? আসলে অভিযোগের বড় অংশই অজানা থেকে যায়। আরও দুর্ভাগ্য আমাদের অধিকাংশ ঘটনাই যথাযথভাবে প্রমাণের অভাবে, আইনের ফাঁক গলিয়ে অপরাধী পার পেয়ে যায়। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজিরও খুব বেশি নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গণপরিবহনে নারী নির্যাতন-ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমরা মনে করি, কঠিন শাস্তি এবং সর্বোচ্চ নজরদারি ছাড়া নারীদের ওপর এই নৃশংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
সেই সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিশুদের শেখানোর দায়িত্ব নিতে হবে যে, লিঙ্গ, বর্ণ, গায়ের রঙ, ধর্ম, জাত কোনো কিছুর নিরিখেই মানুষের মধ্যে বিভাজন হয় না। আমরা যদি ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখাতে পারি, নারী-পুরুষে ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই মানুষ, আমরা সবাই এক। তাতে করে তাদের ভেতরে যে মানবিক গুণাবলি তৈরি হবে, সেই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো ঘটনা আটকানো সম্ভব হবে। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সমাজে শিক্ষার সঠিক প্রসার ও সুস্থ চিন্তাধারার বিকাশের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ থামানো সম্ভব। অন্যথায় এ অসুখ আমাদের ওপর সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসতেই থাকবে।