× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফিলিস্তিনে গণহত্যা

অস্বাভাবিকই এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে

মোহাম্মদ শিবারো

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৪ ১৩:০২ পিএম

অস্বাভাবিকই এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে

আট মাসেরও বেশি সময় ধরে গাজায় যুদ্ধাবস্থা চলছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তারপরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তাদের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের পথে সফলতা দৃশ্যমান নয়। ইসরায়েল এই প্রস্তাব আংশিক বাস্তবায়ন করতে রাজি হয়েছে। এই আংশিক যুদ্ধবিরতির মধ্যে তারা ইসরায়েলি বন্দিদের উদ্ধার করতে চায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতে হামাস কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ তিনি হামাসকে নির্মূল করার আগে একটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন। ফিলিস্তিনের মানুষ শান্তি প্রত্যাশা করে। কিন্তু তা যেন অবাস্তবই ঠেকছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের দ্বিধা এবং যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহেরও অভাব রয়েছে। পশ্চিমা সম্প্রদায়ের অনাগ্রহের কারণটি সহজে অনুমেয়। চলতি বছর বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী তোড়জোড় চলছে। বর্তমানে দুটি যুদ্ধ বাদেও আফ্রিকা ও পরমাণু শক্তিধর উত্তর কোরিয়াকে নিয়েও তাদের ভূরাজনৈতিক কৌশল ভাবতে হচ্ছে। 

গাজার মানুষ এখন আর মুক্তির প্রত্যাশা করতে পারে না। তাদের মনে হচ্ছে, যত দিন যাচ্ছে তাঁবুতে স্থায়ীভাবে থাকাই তাদের জন্য নিয়তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রায় ২৪ লাখ মানুষের কাছে ত্রাণ কিংবা সহায়তা পৌঁছানোর নিয়ন্ত্রণও ইসরায়েলের কাছে। অন্যদিকে আইন না মেনেই ইসরায়েল গাজায় অভিযান পরিচালনা করছে। এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি গাজায় স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। গাজার মানুষের সাক্ষাৎকার বা আর্তির কথা শুনলে তো তা-ই মনে হয়। যারা প্রতিনিয়ত গাজার বিষয়ে খোঁজ রাখে তারাও হয়তো এখন আর গণহত্যার বিষয়টি নিয়ে এত আতঙ্কিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর সংখ্যা দেখে আর গুনে মানসিকভাবে তো এমনই হওয়ার কথা। গাজার প্রসঙ্গ মানেই এখন ধ্বংসস্তূপ, ধ্বংস আর মৃত্যু। গাজার সব ধরনের অবকাঠামো ধসে পড়েছে। হাসপাতাল ও স্কুলেও আক্রমণ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে হামাস লুকিয়ে আছে। কিন্তু হামাস যে লুকিয়ে আছে আর কারা হামাসের সদস্য তা কীভাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শনাক্ত করছে? তা তো জানা নেই। 

শুধু ফিলিস্তিনি নয়, গাজা এখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠেছে। বিদেশি সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের এক জরিপে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১০৩ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। অন্য কয়েকটি সূত্র জানাচ্ছে, এই সংখ্যা আরও বেশি। গার্ডিয়ান সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত বছরের অক্টোবরের পর থেকেই সাংবাদিকদের ‘ক্রিটিক্যাল’ বা অতিজরুরি বিষয়ে প্রতিবেদন করার পথে নানা ধরনের বাধা তৈরি করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ২৩ জন অনুসন্ধানী বিদেশি সাংবাদিক এই আট মাসে নিহত হয়েছেন। এই ২৩ জনের মধ্যে আটজনই হামাস পরিচালিত মিডিয়া নেটওয়ার্কে কাজ করতেন। 

এত কিছুর পরও ফিলিস্তিনের মানুষের আর্তি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ভিন্নভাবে পৌঁছাচ্ছে। সেভ দ্য চিলড্রেন সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্তত ২১ হাজার শিশু নিখোঁজ, যার মধ্যে ৪ হাজার শিশুর মরদেহ ধ্বংসস্তূপের আড়ালেই রয়ে গেছে। গাজায় সংঘর্ষ বেড়েই চলছে। সাধারণ মানুষের মনের শান্তিও অনেকাংশে দূর হয়ে গেছে। ত্রাণ সহায়তা দেওয়া এখন অনেক কঠিন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ায় গাজায় লুটপাট ও ডাকাতিও বেড়েছে। শিশুরা অপুষ্টিজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছে। খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট তো বহুদিন ধরেই। মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিনের প্রতি একাত্ম হওয়ার পরও কি কোনো সুফল ফিলিস্তিনবাসী পেয়েছে? পায়নি। সম্প্রতি ইউনিসেফ জানিয়েছে, গাজার ২৫ শতাংশ শিশুই অপুষ্টিজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গাজায় খাদ্য নিরাপত্তার অভাব থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। দুর্ভিক্ষকে যেন অস্ত্র বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এত প্রতিবেদন আর জরিপ ফিলিস্তিনিদের বাস্তব সংকটের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে পারে না। নয় মাস ধরে তাদের ওপর গণহত্যাই পরিচালিত হচ্ছে। এই বিভীষিকা বন্ধের কোনো সম্ভাবনাও নেই। আমি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনে সাংবাদিকতা করছি। গাজার মানুষকে সামনে থেকে দেখছি। ক্যানের খাবার খোঁজে তারা। সকাল হওয়ার আগেই তাদের পরদিনের পানি আর খাবারের কথা ভাবতে হয়। সামান্য একটু রুটি হলেও চলে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার সুযোগ নেই। গোসল যদি করা যায় তাহলেই তো সৌভাগ্য। নতুন জামার কথাই-বা কে ভাবে! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিরা এই যুদ্ধ বন্ধের প্রতীক্ষা করছে। তাদের ওপর হামলা হবে এটি মাথায় রেখেই তারা দিন কাটাচ্ছে। প্রস্তুত যেকোনো সময় আশ্রয়ের জন্য দৌড়াতে। তবে মানুষের যে স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, সামান্য হলেও জীবনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা—তা ঠিকই করছে ফিলিস্তিনিরা। নিজের জন্মভূমিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার এই চেষ্টার মধ্যে জেদ আছে, আরও আছে রোখ। 

ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বাড়ি ফিরতে চায়। নিজেদের বাড়িতে ভালোমতো গোসল সেরে পরিষ্কার জামা গায়ে চড়িয়ে একটু শুয়ে পড়া। তারপর খাবার খেয়ে ঘুম। স্বাভাবিক জীবন যেভাবে চলে ঠিক তা-ই তো তাদের চাওয়া। এই প্রত্যাশাই তাদের জীবিত রেখেছে। আন্তর্জাতিক সমর্থন তাদের কানে কি আর পৌঁছায়? বরং এই যুদ্ধ বন্ধের কোনো কার্যক্রম শুরু হলেই ওদের স্বস্তি। স্বস্তির ঘুম তাদের এত দিনের বিভীষিকা ভুলতে সাহায্য করবে। হয়তো পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাবে। অথবা হারানো স্বজনকে নিয়ে ভীষণ কান্না জুড়ে দিতে পারবে। অনেক ফিলিস্তিনি বলেছে, তারা প্রায়ই কাগজ আর কলম খোঁজে। এই যে যাযাবরের মতো জীবন, এই যাযাবরের জীবনের কিছুটা লিখে রাখলে আজীবন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে। তবে সে তো যুদ্ধ বন্ধ হলে! তার আগে খুঁটিয়ে দেখার ফুরসত কোথায়! 

গাজায় অস্বাভাবিকতা একদম স্বাভাবিক হয়ে গেছে। হতাশা আর দুর্ভাবনার মধ্যেই মানুষকে বাঁচতে হবে। তারপরও ফিলিস্তিনি সাহসী সাংবাদিকরা রয়েছেন। তারা গাজার মানুষের এই টুকরো টুকরো স্বপ্নের কথা অন্তত তুলে আনতে পারছেন। সবার শুরুতে তো তারা মানুষ। গাজার প্রতিটি বাসিন্দাই যে সাদামাটা মানুষ, সে কথা এসব স্বপ্নে আরও ভালোভাবে ফুটে ওঠে। যুদ্ধ আর সহিংসতা স্বাভাবিক হলেও বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা গাজার মানুষ ভুলবে বলে মনে হয় না। যুদ্ধবিরতি যত দেরিতেই আসুক, তারা প্রাণপণে বাঁচতে চাইবে। 

  • সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
  • আরব নিউজ থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা